বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়। সড়কের পাশে রিকশাভ্যান নিয়ে যাত্রী কিংবা পণ্যের অপেক্ষায় চালকেরা। এরই মধ্যে চলছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন নিয়ে আলোচনা। কেউ বলছেন ধানের শীষের জয়ের কথা, কেউ আবার দাঁড়িপাল্লার পক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন। আলোচনার একপর্যায়ে উঠে আসছে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটের হিসাবও।
ভূল্লী উপজেলার একটি বাজারে বসে ভোটের আলোচনা করছিলেন কয়েকজন ভ্যানচালক। তাদের একজন বললেন, ‘যা-ই বলেন, এবার ধানের শীষ জিতবে।’ পাশ থেকে আরেকজনের প্রশ্ন, ‘তাহলে দাঁড়িপাল্লার কী হবে?’ তাদের কথা শুনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সনাতন ধর্মাবলম্বীর সাথে এক ব্যক্তি বললেন, ‘এখানে জিততে হলে আমাদের ভোট লাগবেই।’
কিছুক্ষণ পর আড্ডা ভেঙে গেলে কথা হয় ওই ব্যক্তির সাথে, তিনি বলেন, আগে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর শক্ত অবস্থান ছিল। এখন আওয়ামী লীগ ও নৌকা প্রতীক না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। দুই দলের প্রার্থীর লোকজনই বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইছেন। এ পরিস্থিতিতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট কোনদিকে যাবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
শুধু ওই বাজার নয়, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় উপনির্বাচন ঘিরে একই আলোচনা চলছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আসনটিতে ভোটের হিসাব বদলে গেছে। স্থানীয় রাজনীতিক, ভোটার ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মতে, এবারও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ কারণে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের নজরও এই ভোটারদের দিকে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শপথ গ্রহণের পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন পাঁচ প্রার্থী।
তারা হলেন বিএনপির মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ) ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)। ভোটারদের আলোচনায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি উঠে আসছে।
বদলে গেছে ভোটের সমীকরণ
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান ছিল। অতীতের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ভোটের লড়াই জমে উঠেছে।
আসনটিতে মোট ভোটার ৫ লাখ ১১ হাজার ৬২৯ জন। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতাদের ভাষ্য, এ আসনে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি। স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁদের ভোটকে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ফলে এই ভোটারদের সমর্থন কোন প্রার্থীর দিকে যায়, তা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংগঠনের নেতারা।
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কুমার গুপ্ত বলেন, নির্বাচন এলেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এক ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়। এবারের উপনির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম নেই। ভোটের পর কেউ যাতে ভয়ভীতি কিংবা হামলার শিকার না হন, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
হিন্দু-অধ্যুষিত কেন্দ্রে বিএনপির এগিয়ে থাকার হিসাব
সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নের দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে মোট ভোটার ৩ হাজার ১৪৯ জন। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, কেন্দ্রটির অধিকাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ কেন্দ্রে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েছিল ১ হাজার ৮৭৬ ভোট। দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৫০৯ ভোট। একই উপজেলার দক্ষিণ বঠিনা গ্রামের পশ্চিম অংশ ও বাগপুর এলাকার ভোটারদের কেন্দ্র ফাড়াবাড়ি উচ্চবিদ্যালয়। এ কেন্দ্রে ভোটার ৩ হাজার ৭৫৯ জন। স্থানীয়দের হিসাবে, কেন্দ্রটির অধিকাংশ ভোটার হিন্দু সম্প্রদায়ের। আগের নির্বাচনে এখানে ধানের শীষ পেয়েছিল ২ হাজার ১৯৬ ভোট। দাঁড়িপাল্লা পেয়েছিল ৪৭৬ ভোট।
অন্যদিকে উত্তর ঠাকুরগাঁও এলাকার রাংরাই পুকুর শিশু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটার ২ হাজার ৩০ জন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ কেন্দ্রে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন ১ হাজার ৩৫৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন পেয়েছিলেন ২২৯ ভোট।
হিন্দু-অধ্যুষিত এসব কেন্দ্রে আগের নির্বাচনের ফল ধরে রাখতে চায় বিএনপি। অন্যদিকে এসব কেন্দ্রে নিজেদের ভোট বাড়ানোর চেষ্টা করছে জামায়াত। এ কারণে দুই দলের প্রার্থীদের প্রচারে সংখ্যালঘু ভোটারদের গুরুত্ব বাড়ছে।
যা বলছেন প্রার্থীরা
সংখ্যালঘু ভোটারদের আস্থা অর্জনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীরা।
বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, তার বাড়ি কালীবাড়িতে। সেখানকার মন্দিরের দেয়াল তাঁদের জায়গার সীমানা। মন্দিরের আশপাশেই তার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। তাঁদের বাড়ির জবা ফুল দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা করেন, আবার প্রতিবেশীদের বাড়ির তুলসীগাছের পাতা তাঁদের অসুস্থতায় কাজে লাগে। এমন পরিবেশেই তিনি বড় হয়েছেন। তার শরীরে একবিন্দু রক্ত থাকতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষতি হতে দেবেন না বলে আশ্বাস দেন তিনি।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হামলার সময় তারা তাঁদের পাশে ছিলেন। নির্বাচিত হলে ওই সময়ের হামলার ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেবেন। ভবিষ্যতেও তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি।
নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে উপনির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, ভোটাররা যাতে একদম ভয়হীন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে থাকবে। কেবল ভোটের দিনই নয়, নির্বাচনের পরও এলাকাগুলোতে কড়া নিরাপত্তা বজায় রাখা হবে।