Image description

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান সফল হয়, ক্ষমতাচ্যুত হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদ পূরণ করা সরকারের। লাখো মানুষের উচ্ছ্বাসের মধ্যে নরক নেমে আসে যশোর শহরের চিত্রা মোড়ের পাঁচতারকা হোটেল ‘জাবির ইন্টারন্যাশনালে’। সেখানে আগুনে প্রাণ যায় ২৪ জনের।

তাদের মধ্যে একজন বিদেশি, অনেকেই আগুনে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। তবে সুযোগ সন্ধানী লুটপাটকারীও ছিলেন। নিহতদের স্বজনদের আক্ষেপ, দুই বছর পরে এসে শুনতে হচ্ছে অপবাদ। দুই বছরেও সেই ঘটনায় কাউকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি।

আগুনের পর অজ্ঞাতনামা ২০০ জনের নামে যে মামলা হয়েছিল, তার তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মিরাজুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইতিমধ্যেই ছয়জন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগুনের ঘটনাটি পরিকল্পিত নাশকতা বা নাশকতাকারীদের অনুপ্রবেশের মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

কী ঘটেছিল সেদিন

শহরের চিত্রা মোড়ের হোটেলটির মালিক ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার। সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই হোটেলটির ওপর। আন্দোলনকারীরা হোটেলটিতে ভাঙচুর চালায় এবং একপর্যায়ে আগুন দেওয়া হয়।

সেই আগুনে আটকে পড়ে অনেকে। পুড়ে ও বিষাক্ত ধোঁয়ায় দম আটকে একে একে প্রাণ হারান তারা।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যশোর জেলার সাবেক সদস্য পরশ আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন চাঁচড়া থেকে আনন্দ মিছিল পোস্ট অফিসে সামনে আসি, তখনই খবর আসে জাবির হোটেলে আগুন লেগেছে। আমরা দ্রুত সেখানে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি ফায়ার সার্ভিস নিচে পানি দিচ্ছে, কিন্তু ওপরে মানুষ আটকা। উদ্ধার করতে গিয়ে আমাদের ভাইয়েরাও ভেতরে আটকা পড়ে পুড়ে মারা যায়।’

মৃতদের ‘দুর্বৃত্ত অপবাদ

জাবিরে নিহতদের ‘দুর্বৃত্ত’ অপবাদ দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্বজনরা।

 

প্রাণ হারানো মাহির বাবা সাহিদুর রহমান সাইদ বলেন, ‘আমার ছেলে জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল। হোটেলে আটকে পড়াদের উদ্ধার করতে গিয়ে ও মারা গেছে। জুলাই ফাউন্ডেশন আমাদের সম্মাননা দিয়েছে। অথচ কিছু মানুষ আজ আমার ছেলেকে চোর বানাতে চায়।’

মাহির মা আইরিন সুলতানা বলেন, ‘মায়ের বুক খালি হয়েছে, রাষ্ট্র আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সমাজ যখন আমার নিষ্পাপ সন্তানকে নিয়ে নোংরা কথা বলে, তখন মরে যেতে ইচ্ছে করে।’

জাবিরের ঘটনার কোনো রকম পক্ষপাতিত্ব ছাড়া নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন এই মা।

মানুষ বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু রিয়াদের

শহরের চাঁচড়া রায়পাড়া এলাকার বাসিন্দা কাবিল শেখ ও শাহিনুর বেগমের ছোট ছেলে ১৮ বছর বয়সী রিয়াদ শেখ। যশোর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ৫টি পরীক্ষা দিলেও সেই পরীক্ষা আর শেষ হয়নি।

৫ আগস্টের দুপুরে টেলিভিশনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর দেখে ভাত মাখানো থালা রেখেই বিজয় মিছিলে যোগ দিতে মণিহার মোড়ের দিকে ছুটে যান রিয়াদ। ফেরার পথে দেখেন, জাবির হোটেলে আগুন জ্বলছে এবং ভেতরে আটকা পড়েছে বহু মানুষ।

 

নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে ধোঁয়ার মধ্যে ভেতরে ঢুকে তিন থেকে চার জনকে অক্ষত অবস্থায় বের করে আনেন রিয়াদ ও সহযোগীরা। এরপর আবার ভেতরে যান বাকিদের বাঁচাতে। কিন্তু ভেতরে থাকা বড় বড় গ্যাস সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরিত হতে থাকলে আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায়। রিয়াদ ও তার সহযোগীরা তাতেই পুড়ে মারা যান।

রিয়াদের মা শাহিনুর বেগম টাইমসকে বলেন, ‘মানুষের জীবন বাঁচাল আমার ছেলে, আর ও নিজেই পুড়ল। জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে পাঁচ লাখ আর ডিসি অফিস থেকে দুই লাখ টাকা দিল, ওর ঘড়ি-গেঞ্জি জাদুঘরে নিয়ে গেল, কিন্তু আমার ছেলে আজও শহীদের মর্যাদা পেল না কেন?’

ছোট ভাইকে উদ্ধারে জাবির হোটেলের ভেতরে ঢুকেছিলেন রিয়াদের বড় ভাই হৃদয় শেখ। কিন্তু পাইপ নিয়ে তিনতলায় ওঠার মুহূর্তে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ ঘটে। এতে একটি লম্বা সরু কাচের টুকরো ডান পায়ে বিদ্ধ হয়।

হৃদয় বলেন, ‘কারা চুরি করতে গেছিল আর কারা উদ্ধার করতে গেছিল, তা বের করা গোয়েন্দাদের জন্য কঠিন না। যারা মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে মারা গেল, তাদের আজকে চোর অপবাদ সইতে হচ্ছে।’

 

নিজের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি কি চুরি করতে গিয়েছিলাম? অহেতুক গেজেট প্রকাশে দেরি করে আমাদের শহীদদের অপমান করা হচ্ছে।’

এক পায়ে রিকশা টেনে চলছেন আল-আমিনের বাবা

যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর হঠাৎপাড়া এলাকার জরাজীর্ণ ঘরে বাস করেন মো. আলমগীর হোসেন ও মমতাজ বেগম। ২০১৯ সালের ১১ মে সড়ক দুর্ঘটনায় আলমগীরের ডান পা সম্পূর্ণ বিকল হয়ে যায়।

সংসারে আশার প্রদীপ ছিলেন একমাত্র সন্তান আল-আমিন বিশ্বাস, যিনি বাবার দুর্ঘটনার পর একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে কাজ নেন। পরে বাবা এক পায়ে ভর করেই রিকশা চালানো শুরু করলে ছেলেকে কলেজে ভর্তি করানো হয়। তিনি স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন।

৫ আগস্ট দুপুরে ঘর থেকে বের হন এই তরুণ। সে সময় দাদি রোকেয়া বেগমকে বলেছিলেন, ‘আমি বাংলাদেশ স্বাধীন করে আসছি।’ তবে আল আমিন আর ফেরেননি। তিনিও মারা গেছেন জাবির ইন্টারন্যাশনালে।

মমতাজ বেগম বলেন, ‘আমার একটাই সন্তান ছিল, এখন আমরা কারে নিয়ে বাঁচব?’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল শহীদ গেজেটের ২৬৬ নম্বরে আল-আমিনের নাম আছে।

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘জাবির হোটেলের আগুন আমার সব শেষ করে দিল। অথচ সমাজ আজ ওরে চোর বানাতে চায়!’

ছোট্ট নীলের জন্য মায়ের বুকে ক্ষত

আরেকটি করুণ গল্প ফুটফুটে শিশু আট বছর বয়সী আবরার মাশরুন নীলের। ৫ আগস্ট বড় ভাই জিলের সঙ্গে মিছিলে ছিল সেও। জিল ঘরে ফিরলেও, হারিয়ে গেছে নীল।

নীলের মা জেসমিন আক্তার বলেন, ‘জাবির হোটেলের আগুন আমার বুকটা চিরতরে খালি করে দিল। আমি কারে নিয়ে বাঁচব?’

প্রাণ হারানো আলিফের মা মিম আক্তার বলেন, ‘দিনটার কথা মনে হলে আজো রাতে ঘুমাতে পারি না।’

ইউসুফের মা শাহীনা আক্তার বলেন, ‘হাসপাতালের মর্গে যখন আমার ১৫ বছরের ছেলে ইউসুফের লাশ পাই, তখনও ওর মাথায় একটা অর্ধপোড়া জাতীয় পতাকা জড়ানো ছিল। দেশের জন্য মরেও আজ ওরে চোর অপবাদ শুনতে হয়। এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী আছে!’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক রাশেদ খান বলেন, ‘যশোরের আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ। আমরা কোনো ভাঙচুর বা সহিংসতা প্রশ্রয় দিইনি। কিন্তু ৫ আগস্ট দুপুরের পর পুরো সমীকরণটাই একটা মহলের ইন্ধনে বদলে দেওয়া হয়, যার দায় আজো শিক্ষার্থীদের নিতে হচ্ছে।’

প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাবির ট্র্যাজেডির জট খুলতে এবং নিহতদের প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

যশোরের ডিসি মোহাম্মদ আশেক হাসান জানিয়েছেন, ঢাকা ও আশুলিয়ায় যশোরের ৩ শিক্ষার্থী ও জাবির ট্র্যাজেডিতে নিহতদের মধ্যে মোট ২০ জনের নাম ইতিমধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক তালিকায় তাদের শহীদি মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।