পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সব উদ্যোগ অবিলম্বে স্থগিত করা-সহ এই খাত নিয়ে ৬ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
এ বিষয়ে খসড়া নীতিমালাসহ সংশ্লিষ্ট সব নথি প্রকাশ্যে উন্মুক্ত করা এবং কমপক্ষে ৬০ দিনের জনমত গ্রহণের সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছে দলটি।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে আল-ফালাহ মিলনায়তনে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব দাবি জানান।
পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার সরকারি উদ্যোগ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান জানাতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
৬ দফা দাবির মধ্যে আরও রয়েছে—সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অধীনে উন্মুক্ত শুনানি করতে হবে, যেখানে বিরোধী দল, ক্যাব, সিপিডি, বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, শ্রমিক ফেডারেশন ও ভোক্তা প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাবেন; বেসরকারিকরণের বদলে বিপিসির সংস্কার, স্বাধীন নিরীক্ষা, বোর্ডে পেশাদার নিয়োগ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ, প্রতি ত্রৈমাসিকে আমদানি মূল্য ও পরিমাণের তথ্য উন্মুক্তকরণ; ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) ও কৌশলগত মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জ্বালানি খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের আইনি সুরক্ষা খর্ব করার সব সুপারিশ প্রত্যাহার করতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা বাজার অর্থনীতির বিরোধী নই। আমরা বেসরকারি বিনিয়োগেরও বিরোধী নই। আমরা বিরোধী জবাবদিহিহীন হস্তান্তরের এবং দুর্নীতির সুযোগ বিস্তারের। প্রতিযোগিতা মানে একচেটিয়া হাতবদল নয়। সংস্কার মানে প্রতিষ্ঠান মেরামত, প্রতিষ্ঠান বিক্রি নয়। জ্বালানি নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়। আমরা চাই সরকার নিজেই এই ভুল পথ থেকে সরে আসুক। জনগণের সম্পদ জনগণের হাতেই থাকবে।
তিনি আরও বলেন, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের কাজ বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার নতুন নীতিমালা তৈরির বিষয়ে সরকার প্রকাশ্যে কথা বলছে না। চলছে ষড়যন্ত্র, নথির আড়ালে ও বন্ধ দরজার ভিতরে। বিষয়টি হচ্ছে প্রসঙ্গ। অথচ এই সিদ্ধান্তের চড়া মূল্য দিতে হবে প্রতিটি মানুষকে, প্রতিটি বাসের ভাড়ায়, প্রতিটি সেচপাম্পের ডিজেলে, প্রতিটি চালের বস্তার দামে।
তিনি বলেন, হঠাৎ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার পর জ্বালানি খাতকে বেসরকারি কোনো শিল্পগ্রুপের হাতে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। নতুন চেয়ারম্যানকে দায়িত্ব দেওয়ার চার দিনের মাথায় বেসরকারি পর্যায়ে পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিতরণ ও বিপণনের জন্য চার দিনের মধ্যে খসড়া নীতিমালা তৈরির নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই: এটি সংস্কার নয়, এটি হস্তান্তর। এটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি দুর্নীতি ও লুটপাটের লাইসেন্স।
গোলাম পরওয়ার বলেন, গত ৬ আগস্ট বাংলাদেশ অয়েল, গ্যাস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স ফেডারেশন চট্টগ্রামে জরুরি সভা করে প্রকাশ্যে অভিযোগ তুলেছে, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, বিক্রয় ও বিপণন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ‘পাঁয়তারা’ চলছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা, যমুনা ও এলপিজির সিবিএ নেতারা একবাক্যে বলেছেন—এটি সরকারের জন্য আত্মঘাতী এবং দেশের জন্য বিপজ্জনক।
তিনি বলেন, এই অভিযোগ কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তোলেনি। তুলেছেন সেই মানুষগুলো, যারা তিন দশক ধরে এই খাতের ভেতরে দাঁড়িয়ে কাজ করছেন। তারা বলছেন, সরকারের ভেতরেই ‘ঘাপটি মেরে থাকা’ একটি দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী চক্র এই সিদ্ধান্ত সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে। যে খসড়া নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে কাজ হচ্ছে, তা জনগণের সামনে নেই কেন—সেটি নিয়ে আমাদেরও প্রশ্ন।
সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।