Image description

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তারকা সাকিব আল হাসান আজ নিজ দেশেই পরবাসী। টানা দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন দেশের ক্রিকেটের পোস্টার বয়। বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন হয়ে ইমরান খান ও কপিল দেবের মতো কিংবদন্তিদের পাশে নাম লিখিয়েছিলেন। যে সাকিবকে একসময় জাতীয় দলের জন্য অপরিহার্য মনে করা হতো, আজ তিনি দেশে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেছেন।

যে মানুষটি বছরের পর বছর বাংলাদেশ ক্রিকেটকে টেনে নিয়েছেন, তিনি দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন। রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত থেকে যে সমস্যার শুরু হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। আর তাতেই দেশে তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার পুরোপুরি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং সবশেষে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি–সব মিলিয়ে তার দেশে ফেরার আর কোনো পথ খোলা আছে বলে মনে হয় না।

প্রশ্ন এখন সাকিব কবে দলে ফিরবেন তা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো তিনি কি আর কোনোদিন জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারবেন? উত্তরটাও খুব পরিষ্কার। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর মাগুরা-১ আসনের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য সাকিব রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে পড়েন। ৫ আগস্টের পর থেকে আর তার দেশে ফেরা হয়নি।

একসময় ক্রিকেটপ্রেমীরা ক্রিকেটার সাকিব আর রাজনীতিবিদ সাকিবকে আলাদা করে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ আছে বলে মনে করেন না খেলাধুলা ও রাজনৈতিক অঙ্গনের মানুষেরা। তাদের মতে, সাকিবের বাংলাদেশের অধ্যায় এখানেই শেষ। এমনকি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলন নিয়ে কঠোর প্রতিবাদও জানিয়েছে ঢাকা।

দিল্লির ওই ভার্চ্যুয়াল অনুষ্ঠানে সাকিবের অংশ নেওয়া নিয়ে দেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক স্পষ্ট জানিয়ে দেন, সাকিবের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তার দেশে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এতদিন বিষয়টিকে যথেষ্ট নমনীয়ভাবে দেখছিলাম। কিন্তু এই ঘটনার পর আর আগের মতো ছাড় দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

তিনি আরও জানান, দেশে ফিরতে চাইলে সাকিবকে এখন আইনি পথেই আসতে হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘স্বৈরাচারের পাশে যিনি দাঁড়িয়েছেন, তার আর স্বাভাবিকভাবে ফেরার সুযোগ নেই। খেলোয়াড় হিসেবে আমরা তাকে একটু ভিন্ন চোখে দেখছিলাম এবং কিছুটা ছাড় দিচ্ছিলাম। সেটা আর সম্ভব নয়। দেশে আসতে চাইলে তাকে আইনি প্রক্রিয়া মুখোমুখি হয়েই আসতে হবে।’

অবশ্য সাকিব একাই নন। সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও ৫ আগস্টের পর থেকে আত্মগোপনে আছেন। নড়াইল-২ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য হওয়া মাশরাফি ২০১৮ সালে সক্রিয় খেলাধুলার মাঝেই রাজনীতিতে যোগ দেন। একজন মাঠের খেলোয়াড় হিসেবে সংসদ সদস্য হওয়া এবং ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ খেলা—বিশ্ব ক্রিকেটেই এক বিরল ঘটনা।

বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয়ও মানিকগঞ্জ-১ আসন থেকে দুইবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন, তবে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন খেলা ছাড়ার পর।

বিশ্ব ক্রিকেটে ইমরান খান, নবজ্যোত সিং সিধু, কীর্তি আজাদ, অর্জুনা রানাতুঙ্গা কিংবা সনথ জয়াসুরিয়ার মতো অনেকেই রাজনীতিতে এসে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তারা সবাই খেলাকে বিদায় জানিয়ে তবেই রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন।

বিসিবির সাবেক পরিচালক খন্দকার জামিল মনে করেন, সাকিবের খেলা চলাকালীন রাজনীতিতে আসাটা একদমই ঠিক হয়নি। টাইমস অব বাংলাদেশকে তিনি বলেন, সাকিবের ঘটনা দেশের সব খেলোয়াড়ের জন্যই এক বড় শিক্ষা।

তিনি বলেন, ‘সাকিবের এই পরিণতি ক্রীড়াঙ্গনকে একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে। খেলাধুলার ক্যারিয়ার চলাকালীন রাজনীতিতে আসা উচিত নয়। রাজনীতি করতে চাইলে অবসর নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত, তত দিন খেলাই হওয়া উচিত একমাত্র লক্ষ্য। সাকিবের এই পরিণতি আমাদের সেটাই শেখাল।’

আওয়ামী লীগ সাকিব ও মাশরাফিকে শুধু খেলার তারকা হিসেবে দেখেনি; দেখেছে জনপ্রিয়তার এক বিশাল উৎস হিসেবে, যা ভোটে কাজে লাগানো যায়। দলটি তাদের তারকা পরিচয় ব্যবহার করে রাজনীতির মাঠে নামায়। ফলে মাশরাফি ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এবং সাকিব ২০২৪ সালে সংসদ সদস্য হন।

তবে এই চাওয়াটা শুধু একতরফা ছিল না। দুই ক্রিকেটারও স্বেচ্ছায় রাজনীতিতে আসেন, দলীয় নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ হন এবং সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন। তাদের তারকা পরিচয় আওয়ামী লীগকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল, আর দলটির মাধ্যমে তারা পৌঁছে গিয়েছিলেন ক্ষমতার চূড়ায়।

সাকিব নিজেও রাজনীতিতে আসার আগ্রহের কথা গোপন করেননি। সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি জানান, রাজনীতিতে নামার আগে তিনি একজনের পরামর্শ নিয়েছিলেন।

সাকিব বলেন, ‘রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর আমি একজনের কাছে পরামর্শ চাই। তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি যদি করতেই হয়, তবে আওয়ামী লীগেই যোগ দাও।’

সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনার প্রতি তার অনুগত মনোভাব প্রকাশ পায়। শেখ হাসিনাকে ‘ক্যাপ্টেন’ হিসেবে উল্লেখ করে সাকিব বলেন, ‘ক্যাপ্টেন যা বলবেন, আমরা তা-ই শুনব। আমার বিশ্বাস তারা সঠিক সিদ্ধান্তই নেবেন এবং তাদের দেওয়া নির্দেশনাই আমরা মেনে চলব।’

তবে বিতর্ক শুধু রাজনীতিতেই আটকে থাকেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের একটি হত্যা মামলাতেও সাকিবের নাম এসেছে। এ ছাড়া কাঁকড়া খামার, সোনার বার ব্যবসা এবং শেয়ারবাজার কারসাজির মতো অভিযোগ তার ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষুণ্ণ করেছে।

একসময় যিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শুভেচ্ছা দূত ছিলেন, সেই সাকিব এখন শেয়ারবাজারে ২৫৬ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগের মুখোমুখি। জানা গেছে, দুদক তার জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে এবং দ্রুতই অভিযোগপত্র জমা দিতে পারে। তবে সাকিবের দাবি, তিনি শুধুই একজন সাধারণ বিনিয়োগকারী ছিলেন।

এ ছাড়া সাতক্ষীরার দাতিনাখালীতে তার কাঁকড়া খামার ‘সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম’ নিয়েও রয়েছে পুরনো বিতর্ক। ২০১৬ সালে তৈরি এই খামারের জন্য স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঁকড়া নেওয়া হলেও প্রায় ১ কোটি টাকা বকেয়া রাখা হয়, যা সাকিব বা তার অংশীদারেরা এখনো পরিশোধ করেননি।

এ নিয়ে সাকিবের নিজস্ব বক্তব্য রয়েছে। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ব্যাংকে আটকে থাকা তার হিসাবগুলো খুলে দেওয়া হলে তিনি বকেয়া সব টাকা মিটিয়ে দেবেন।

সাকিবের একসময়ের সতীর্থ ও বাংলাদেশের সাবেক এক অধিনায়ক নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাইমসকে বলেন, ‘এখন মনে হচ্ছে সাকিবের বাংলাদেশে ফেরার আশা খুবই ক্ষীণ। দেশের জন্য সে যা করেছে, তার ক্যারিয়ারের শেষটা এমন হওয়া সত্যিই দুঃখজনক। তবে রাজনীতিতে নামার আগে তার আরেকটু ভেবে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল।’