রাজশাহীর দুর্গাপুরে আওয়ামী লীগের দুপক্ষের পুরনো রাজনৈতিক বিরোধের জেরে দায়ের করা একটি মামলাকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে বিএনপির দুই সংসদ সদস্য। মামলার বাদী গোলাম মোস্তফাকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত দাবি করে তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদ। অন্যদিকে, মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ১২ জনকে বিএনপির সক্রিয় সদস্য দাবি করে তাদের মামলা প্রত্যাহার ও সাজা মওকুফের সুপারিশ করেছেন রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল। দুপক্ষের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দুই সংসদ সদস্যের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট বিরোধ।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৯ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ঘিরে। আওয়ামী লীগের দুপক্ষের সেই বিরোধ গড়ায় হামলা, ভাঙচুর ও মামলায়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর আদালত ওই মামলার ১২ আসামিকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে। দণ্ডপ্রাপ্তদের রেহাই দিতে সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মণ্ডলের সুপারিশের বিপরীতে বাদীর পক্ষে দাঁড়ান আবু সাঈদ চাঁদ। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বাদীর বাড়িতে পুলিশ যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। বাদীর দাবি, তাকে মামলা তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার।
মামলার নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ১৮ মার্চ দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। একপক্ষ আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা নজরুল ইসলামের পক্ষে এবং অন্য পক্ষ দলটির বিদ্রোহী ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী প্রয়াত আব্দুল মজিদ সরদারের পক্ষে অবস্থান নেয়। নির্বাচনী বিরোধের রেশ পরবর্তী সময়েও অব্যাহত থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালের ৩১ মে উপজেলার দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়নের সোনারপাড়া নামুদরখালী গ্রামে আওয়ামী লীগ কর্মী মো. গোলাম মোস্তফার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন যুবলীগের তৎকালীন সদস্য সচিব শহিদুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে ১২ জনের বিরুদ্ধে পরদিন ১ জুন রাজশাহীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ দ্রুত বিচার আইনের ৪ ও ৫ ধারায় মামলা করেন গোলাম মোস্তফা। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর আদালত মামলার ১২ আসামির প্রত্যেককে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মামলার বাদী ও আসামি— উভয়পক্ষই স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে বাদী গোলাম মোস্তফার পক্ষে অবস্থান নেন আবু সাঈদ চাঁদ। অন্যদিকে, মামলার প্রধান আসামি শহিদুল ইসলামসহ দণ্ডপ্রাপ্ত অন্যদের পক্ষে দাঁড়ান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডল।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মামলা থেকে রেহাই দিতে গত ২৫ মে প্রথমবার এবং ৩০ জুলাই দ্বিতীয়বার জাতীয় সংসদের প্যাডে রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের কাছে সুপারিশ করেন নজরুল ইসলাম মণ্ডল। ৩০ জুলাইয়ের প্রত্যয়নপত্রে তিনি দাবি করেন, মামলার আসামিরা বিএনপির সক্রিয় সদস্য এবং বাদী গোলাম মোস্তফা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে হয়রানিমূলকভাবে মামলাটি করা হয়েছে বলেও সুপারিশে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, গত ১৩ জুন জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া এক অবহিতকরণ চিঠিতে গোলাম মোস্তফা অভিযোগ করেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের রক্ষা করতে বিএনপির একটি প্রভাবশালী মহল অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তার ওই চিঠির গুরুত্ব বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেন আবু সাঈদ চাঁদ। এভাবেই একই মামলার বাদী ও আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে দুই সংসদ সদস্যের অবস্থান পরস্পরবিরোধী হয়ে ওঠে।
বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে গত ১৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে গোলাম মোস্তফার বাড়িতে পুলিশের যাওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বাদীর অভিযোগ, রাত ১টার দিকে দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল তার বাড়িতে যায়। তাদের সঙ্গে মামলার এক নম্বর আসামিসহ অন্য আসামিরাও ছিলেন। ওই সময় বাড়িতে শুধু তার বৃদ্ধ বাবা সামির আলী ও মা চায়না বিবি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মামলা তুলে নিতে বলা হয়। অন্যথায় ছেলেসহ পরিবারের সবাইকে গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি করেন গোলাম মোস্তফা। রাত ২টার দিকে তারা চলে যান বলেও অভিযোগ তার। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।
তবে পুলিশের অভিযানের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দুর্গাপুর থানার ওসি পঞ্চনন্দ সরকার। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘অভিযানের প্রশ্নই আসে না। কারণ, মামলাটির তো রায় হয়ে গেছে। রায় হওয়া মামলা তুলে নিতে পুলিশ বাদীর বাড়িতে যাবে, এটি হতেই পারে না। কারণ, পুলিশ তো আইনকানুন জানে।’
দেলুয়াবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুস সাত্তার মৃধার বক্তব্যেও আসামিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। তিনি বললেন, ‘গোলাম মোস্তফা আগে তার সঙ্গে বিএনপি করতেন। তবে তার কোনো পদ ছিল না। গোলাম মোস্তফার বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মামলার এক নম্বর আসামিসহ অনেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এই মামলার মাত্র দুজন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানি।’
নজরুল ইসলাম মণ্ডলের সুপারিশের বিষয়ে আব্দুস সাত্তার মৃধা বললেন, ‘এমপি নজরুল ইসলাম যেসব আসামি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাদেরও বিএনপি বলে সাব্যস্ত করে সুপারিশ করেছেন। কিন্তু আমরা যেটি সত্য, সেটিই বলেছি। আমি, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদসহ অন্য নেতৃবৃন্দ তাদের (আসামি) আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে সুপারিশ করেছি।’
রাজশাহী-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবু সাঈদ চাঁদও নজরুল ইসলাম মণ্ডলের সুপারিশের সমালোচনা করেছেন। তার ভাষ্য, পুঠিয়া-দুর্গাপুরের সংসদ সদস্য জেনে অথবা না জেনে আওয়ামী লীগের আসামিদের পক্ষে সুপারিশ করেছেন।
গোলাম মোস্তফা ও তার বাবা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে আবু সাঈদ চাঁদ বললেন, ‘গোলাম মোস্তফা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত— এটি নিশ্চিত হয়েই আমি তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি। তার বাবা আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন— এমন কোনো ডকুমেন্ট কেউ আমাকে দেখাতে পারেনি।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মণ্ডলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তার ব্যক্তিগত সহকারী ইয়াসির আরাফাত প্রিন্সের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, তবে তিনিও ফোন রিসিভ করেননি। ফলে মামলার আসামিদের বিএনপির সক্রিয় সদস্য এবং বাদী গোলাম মোস্তফাকে আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য উল্লেখ করে সুপারিশ করার বিষয়ে নজরুল ইসলাম মণ্ডলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।