১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয় এবং বিএনপির জয় দুই দলকেই বিস্মিত করেছিল। আওয়ামী লীগ ধরে নিয়েছিল, তারা ক্ষমতায় যাচ্ছে। এমনকি দলটির নেতারা শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য পোশাক ইস্ত্রি করে রেখেছিলেন বলেও রাজনৈতিক মহলে ঠাট্টা করা হতো। প্রবীণ সাংবাদিক, ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম তার নতুন কলামে এমন মন্তব্য করেছেন।
শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে প্রকাশিত ‘রুলিং পার্টি-অপজিশন রিলেশনস আর কি টু ইনস্টিটিউশনালাইজিং ডেমোক্রেসি’ শিরোনামের কলামে তিনি দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের অতীত, সরকারি দল ও বিরোধী দলের সম্পর্ক এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা করেছেন। লেখাটির উপশিরোনাম ‘আর উই ওপেন টু লার্নিং ফ্রম আওয়ার পাস্ট মিস্টেকস’। অর্থাৎ, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে আমরা কতটা প্রস্তুত।
মাহফুজ আনামের মতে, ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ঘটনাটি ছিল দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সহযোগিতার নতুন ধারা শুরুর একটি বড় সুযোগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক আচরণের কারণে সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি বলে তিনি মনে করেন।
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সংসদীয় পদ্ধতিতে যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা চালু হয়। স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালের সেপ্টেম্বরে আবার সংসদীয় পদ্ধতি ফিরে আসে। মাহফুজ আনাম লিখেছেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ অন্য দলগুলোর দাবি মেনে নিয়ে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। অথচ, নির্বাচনের আগে বিএনপির ইশতেহারে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছিল।
তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সংসদ নেতা হিসেবে খালেদা জিয়া চাইলে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা বজায় রাখার রাজনৈতিক অবস্থানে থাকতে পারতেন। কিন্তু তিনি বিরোধী দলের দাবি মেনে নেন। মাহফুজ আনামের দৃষ্টিতে, এটি ছিল সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরির সুযোগ।
তবে তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ এই সিদ্ধান্তকে বিএনপির সহযোগিতার মনোভাব হিসেবে দেখেনি। বরং দলটি এটিকে বিএনপির পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করেছিল। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের ফলকে আওয়ামী লীগ প্রকৃত জনরায় হিসেবে গ্রহণ করেনি বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ওই নির্বাচনে ‘সূক্ষ্ম কারচুপি’র অভিযোগ তুলেছিলেন। এর ফলে সংসদে গঠনমূলক বিরোধিতার পরিবর্তে সরকারকে অকার্যকর করার প্রবণতা তৈরি হয়।
নিজের সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাহফুজ আনাম লিখেছেন, নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে সংসদ অধিবেশন চলাকালে তিনি বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার কক্ষে ছিলেন। অধিবেশন শুরুর ঘণ্টা বাজলে শেখ হাসিনা হঠাৎ ‘ওয়াকআউট, ওয়াকআউট’ বলে চিৎকার করেন। দলের অন্য সংসদ সদস্যদেরও এ কথা জানিয়ে দিতে বলেন।
পরে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা মতিয়া চৌধুরী ও তোফায়েল আহমেদ সেখানে এসে ওয়াকআউটের কারণ জানতে চান। মাহফুজ আনামের বর্ণনা অনুযায়ী, তখন ওয়াকআউট করার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তার দাবি, দুই নেতা সিদ্ধান্তটি নিয়ে আপত্তি জানালে শেখ হাসিনা তাদের বলেন, ‘আপনাদের যা খুশি করেন।’ এই অভিজ্ঞতাকে তিনি সংসদের কার্যক্রমের প্রতি বিরোধীদলীয় নেতার তাচ্ছিল্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিকে কেন্দ্র করে সংসদ বর্জন, ওয়াকআউট, পদত্যাগ এবং রাজপথে আন্দোলনের ঘটনা বাড়তে থাকে। মাহফুজ আনামের মতে, এর ফলে সংসদ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ঘন ঘন হরতাল, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক সহিংসতা জনজীবনেও প্রভাব ফেলে। সংসদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায়। দেশের কর্মসংস্কৃতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে বলে তিনি মনে করেন।
কলামে তিনি আরও বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ, ২০০১ সালে বিএনপি এবং ২০০৯ সালে আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তার ব্যাখ্যা, এই অভিজ্ঞতা বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করেছিল যে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে চাপে ফেলে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় বিরোধী দলের দায়বদ্ধতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
মাহফুজ আনামের ভাষ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে তিনি ‘সম্পূর্ণ কারচুপিপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, এসব নির্বাচনের প্রভাব পুলিশ, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, নিম্ন আদালত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়ে। বেসরকারি খাতও সরকারের অনুগত থাকার চাপের মুখে পড়ে।
তবে মাহফুজ আনামের এই বিশ্লেষণ নিয়ে ভিন্নমতের জায়গাও রয়েছে। সমালোচকদের মতে, দেশের গণতান্ত্রিক সংকটের ইতিহাসকে শুধু আওয়ামী লীগের বিরোধী দলের ভূমিকা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে রাজনৈতিক বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। নব্বইয়ের দশক থেকে গণতান্ত্রিক চর্চা ব্যাহত হওয়ার পেছনে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—দুই দলেরই কমবেশি দায় রয়েছে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দুই দলই বিরোধী দলের অধিকার, সংসদীয় রীতিনীতি এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছে।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনাও এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ওই সময় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল। হামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিয়ে তৎকালীন সরকারের ভূমিকা কঠোরভাবে সমালোচিত হয়। তদন্তের একপর্যায়ে জজ মিয়াকে জড়িয়ে যে কাহিনি সামনে আনা হয়েছিল, সেটিও পরে ভেঙে পড়ে। ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নে বিএনপির অতীত ভূমিকা আলোচনার বাইরে রাখা যায় না।
একইভাবে, সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং রাজনীতি থেকে প্রধান দুই নেতা শেখ হাসিনা-খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগের সময় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হয়েছে। সংবাদমাধ্যম দুটি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরিতে কতটা ভূমিকা রেখেছিল, তা নিয়ে অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্য রয়েছে। গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সংবাদমাধ্যম দুটির নিজস্ব ভূমিকা ও দায়বদ্ধতার প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
মাহফুজ আনাম তার কলামের শেষাংশে বর্তমান সংসদের পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। তার মতে, নতুন সংসদেও সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। গণভোটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের বিরোধ তৈরি হয়েছে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। এসব অধ্যাদেশের মধ্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন এবং মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার বিষয় ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া ৫০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতির মধ্যে বিরোধী দলকে মাত্র একটি পদ দেওয়ার বিষয়টিও সমালোচনা করেছেন মাহফুজ আনাম। তার মতে, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত ১৭ সদস্যের সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে মতবিরোধ এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে অচলাবস্থা রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়িয়েছে।
মাহফুজ আনাম মনে করেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারি দলকে বিরোধী দলের যুক্তিসংগত দাবি বিবেচনা করতে হবে। অন্যদিকে, বিরোধী দলকে সংসদে সরকারের ভুল তুলে ধরতে হবে এবং দুর্নীতি ও দলীয় নিয়োগের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। সরকারকে অস্থিতিশীল করার হুমকি দিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি করা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।
তবে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অভিজ্ঞতা বলছে, গণতন্ত্রের দায় শুধু বিরোধী দলের নয়, ক্ষমতাসীন দলেরও। সংসদ কার্যকর করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার দায়িত্ব দুই পক্ষেরই। সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। গণতন্ত্রের সংকট নিয়ে আলোচনা তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের অতীত ভূমিকা ও ভুলেরও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হবে।