ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধের ঘটনা নিয়ে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ।
তার দাবি, মাদ্রাসাছাত্ররা কনসার্ট বন্ধ করেননি, গভীর রাতে পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটায় শুধু শব্দ কমাতে বলেছিলেন। এ ঘটনায় পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন বলেও দাবি করেন তিনি।
শনিবার (২৯ আগস্ট) নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া স্ট্যাটাসে সংসদে দেওয়া সেই বক্তব্য নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় দুঃখপ্রকাশ করে হাসনাত এসব কথা বলেন।
স্ট্যাটাসে হাসনাত বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের কনসার্ট বন্ধ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, বাস্তব চিত্র তার থেকে আলাদা। গভীর রাতে উচ্চ শব্দের কারণে মাদ্রাসার পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছিল। এ কারণে শিক্ষার্থীরা শব্দ কমাতে বলেছিলেন। পরে বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতির অবনতি হয়। পুলিশের লাঠিপেটায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
তিনি বলেন, ‘মিডিয়া ভিন্নভাবে উপস্থাপন করলেও ঘটনাপ্রবাহ থেকে এটা স্পষ্ট, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কনসার্ট বন্ধ করে দেয়নি। তারা শুধু শব্দ কমাতে বলেছিল।’
‘সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ নয়’ উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শব্দ কমাতে বলেছে, এর অর্থ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা বা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ নয়। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান-বাজনা ও সিনেমা অনেকটা নিষিদ্ধের মতো।’
কুমিল্লা-৪ আসনের এ সংসদ সদস্য অভিযোগ করে বলেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্যের মাধ্যমে তার মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আলেম-ওলামাদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন করা হয়েছে।’
নৌকাবাইচের তথ্যগত ভুল স্বীকার
নিজের বক্তব্যের তথ্যগত ভুলও স্বীকার করে এনসিপির এ নেতা বলেন, ‘নৌকাবাইচের স্থান হিসেবে সিলেটের পরিবর্তে ভুল করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাম বলেছিলাম। এ ভুলের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হওয়ায় আমি বিব্রত এবং দুঃখিত।’
হাসনাত বলেন, ‘মূল ঘটনা কী ছিল এবং গণমাধ্যম কীভাবে তা উপস্থাপন করেছে, সেটি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত বলা উচিত ছিল। কিন্তু সম্পূরক প্রশ্নের সময়সীমা সীমিত থাকায় বিস্তারিত বলার সুযোগ হয়নি।’
‘এই বাংলাদেশ সবার’
জুলাইয়ের আদর্শের কথা তুলে ধরে হাসনাত বলেন, তিনি ও তার দল একটি সর্বজনীন সমাজের স্বপ্ন ধারণ করেন, যেখানে সব মানুষের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং কেউ কারও মত বা দৃষ্টিভঙ্গি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।
তিনি বলেন, ‘এই বাংলাদেশ সবার। এই বাংলাদেশে মসজিদ থাকবে, মন্দির থাকবে, সঙ্গীত থাকবে, ওয়াজ থাকবে, মাজার থাকবে, কনসার্ট হবে, মাহফিল হবে, রথযাত্রা হবে, সিনেমা উৎসব হবে। পাশাপাশি বিজ্ঞ আলেমদের আলোচনাও হবে। যার যে বিষয় পছন্দ, সে সেখানে যাবে ও অংশ নেবে। আর যার পছন্দ নয়, সে সেখানে যাবে না। সরকারের দায়িত্ব হবে, কেউ যেন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে তা নিশ্চিত করা।’
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অন্যায়ভাবে কারও ওপর জোর খাটায় বা নিজের মতামত চাপিয়ে দিতে কাউকে বাধ্য করে, তাহলে সরকারের দায়িত্ব তা প্রতিহত করা এবং সবার সমান অধিকার নিশ্চিত করা।’
সরকার এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা ভেঙে পড়ে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
হাসনাত বলেন, ‘জুলাই ছিল ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে সবার আন্দোলন। মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং বাংলাদেশের বৈচিত্র্যকে সম্মান করে একটি সর্বজনীন সমাজ গড়ে তোলাই ছিল জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য। সেই বাংলাদেশ গড়ার চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।’
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে হাসনাত আবদুল্লাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি সম্পূরক প্রশ্ন তুলতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সংস্কৃতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। তার ওই বক্তব্যের প্রতিবাদে গত শুক্রবার (২৮ আগস্ট) রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল করে এবং শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিতব্য এনসিপির সাংগঠনিক কর্মশালা প্রতিহতের হুঁশিয়ারি প্রদান করে। এরপরই বিষয়টি নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়ে নিজের বক্তব্য স্পষ্ট করলেন এই সংসদ সদস্য।