Image description

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার ইস্যুতে একে অপরের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। কৌশলের অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে নাম না দিলে বিরোধী দলকে আর সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দিতে রাজি নয় সরকারি দল। বিরোধীদলের দাবি, জুলাই সনদ অনুযায়ী মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোর ২৬ শতাংশের সভাপতি পদ পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।

অন্যদিকে, জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন দাবির পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুতের চলমান সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলোতে সংসদে সরব থাকার কৌশল নিয়েছে বিরোধী দল। পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি দিয়ে সরকারি দলকে চাপে রাখতে চায় তারা। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে রাজধানীতে পদযাত্রা করে সংসদের স্পিকারকে স্মারকলিপি দিয়েছে বিরোধী দল। এছাড়া, আগামী শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। বিভাগীয় পর্যায়ে লংমার্চ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

জুলাই সনদ অনুসারে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বণ্টন নিয়ে গত রবিবার সংসদে বিতর্ক হয়েছে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে। বিতর্ক হলেও বিরোধী দলকে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতির পদ দেওয়া হবে কি না—সে প্রশ্নের মীমাংসা হয়নি। দুই পক্ষের পালটা বক্তব্যের পর ঐ সময়ে অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দেশের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রয়োজনে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ‘ক্লোজড ডোর’ বা রুদ্ধদ্বার আলোচনারও পরামর্শ দেন তিনি।

রবিবার সংসদের বিতর্কে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিরোধীদল সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলে জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী তাদেরকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির আরো পদ দিতে আপত্তি নেই। তবে, এজন্য বিরোধী দলকে সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি দিতে হবে। জুলাই সনদের ভিত্তিতে বিভিন্ন দাবি তুললেও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করাকে বিপরীতমুখী অবস্থান বলে মন্তব্য করেছে সরকারি দল। বিতর্কে বিরোধীদল জানিয়ে দিয়েছে, সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে তারা প্রতিনিধি দেবে না।

জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ৩৯টি। চলতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এখন পর্যন্ত ১৫টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এরমধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই কমিটির সভাপতি।

সভাপতির পদের বিষয়ে জুলাই সনদে কী আছে

বিদ্যমান সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তবে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে বিরোধীদলকে এক বা একাধিক সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার সংসদীয় রেওয়াজ রয়েছে। ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল’ হিসেবে সই করা জুলাই সনদের প্রস্তাবে  বলা হয়েছে—সরকারি হিসাব, বিশেষ অধিকার, অনুমিত হিসাব ও সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। এছাড়া মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি সংসদে আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দলের মধ্য থেকে নির্বাচন করার প্রস্তাবও রয়েছে জুলাই সনদে। 

সংসদে বিরোধী দলের আসনের অনুপাত প্রায় ২৬ শতাংশ। সেই হিসাবে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত ৩৯টি কমিটির মধ্যে প্রায় ১০টির সভাপতি পদ তাদের পাওয়ার কথা। এর সঙ্গে সনদে সরাসরি উল্লেখ করা চারটি কমিটি যোগ করলে বিরোধী দলের মোট ১৪টি কমিটির সভাপতির পদ পাওয়ার কথা। তবে, জুলাই সনদ অনুযায়ী এখনো সংবিধান সংশোধন না হওয়ায় এবং সনদে থাকা এ সংক্রান্ত প্রস্তাব যুক্ত না হওয়ার কারণে বিরোধী দলকে সভাপতির এসব পদ দেওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি। 

প্রসঙ্গত, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচ জনের নাম দিতে বলা হয়েছিল; কিন্তু নাম দেয়নি। বিরোধী দল ঐ কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সংশোধন নয়, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।

বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের রবিবার সংসদে ঐ বিতর্কে অংশ নিয়ে বলেছেন, সংসদে সদস্যসংখ্যা অনুসারে সংসদীয় কমিটির সদস্য ও অন্যান্য পদ বণ্টনের বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছিল। আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে সরকারের সংবিধান সংশোধন কমিটিতে আমরা অংশগ্রহণ করব না। একটি কমিটিতে যোগ  দেওয়ানোর জন্য শর্ত আরোপ করা ঠিক নয়। জবাবে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, জিয়াউর রহমানের সময় সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছিল। এবারও ঐ কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে।

ঐ বিতর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদের জন্য একজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন পর্যন্ত অপেক্ষা করা হয়নি। তবে, বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকারের পদ নেয়নি। এরপর সরকারি দল সিদ্ধান্ত নেয়, জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত অর্থাত্ সংবিধান সংশোধিত হলে সে অনুযায়ী পদ বণ্টন করা হবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলোতে সংসদের আসনের সংখ্যানুপাতে বিরোধী দল সভাপতি পদ পাবে। তবে, এজন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

বিরোধীদলীয় একাধিক সংসদ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন; বিদ্যুত্, গ্যাস ও সার-সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে চান তারা। এর অংশ হিসেবে চলতি অধিবেশনের প্রথমদিনে গত বৃহস্পতিবার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন করেন তারা। এসব প্রশ্ন্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের জবাবকে ঘিরে হইচই-হট্টগোলে প্রায় ১৪ মিনিট সংসদের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সংসদে বিরোধী দলের এই ভূমিকাকে পরিকল্পিত বলে মনে করছে সরকারি দল।

সরকারি দলকে চাপে ফেলকে আগামী শনিবার চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১ দলের ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর, ৩১ অক্টোবর খুলনা এবং ২১ নভেম্বর সিলেট অভিমুখে লংমার্চ করবে তারা। জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে চার বিভাগে লংমার্চের ঘোষণা দেওয়া হলেও এই সংখ্যা বাড়তে পারে। এসব কর্মসূচির শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশ করবে ১১ দলীয় ঐক্য।

ইত্তেফাক