রাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান অস্থিরতা, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ভবিষ্যৎ, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং দেশে নতুন করে ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা—এসব বিষয় নিয়ে বিস্তৃত বিশ্লেষণধর্মী একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সাপ্তাহিক জনতার চোখ। ১ আগস্ট প্রকাশিত সংখ্যায় ‘রাজনৈতিক ভাষ্যকার’ ছদ্মনামে প্রকাশিত ‘ষড়যন্ত্র চলমান, ঝড়ের মুখে পড়তে পারে দেশ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অতীতের নানা ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতর স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস টেনে এনে বলা হয়েছে, হঠকারী রাজনৈতিক কৌশল কখনো স্থায়ী সাফল্য এনে দেয় না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক শক্তিকে দুর্বল করে। লেখকের ভাষ্য, “হঠকারিতা দিয়ে হঠকারিতাকে মোকাবিলা করা যায় না।” এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতার পর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর উত্থান, গণবাহিনী গঠন, রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিণতির বিশদ বর্ণনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জাসদের নেতৃত্বের কিছু বক্তব্য ও রাজনৈতিক কৌশল শেষ পর্যন্ত দলটির সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দেয় এবং বাংলাদেশের রাজনীতিকে ভিন্ন পথে ঠেলে দেয়। সেখানে বলা হয়েছে, “জাসদ নেতারা বক্তৃতায় উঠেই শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে জুতা বানানোর কথা বলতেন। ... সস্তা জনপ্রিয়তার পথটাই তারা বেছে নিয়েছিলেন।”
একই সঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালীন সরকারও কঠোর দমননীতির আশ্রয় নিয়েছিল। জাসদ, গণবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার সংঘাতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি সামরিক শাসনের দিকে অগ্রসর হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল বলে লেখকের মূল্যায়ন।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে বর্তমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) রাজনীতির সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা এনসিপির প্রতি মানুষের শুরুতে ব্যাপক প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু দলটি দ্রুত ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েছে বলে লেখকের অভিযোগ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “মব সন্ত্রাসকে তারা বেছে নেয় সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে।” যদিও এ বক্তব্যের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এনসিপির কয়েক নেতার বক্তব্য সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। তবে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যকে তুলনামূলক সংযত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা। কিন্তু দুই বছরের মধ্যে সেই ঐক্যে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঐতিহাসিক সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ভুল রাজনীতির কাছে তিনি অসহায় আত্মসমর্পণ করেন।” লেখকের মতে, এই বিভক্তির সুযোগ নিচ্ছে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি।
প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, স্বাধীনতার পর যেমন পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি জাসদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিল, তেমনি বর্তমান সময়েও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সেখানে বলা হয়েছে, “পরাজিত শক্তি বাহবা দিচ্ছে। এনসিপির পালে হাওয়া লাগানোর ফন্দি-ফিকির করছে নানাভাবে।”
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে এনসিপির সম্পর্ক নিয়েও বিশ্লেষণ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। লেখকের দাবি, দল দুটির সম্পর্ক নিয়ে এনসিপির ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জের একটি ঘটনার পর জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে এনসিপির একাংশ অসন্তুষ্ট হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “শেখ হাসিনা নানাভাবে চেষ্টা করছেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে। উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করছেন পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করতে।” এ দাবির পক্ষে কোনো নতুন তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি; বরং এটি লেখকের রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে এসেছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের প্রসঙ্গও প্রতিবেদনে এসেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, তার বিদায়ের পেছনেও “ষড়যন্ত্রের আলামত” রয়েছে। এমনকি বঙ্গভবন ছাড়ার দিন তিনি এক ঘনিষ্ঠজনকে বলেছেন বলে একটি উদ্ধৃতিও প্রকাশ করা হয়েছে। তবে ওই দাবির কোনো স্বাধীন উৎস বা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদনের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো সরকারের পাঁচ মাসের কার্যক্রমের মূল্যায়ন। সেখানে বলা হয়েছে, “তারেক রহমানের পাঁচ মাস বয়সী সরকার ইতিমধ্যেই অনেক বিতর্কিত এবং স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা এই মুহূর্তে প্রয়োজন ছিল না।”
প্রতিবেদনে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত আচরণ সম্পর্কে তুলনামূলক ইতিবাচক মূল্যায়নও রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন পর্যন্ত বড় কোনো ভুল করেননি। ... মোটাদাগে বলা যায়, মানুষ খুশি।” তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা গঠন, কিছু নিয়োগ এবং উপদেষ্টা পরিষদের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত সরকারকে বিতর্কের মুখে ফেলেছে।
লেখকের মতে, সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে ঘোষিত রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে বাস্তব সিদ্ধান্তের অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সরকারি সংস্থায় যে ক’জন নেতাকে নিয়োগ দেওয়া হলো, তাতে রীতিমতো ৩১ দফাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।”
এ ছাড়া সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে সামনে রেখে আবেগ নয়, বিচক্ষণতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভুল সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
প্রতিবেদনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যও উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তাঁর ভাষায় বলা হয়েছে, “কোনো কিছুই বদলায়নি। শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী ছাড়া।” একই সঙ্গে তিনি প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল থাকার অভিযোগ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও মির্জা ফখরুল প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে এবং গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও নতুন ধরনের প্রশাসনিক চাপের অভিযোগ উঠছে। যদিও এসব দাবির পক্ষে পরিসংখ্যান বা সরকারি তথ্য প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের একটি অংশও মনে করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ ব্যবসায়িক আস্থা দুর্বল করে।
প্রতিবেদনের শেষাংশে গণমাধ্যমের ভূমিকাও আলোচনায় এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, স্বাধীন গণমাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য অপরিহার্য হলেও ক্ষমতাকেন্দ্রিক বা পক্ষপাতদুষ্ট সংবাদমাধ্যম দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। লেখকের ভাষায়, “গদি মিডিয়া কখনো কারও বন্ধু হয় না। এরা দেশ ও জাতির ভাগ্য নিয়ে খেলে শাসকের স্বার্থে।”
সবশেষে প্রতিবেদনে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশ যদি এর বাইরে থাকে তবে দেশটা এগিয়ে যাবে। তা না হলে দেশটি ঝড়ের মুখে পড়তে পারে। ইতিমধ্যেই নানা ষড়যন্ত্র চলমান।”
জনতার চোখের এই প্রচ্ছদ প্রতিবেদন মূলত একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধ। এতে লেখকের নিজস্ব মূল্যায়ন, ঐতিহাসিক তুলনা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ স্থান পেয়েছে। প্রতিবেদনে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ, আশঙ্কা ও মূল্যায়নের অনেকগুলোর পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে এগুলোকে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনার বিশ্লেষণ ও মতামত হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সরকার, বিরোধী দল, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আস্থা পুনর্গঠন, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। সেই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিশ্লেষণ ও মতামত জনপরিসরে আলোচনার অংশ হলেও সেগুলোর তথ্যভিত্তিক যাচাই এবং বহুমাত্রিক মূল্যায়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।