Image description

দিন দিন বাড়ছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আ’লীগের রাজনৈতিক তৎপরতা। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দলটির নেতা-কর্মীদের ঝটিকা মিছিল এবং দলীয় কার্যালয় উদ্বোধনসহ নানা কর্মকা-ের মাধ্যমে রাজনৈতিক ময়দানে তারা সরব হচ্ছে। শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, সাংস্কৃতিক অঙ্গন, মিডিয়া, প্রশাসন, আইন অঙ্গন সর্বত্রই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা সক্রিয় হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান সরকারে নমনীয় মনোভাবের কারণে ঘাপটি মেরে বা পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছেন। সরকারের এই নমনীয়তা আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ সুগম করতে পারে বলেও তারা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে সুর্নিদিষ্ট মামলা থাকার পরও পুলিশ তাদের গ্রেফতারে কোন পদক্ষেপ নিচ্ছে না। অনেকে আদালত থেকে জামিন নিয়ে দিব্যি দল পুনর্গঠনে কাজ করছেন। আইন অঙ্গনে আওয়ামী লীগের যে সব নেতা এতদিন পালিয়ে ছিলেন তারা আবার চেম্বার খুলে বসেছেন। আদালতে কাজ শুরু করেছেন। মিডিয়াতে আওয়ামী সমর্থকরা আবার সক্রিয় হচ্ছেন। আসলে শেখ হাসিনার সময়ে মিডিয়া যারা নিয়ন্ত্রণ করতেন এখনো তারাই মূল দায়িত্বশীল জায়গাগুলোতে বসে আছেন। তারা শেখ হাসিনাকে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করার নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মদদে একদল সাংবাদিক বা মিডিয়াকর্মী আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পনর্বাসনের জন্য কাজ করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এর মধ্যে আনিস আলমগীর, জ,ই মামুন, আব্দুন নূর তুষার, মাসুদ কামাল, সোমা ইসলাম, মাহাবুব আজিজ, মঞ্জুরুল আলম পান্নাসহ আরও অনেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধুয়া তুলে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কথা বলে ইনিয়ে বিনিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে বয়ান তৈরির চেষ্টা করছেন। তারা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একাত্তরের সাথে মিলিয়ে চব্বিশের জুলাইকে বিতর্কিত করছেন। অথচ সরকার এসব ব্যাপারে নিরব। উল্টো সরকারের অনেককেই তাদের সাথে সুর মিলিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। টকশোতে গিয়ে তারাও ওইসব আলোচকদের মতো বক্তব্য দিচ্ছেন। মিডিয়া কর্মীদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মীরাও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে। তাদের মধ্যে মেহের আফরোজ শাওন, মাহিয়া মাহিসহ আরও কয়েকজন জুলাই বিপ্লবকে নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য দিচ্ছেন। এটি এখন সর্বত্রই বেশ আলোচিত। 

এ ছাড়া প্রশাসনেও এখনো আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মকর্তারা বহাল তবিয়তে কাজ করছেন। জুলাই আন্দোলনের সময় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি করার যিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন সেই কর্মকর্তাকে সম্প্রতি বদলি করা হয়েছে। এরকম চিহ্নিত আওয়ামী লীগ সমর্থক কর্মকর্তা এখনো প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ঘাপটি মেরে রয়েছেন। তারা এখন ভোল পাল্টে বর্তমান সরকারের সাথে মিশে গেছেন। আর তাদেরকে প্রশ্রয়ও দিচ্ছেন সরকারি দলের নেতারা। তবে সময় সুযোগ পেলেই এসব কর্মকর্তা স্বরূপে ফিরে আসবেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দলের শীর্ষ নেতারাও গা ঢাকা দেয়। গুটিকয়েক নেতা গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকলেও বেশির ভাগই দলের সভাপতিকে অনুসরণ করে বিদেশে পালিয়ে গেছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর থেকে ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা একেবারেই আত্মগোপনে চলে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় আওয়ামী লীগ তাদের কোন কার্যক্রম এমনকি ঝটিকা মিছিল করতেও সাহস করেনি। কারণ, ওই সরকার আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ছিল অত্যন্ত কঠোর। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাদের সাথে বিএনপি এবং জামায়াত আঁতাত করেছে এমন আলোচনা রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে।

আর তারই প্রতিফলন এখন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের তৎপরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে। তবে সরকার এ বিষয়ের সাথে একমত নয়। গত ৪ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ অংশ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পতন হয়েছে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে নিপাত হয়েছে, নির্মূল হয়েছে, দাফন হয়ে গেছে দিল্লিতে। সেই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে আর কোনো দিন রাজনীতি করতে পারবে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করেছি আমরা, অন্যরাও দাবি করেছেন। তদন্ত হচ্ছে। ইনশা আল্লাহ, খুব শিগগির রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়া হবে। সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইন সংশোধন করা হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আছে, রাজনৈতিক দলের, সংগঠনের বিচার করা যাবে।’

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা তদন্ত করছে। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ পাওয়া গেলে দলটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।

তবে সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কথার সাথে তাদের কাজের কোন মিল পাওয়া যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের নেতারা যারা অনেক মামলার আসামী তারা এখন প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করছে না। অনেক স্থানে আওয়ামী লীগ অফিস খুলছে তাতে তেমন বাধা দেয়া হচ্ছে না। সরকারি দলের কিছু নেতার সহযোগিতায় বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের নেতারা সক্রিয় হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বা সমর্থকদের এসব কর্মকা- সবই সরকারি দলের কিছু নেতাকর্মীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ৪ জুলাই রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জুলাই ২৪ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাইযোদ্ধা’ কেন্দ্রীয় কমিটির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত শহীদদের স্মরণে যে বিশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তাতে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন।

সূচনা নামের যিনি এই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেছেন তিনি আওয়ামী লীগের গবেষণা সেল (সিআরআই) এর অলোচিত সদস্য বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। এভাবেই বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে এক ধরনের আঁতাত বা সখ্যতা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয় হচ্ছেন। এ ছাড়া বিএনপির অনেক নেতাও পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগের এজেন্ট হিসাবে ভূমিকা পালন করছে এমন আলোচনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে শোনা যাচ্ছে। ভারত তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসন করতে মরিয়া হয়ে কাজ করছে। ভারতে গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এ ব্যাপারে সক্রিয় রয়েছে। তাদের হয়ে বিএনপির অনেকে কাজ করছে বলেও আলোচনা রয়েছে। এর মধ্যে দু’একজন এমপি সংসদে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে বক্তব্য দিয়ে প্রকারান্তরে আওয়ামী লীগের পক্ষে ভূমিকা রাখছেন বলে অনেকে মনে করছেন।

বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানো খুবই কঠিন। তবে সরকারের নমনীয়তা তাদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সরকার বলছে আইন করে তাদের নিষিদ্ধ করা হবে। তা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। আওয়ামী লীগকে চব্বিশে জুলাইয়ে যেভাবে দেশের ছাত্র-জনতা মোকাবেলা করছে সেভাবেই রাজনৈতিক ময়দানে তাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট পাওয়া প্রতিযোগিতায় অনেকে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করেছেন। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সে নির্বাচনে যদি এমন গোপন আঁতাত চলে তাহলে আওয়ামী লীগ ফিরে আসার পথ সুগম হতে পারে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের আর রাজনীতিতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। যাদের হাত হাজারো ছাত্র ও সাধারণ মানুষের রক্তে রঞ্জিত, দেশের মাটিতে তাদের রাজনীতি করার অধিকার বা সুযোগ আর নেই। জুলাইয়ের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের রক্তের সাথে বেইমানি করে যারা তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করবে, জাতি তাদের ক্ষমা করবে না।

আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, সরকার ও বিভিন্ন মহলে আওয়ামী লীগকে নতুন করে পুনর্বাসন করার আকাক্সক্ষা দেখা যাচ্ছে। দিল্লির প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর একটি প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছি। অতীতে ১৯৭৯ সালে বিএনপিই প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করেছিল। সাম্প্রতিক সময়েও যদি কেউ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করে বা ভারতের স্বার্থ রক্ষার রাজনীতি করে, তবে তাদের পরিণতি আওয়ামী লীগের চেয়েও ভয়াবহ হবে। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। দেশে আর কখনো আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।