গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর কেটে গেছে। কিন্তু ফেনীর অনেক পরিবারের কাছে সময় যেন থমকে আছে ২০২৪ সালের ৪ আগস্টেই। দেয়ালে ঝুলছে প্রিয় সন্তানের ছবি, বুকভরা শোক আর ন্যায়বিচারের অপেক্ষা নিয়ে দিন পার করছেন বাবা-মা। আন্দোলনে আহত অনেকেই এখনও শরীর ও মনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, হত্যা মামলাগুলোর বিচার এখনো শেষ হয়নি, আর অনেক অভিযুক্ত এখনো আইনের আওতার বাইরে।
২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলা ও গুলিতে সাত ছাত্র-জনতা নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হন। ওই ঘটনার দুই বছর পরও শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতরা বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
আহত জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনীর মহিপালে গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ দেন পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের ওয়াকিল আহমেদ শিহাব। তিনি শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনে নিয়মিত অংশ নিতেন। সে সময় তিনি মোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজ করতেন। ৪ আগস্ট মায়ের কাছে চুল কাটানোর কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। পরে বন্ধু সরোয়ার জাহান মাসুদের সঙ্গে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যোগ দিতে ফেনীর মহিপালে যান। তারা মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে দুপুর ২টার দিকে পুলিশ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা চারদিক থেকে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাদের ছোড়া তিনটি গুলি শিহাবের বুকে লাগে। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
নিহত ওয়াকিল আহমেদ শিহাবের মা মাহফুজা আক্তার বলেন, এখনো প্রতি রাতে ছেলেকে খুঁজে বেড়াই। ঘুমাতে পারি না। চলতে-ফিরতে ছেলেকে মনে পড়ে। জানি, আমার ছেলে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। অন্তত তার হত্যাকারীদের বিচার দেখে মরতে চাই। কিন্তু দুই বছরেও অনেক আসামি ধরা পড়েনি, বিচারও শেষ হয়নি।
আন্দোলনে অংশ নিতে ৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়ে মহিপালে যান ডিগ্রি অধ্যয়নরত দাগনভূঞার সরোয়ার জাহান মাসুদ। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি উত্তাল জনতার সঙ্গে মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে মোটরসাইকেল নিয়ে অবস্থান করছিলেন। হঠাৎ দুপুর ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে স্টার লাইন বাস কাউন্টারের দিকে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর সশস্ত্র হামলা ও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। মাসুদ মোটরসাইকেল নিয়ে সেখান থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে সার্কিট হাউস সড়কে সন্ত্রাসীদের গুলির মুখে পড়েন। একটি গুলি তার বুকে বিদ্ধ হলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান।
শহীদ সরোয়ার জাহান মাসুদের মা বিবি কুলসুম জাহান বলেন, ছেলেকে হারানোর কষ্ট কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু বিচার না হওয়ার যন্ত্রণাও প্রতিদিন আমাদের তাড়া করে বেড়ায়।
আন্দোলনে আহতদের অনেকেই এখনও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। কারও শরীরে গুলির চিহ্ন, কারও জীবনে স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা, আবার কেউ মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাদের প্রশ্ন—যে আত্মত্যাগের বিনিময়ে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই রক্তের ন্যায়বিচার কবে নিশ্চিত হবে?
আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, শহীদদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। বিচার বিলম্বিত হলে মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
সাবেক ছাত্র সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম বলেন, আমরা যারা গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের পরিবারের একটি দাবি ছিল ন্যায়বিচার। তারা সেই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। ফলে আমরা আশঙ্কা করছি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আবারও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, বিচারকার্য চলমান থাকলেও তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে শেষ করা জরুরি। কোনো শহীদ পরিবার যেন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।
অন্যদিকে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার বলেন, গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া হত্যা ও সহিংসতার মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে অভিযোগপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ফেনীর মহিপাল হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সাতটি হত্যা ও ১৫টি আহতের মামলা দায়ের হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় আড়াই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। তবে এখনও অনেক অভিযুক্ত পলাতক রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।