Image description
তপশিলের আগেই কষছে ভোটের অঙ্ক

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তপশিল ঘোষণার আগেই ভোটের অঙ্ক কষতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই, একক প্রার্থী নিশ্চিত করা, অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনি সমীকরণ ঠিক করতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নানা ধরনের তৎপরতা চলছে। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা না করে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এমন নেতাদের দলীয় সমর্থন দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে কৌশলগত মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। জামায়াত এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও জোটের অন্য শরিকরা সমঝোতায় বেশি আগ্রহী। শরিকরা মনে করছেন, শেষ পর্যন্ত জামায়াতও সমঝোতার পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।

গতকাল রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ইঙ্গিত দেন, আগামী সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হতে পারে। এ ছাড়া নভেম্বরে ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট শুরু করতে চায় বলেও জানান তিনি।

বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থী মনোনয়ন বা ঘোষণা করবে না। শুধু সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে দলীয় সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। প্রার্থী বাছাইয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় আসনের জনপ্রতিনিধিদের মতামতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলার শীর্ষ নেতাদের মতামত নিয়ে যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তপশিল ঘোষণার আগেই অধিকাংশ এলাকায় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও শেষ করতে চায় বিএনপি। সে জন্য কেন্দ্র থেকে স্থানীয় নেতাদের একক ও যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দলের কেউ যেন ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী না হয় সে জন্য দলের দায়িত্বশীলরা কাজ করছে। কেউ ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, গত ৪ জুলাই থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীর গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের জেলা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। এরই মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। পর্যায়ক্রমে খুলনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ অন্য বিভাগের নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করার কথা রয়েছে। সর্বশেষ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে একক প্রার্থী বাছাইয়ে জেলার নেতাদের নির্দেশ দেন তারেক রহমান। দলের প্রার্থীদের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা এবং বিতর্কিত কাউকে দলের সমর্থন না দেওয়ার বিষয়েও নেতাদের সতর্ক করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা এবং উপজেলা চেয়ারম্যান বাছাইয়ে জেলার নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে প্রথমে জেলা, পরে বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা সমাধানের চেষ্টা করবেন। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার আগেই দলের যোগ্য প্রার্থী ঠিক করার পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির, যাতে তপশিল ঘোষণার পরপরই প্রতিটি এলাকায় দলের একক প্রার্থীকে সমর্থন দিতে পারে বিএনপি। দলের একাধিক নেতা মনে করেন, তপশিলের আগে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা গেলে দলের ভেতরের গ্রুপিং কোন্দল কমে আসবে। এতে নির্বাচনে সহিংসতা এড়ানো অনেকটাই সম্ভব হবে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য রুহুল কবির রিজভী কালবেলাকে বলেন, স্থানীয় নেতারা প্রতিটি এলাকায় জরিপ চালাবেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কে বেশি জনপ্রিয়, কার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা এবং কার বিজয়ের সম্ভাবনা বেশি—এসব বিষয় বিবেচনা করা হবে। স্থানীয়ভাবে এমন নেতা আছে যার হয়তো ক্ষমতা বা অর্থবিত্ত বেশি নেই, কিন্তু এলাকায় প্রচুর জনসমর্থন আছে। তাকেই দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে। তিনি জানান, ইউনিয়ন বা পৌরসভায় প্রার্থী বাছাইয়ে মতামত দেবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা বিএনপির নেতারা। আবার উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বাছাই করবেন সংশ্লিষ্ট জেলার নেতারা। স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় নেতারাই প্রার্থীদের সমর্থন দেবেন।

বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রভাবশালী অনেক স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইতে পারেন। প্রতিটি এলাকায় প্রার্থীও একাধিক। এতে তৃণমূলে গ্রুপিং ও কোন্দল বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থীরা পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছেন। অনুসারীদের নিয়ে আলাদাভাবে শোডাউনও করছেন কেউ কেউ। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ঠেকানোই এখন বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

এদিকে, বিএনপি দলীয় সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঢাকায় দৌড়ঝাঁপ বেড়েছে। অনেকেই ঢাকায় এসে নিজ নিজ আসনের সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। চিকিৎসা, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ঢাকায় এলেও স্থানীয় নির্বাচনে দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে এমপিদের সঙ্গে দেখা করাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। আবার এলাকায় এমপি গেলে তার সঙ্গে নিয়মিত দেখা সাক্ষাতের পাশাপাশি যোগাযোগ রাখছেন অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী। এটিই বিভিন্ন জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক নেতার এখনকার ব্যস্ততার চিত্র। কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হতে গেলে এমপির সমর্থন বেশি প্রয়োজন বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

জামায়াতের একক প্রস্তুতি, শরিকদের সমঝোতার আগ্রহ: স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যেও ভিন্ন ভিন্ন কৌশল দেখা যাচ্ছে। জামায়াত এখন পর্যন্ত এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে। তবে জোটভুক্ত দলগুলোর ভাবনা আলাদা। একাধিক দলের সূত্র জানায়, জামায়াতের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত সমঝোতা না হলে সেক্ষেত্রে জোটের শরিক দলগুলোর বিকল্প নির্বাচনি বোঝাপড়ার চিন্তাও রয়েছে। এ আলোচনায় জাতীয় নাগরিক পার্টিকেও (এনসিপি) যুক্ত করার চেষ্টা করছে তারা। পাশাপাশি জোটের বাইরে থাকা কয়েকটি দলের সঙ্গেও আলোচনা চলছে।

জামায়াতের সূত্র বলেছে, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা না হলেও এরই মধ্যে সারা দেশে জামায়াতের ৮০ শতাংশের বেশি এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করে প্রচারও শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশনের মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদ পর্যন্ত প্রার্থী বাছাই করে অনুমোদন দিয়েছে জামায়াত। প্রার্থী বাছাইয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত সমীকরণের কারণে মনোনয়ন না পাওয়া সিনিয়র ও যোগ্য নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো এলাকায় দলের নিজস্ব শক্তিশালী প্রার্থী না থাকলে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে সমর্থনের কৌশল নেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের নেতারা বলেছেন, ১১ দলীয় ঐক্য মূলত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় নির্বাচন প্রতিটি দলের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও স্থানীয় নেতৃত্ব যাচাইয়ের অন্যতম ক্ষেত্র। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে সমঝোতা করার পরিকল্পনা জামায়াতের নেই।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এইচএম হামিদুর রহমান আযাদ কালবেলাকে বলেন, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা জোট করেছি। অতীতেও স্থানীয় নির্বাচন কখনো জোটবদ্ধভাবে হয়নি। দলীয় প্রতীকও থাকছে না, এটা সবাইকে বুঝতে হবে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে সমঝোতা করতেই আমাদের কয়েক মাস কেটে গিয়েছিল। আর স্থানীয় নির্বাচনের কাঠামো অনেক বড়। এত বিপুলসংখ্যক পদে সমঝোতা বা সমন্বয় করতে কত সময় লাগতে পারে, এটা বুঝতে হবে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে কোথাও সমঝোতা হলে কেন্দ্র থেকে কোনো বাধা থাকবে না।

জোট শরিকদের ধারণা, শেষ মুহূর্তে জামায়াত জোটগত সমঝোতার আগ্রহ দেখাতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগেভাগে সারা দেশে একক প্রার্থী বাছাই করে রাখার কারণে দর-কষাকষিতে জামায়াত বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। এ কারণে পাল্টা কৌশল হিসেবে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলও বিভিন্ন এলাকায় একক প্রার্থী বাছাই করছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন কালবেলাকে বলেন, এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে আমরা তৃণমূল গোছানোর কাজে হাত দিয়েছি। বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা সফর করে কমিটি গঠনের পাশাপাশি সেখানে দলের প্রার্থীকে পরিচয়ে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে নির্বাচনি সমঝোতার সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত হয়নি। ভবিষ্যতে সমঝোতা হবে কি না, এটা এখনই বলা কঠিন। তবে সমঝোতা হলে জাতীয় নির্বাচনের মতোই প্রার্থী তুলে নেওয়া হবে।

জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করেছে। এ জন্য দলটি ৩০ সদস্য বিশিষ্ট একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে। দলের ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটকে আটটি জোনে ভাগ করে প্রার্থী বাছাইয়ের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। দলটির মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ কালবেলাকে বলেন, সারা দেশে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। আগামী সপ্তাহে দলের নির্বাচনি পরিচালনা কমিটি সারা দেশের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা জমা দেবে। শিগগির সারা দেশে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় প্রভাবসহ অনেক বিষয় থাকে। শেষ পর্যন্ত জেলা-উপজেলার যেখানে জোট শরিকদের ভালো প্রার্থী আছে, সেখানে তাকে স্থানীয়ভাবে সমর্থন দিয়ে অন্য প্রার্থীরা সরেও দাঁড়াতে পারে।