২০০১ সালে জামায়াতের সঙ্গে আসন নিয়ে টানাপোড়েনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য কর্ণেল অলি্ আহমদ বীর বীক্রম বিদ্রোহ করেন। কয়েকটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকলেও, সেবার সারাদেশে ২৯৯ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের আনুষ্ঠানিক জোট হয়েছিল। উন্মুক্ত ছিল তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৪ আসন। বিএনপির কর্নেল অলি ধানের শীষে এবং জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী ছিলেন দাড়িপাল্লার প্রার্থী।
কর্ণেল অলি তৎকালীন চট্টগ্রাম-১৩ আসনেও প্রার্থী হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে তিনি এই আসনটিতেই জিতলেও, জামায়াতের বিরুদ্ধে হেরে যান চট্টগ্রাম-১৪ আসনে। এ ঘটনার পর অলিকে মন্ত্রিসভায় রাখেননি খালেদা জিয়া। শুরু হয় তাঁর জামায়াতের সমালোচনা করে বিদ্রোহ।
অলি আহমদ মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের সহচর ছিলেন। একাত্তরের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান মেজর জিয়াউর রহমান যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, তখন অলি অষ্টম বেঙ্গলে ছিলেন তাঁর সেকেন্ড ইন কমান্ড। পরেরদিন বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণার সময়েও পাশে ছিলেন অলি। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সেক্টর-১ এ ব্রিগেড মেজর ছিলেন। পচাত্তরে জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হলে অলি হন তাঁর এডিসি। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হলে অলি হন তাঁর সামারিক সচিব।
সোজা বাংলায় জিয়াউর রহমানের ডানহাত ছিলেন তরুণ অলি আহমদ। চাকরি ছেড়ে ১৯৭৯ সালের নির্বাচন জিতে জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রী হন কর্নেল (অব.) ছিলেন। কর্নেল অলি এবং কর্নেল আকবর- এই দুইজন জিয়াউর রহমানের খুব ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দলের নেত্রী খালেদা জিয়াকে ঠিক সেইভাবে সমীহ করতেন না, যেটা অন্য নেতারা করতেন। অনেকটা দেবর-ভাবি সম্পর্ক ছিল।
১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে আবদুস সাত্তারের পরিবর্তে গৃহবধু খালেদা জিয়াকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে চেয়েছিলেন জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ জেনারেল (অব.) নুরুল ইসলাম শিশু এবং কর্নেল (অব.) আকবর। সেই সময়ে বিএনপিতে চরম কোন্দল চলছিল রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন নিয়ে। রাজনীতিতে অনিচ্ছুক খালেদা জিয়া বিএনপির বিভক্তি ঠেকাতে প্রার্থী হতে রাজি হননি। তবে সমর্থন করেন আবদুস সাত্তারকে।
প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজু্র রহমান, সিনিয়র নেতা বদরুদ্দোজা চৌধুরী, স্পিকার শামসুল হুদা চৌধুরী, আবদুল মতিনের মত প্রবীন নেতারা ছিলেন সাত্তারের ঘোর বিরোধী। এঁরা সবাই নিজেরাই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। মওদুদ আহমদ এবং অলি আহমদের নেতৃত্বে তখন ‘সিভিল-মিলিটারি যুব বলয়’ তৈরি হয়। জিয়াউর রহমানের অনুসারী এই তরুণ অংশও সাত্তার বিরোধী ছিল। খালেদা জিয়া রাজি না হওয়ায়, তাঁরা বিচারপতি আহসান চৌধুরীকে বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী করার চেষ্টা করে। কিন্তু তা সফল হয়নি আবদুস সাত্তারের প্রতি খালেদা জিয়ার সমর্থনের কারণে। খালেদা জিয়ার কারণেই শেষ পর্যন্ত সাত্তারকে সমর্থন করে অলি। কিন্তু ‘সিভিল-মিলিটারি যুব বলয়’ এর অন্য অনেকে তা করেননি।
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে আবদুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর বিএনপিতে শুরু হয় ভাঙন। সাত্তার বিরোধী বুড়ো নেতাদের একাংশ দল ছাড়েন। এরশাদের সঙ্গে হাত মেলান। তবে তাঁরা সাত্তার ক্ষমতায় থাকাকালেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা করেছিলেন। তারাই সাত্তারকে সরাতে সেনাশাসনকে উস্কে দিয়েছিলেন।
মার্শাল ল জারির পর শামসুল হুদা এবং আবদুল মতিন দল ভেঙে বিএনপি (হুদা-মতিন) গঠন করেন। শাহ আজিজ তৈরি করেন বিএনপি (এস)। তিন ভাগ হয় বিএনপি। এক্স আর্মি অফিসার হয়ে অলি বিরোধিতা করেন এরশাদের সেনাশাসনের।
কিন্তু 'সিভিল' নেতাদের বিএনপি (হুদা-মতিন) জাতীয় পার্টিতে বিলীন হওয়ার আগেই এরশাদের সঙ্গে হাত মেলায় । বিএনপিকে এক রাখতে খালেদা জিয়াকে ১৯৮৩ সালে সাত্তারের জীবদ্দশায় প্রথমে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। পরের বছর তিনি খালেদা জিয়াকে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নেন। সেই সময়ে খালেদা জিয়ার পাশে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের একজন কর্নেল অলি। বিএনপি তাঁকে ১৯৯১ সালে মন্ত্রী করে। ১৯৯৬ সালে দুটি আসনে মনোনয়ন দেয়।
২০০১ সালের নির্বাচন নিয়ে নিয়ে ঝামেলার ইতিহাস তো আগেই বলেছি। মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়া কর্নেল অলি পরবর্তী সময়ে জামায়াতের কঠোর সমালোচকে পরিণত হন। স্বাধীনতার বিরোধিতা করা দলটির সঙ্গে জোট করায় নিজ দল বিএনপিকে কথা শোনাতে শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধা অলি। ছাত্রশিবিরের অনুষ্ঠানে যাওয়ায় তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে কিছু কথা বলেন।
২০০৬ সালে বিরোধের চূড়ান্ত পর্যায় আসে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ সমাপ্তের মাত্র এক সপ্তাহ আগে তাঁর নেতৃত্বাধীন এলডিপি আত্মপ্রকাশ করে। ২৯ জন সাবেক ও বর্তমান এমপি-মন্ত্রীকে একসঙ্গে নিয়ে যান। বিএনপি ইতিহাসে একদিনে এত বড় ভাঙন হয়নি। নতুন দল করার পক্ষে কারণ হিসেবে অলি দুর্নীতি, অবমূল্যায়ন এবং জামায়াতের প্রভাবের কথা বলেছিলেন।
অলির এলডিপিতে একীভূত হয় বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারা। এলডিপি জোট করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে। যতদূর মনে পড়ে আওয়ামী লীগ ২০০৭ সালের নির্বাচনে এলডিপিকে ৩২টি আসন ছেড়েছিল। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও এলডিপি বর্জন করায় সেই নির্বাচন আর হয়নি। আসে ওয়ান-ইলাভেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে জোট ভেঙে যায় আওয়ামী লীগ ও এলডিপির। কর্নেল অলি এককভাবে নির্বাচন করে, নিজ দল থেকে একা জয়ী হন।
২০১২ সালে খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করে বিএনপির জোটে যোগ দেন। পরের বছর শেখ হাসিনা তাঁকে মন্ত্রী করতে চাইলেও রাজি হননি। বিএনপির সঙ্গে থাকেন ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এলডিপি মহাসচিব রেদওয়ান আহমদ আচমকা কিছু না জানিয়ে বিএনপিতে যোগদানে ক্ষোভে কর্নেল অলি যোগ দেন জামায়াত জোটে। এবার তিনি জোটটির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হচ্ছেন। রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই। রাজনীতি স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন।
-রাজিব আহমদ, সাংবাদিক