চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির নির্বাচনি রাজনীতি এখন এক অভিনব ও জটিল সমীকরণে রূপ নিয়েছে। ত্রয়োদশ (১৩তম) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারিভাবে বিজয়ী বিএনপি নেতা লায়ন আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা বাতিল হয় সর্বোচ্চ আদালতে। এরপর থেকেই আসনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আইনি লড়াই যেমন তুঙ্গে, তেমনি পর্দার আড়ালে শুরু হয়েছে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ। একদিকে মাঠপর্যায়ে আসলাম চৌধুরীর বিপুল জনপ্রিয়তা ও প্রভাবের কারণে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছেন না। অন্যদিকে আইনি সংকটের কারণে দলটির হাইকমান্ডের পরবর্তী বিকল্প প্রার্থী হিসেবে সাবেক মনোনীত প্রার্থী কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে মূল আলোচনা।
মাঠের ‘আসলাম’ বনাম কেন্দ্রের ‘গুড বুক’
সীতাকুণ্ডে বিএনপির রাজনীতিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন লায়ন আসলাম চৌধুরী। দীর্ঘ ৮ বছর কারাবন্দি থাকার কারণে স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার প্রতি এক ধরনের বড় সহানুভূতি কাজ করছে। নিজে চরম প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেও কারাবাসের দীর্ঘ সময়ে তিনি জেলে থাকা দলের অন্যান্য নির্যাতিত ও ত্যাগী নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং নানাভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে মাঠ পর্যায়ের ও তৃণমূলের বড় সমর্থন রয়েছে তার দিকে।
তবে রাজনৈতিক মহলে জোরালো গুঞ্জন রয়েছে—মাঠের এই জনপ্রিয়তার বিপরীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের ‘গুড বুকে’ (সন্তুষ্টির তালিকায়) তিনি এই মুহূর্তে সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। দীর্ঘ কারাভোগের পর মুক্তি পেলেও তাকে দলের কোনো কর্মসূচিতে সক্রিয় দেখা যায়নি। সর্বশেষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শনে গেলেও সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন এই বেসরকারিভাবে নির্বাচিত সংসদ সদস্য।
দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে আসলাম চৌধুরীকে মাইনাস করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন স্থানীয় কর্মীরা। মহানগর বিএনপির একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আসলাম চৌধুরী ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা। তবে দলের ভেতর একটা শক্ত বলয় তৈরি হয়েছে, যারা সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। তরুণ এক নেতার আধিপত্যের কারণে আসলাম চৌধুরীকে মাইনাস করার চেষ্টা চলছে, যা দিবালোকের মতো স্পষ্ট।’
অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং ও ভুল-বোঝাবুঝির সুর শোনা গেছে খোদ আসলাম চৌধুরীর কণ্ঠেও। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘কেউ আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন কি না, সেটা সবচেয়ে ভালো বুঝবেন আমার নেতা তারেক রহমান। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। আমিও আট বছর জেলে ছিলাম। এ সুযোগে কেউ তাকে ভুল বুঝিয়েছেন কি না, সেটা আমি জানি না।’ তবে কেন্দ্রীয় মনোভাব যা-ই হোক না কেন, স্থানীয় বৈরী পরিস্থিতির কারণে সীতাকুণ্ডের কোনো নেতাই এই মুহূর্তে আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খোলার ঝুঁকি নিচ্ছেন না।
রিভিউ এবং সীতাকুণ্ডের ভবিষ্যৎ সমীকরণ
আসলাম চৌধুরীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি পাওয়ার পর তারা রিভিউ আবেদন দাখিল করবেন।
আইনজ্ঞদের মতে, রিভিউতে যদি আসলাম চৌধুরী তার মনোনয়নের দিনের বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, তবে এই আসনে পুনর্বার নির্বাচন বা উপনির্বাচনের দিকে এগোবে নির্বাচন কমিশন। আর সেই পরিস্থিতিতেই কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বা নতুন কোনো বিকল্প মুখের নাম সামনে আসবে।
তবে নেতাকর্মীরা হাল ছাড়ছেন না। আন্দোলন, আইনি লড়াই যেভাবেই হোক তাদের সিদ্ধান্ত আসলাম চৌধুরীর পক্ষেই—এমনটা জানিয়েছেন সিটি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আক্কাস বিন আবেদিন। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘রিভিও এখনও বাকি। আর রিভিওতে যদি তা বাতিল হয় এবং আবার নির্বাচন হয়, তখনো আসলাম ভাই নির্বাচন করবেন। কারণ, এর মধ্যে তার ঋণ পুনঃতপশিল করার সুযোগ আছে। এখানে ভোটার বা কর্মীদের কোনো বিকল্প চিন্তা নেই। শেষ হাসি আসলাম চৌধুরীই হাসবেন।’
কাজী সালাউদ্দিনের অবস্থান
আসলাম চৌধুরীর এই আকস্মিক আইনি শূন্যতায় এখন অবধারিতভাবেই সামনে চলে আসছে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের নাম।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রথমে এই আসনে সালাউদ্দিনকেই মনোনয়ন দিয়েছিল। পরবর্তীতে স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে আসলাম চৌধুরীকে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দেয় দল।
আসলাম চৌধুরীর বর্তমান আইনি সংকটের পর আসনটি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা বাড়লেও নিজেকে এখনই সরাসরি বা আগ বাড়িয়ে প্রার্থী ঘোষণা করছেন না কাজী সালাউদ্দিন। তিনি মূলত দলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থেকে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কাজী মোহাম্মদ সালাউদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এখনও রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন বাকি আছে। রিভিউতে যদি প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়, তবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দল যা সিদ্ধান্ত দেবে সেটাই আমি পালন করব। দলের বাইরে আমার কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেই।’
সাবেক এই মনোনীত প্রার্থী তার অতীত ত্যাগের কথা স্মরণ করে আরও বলেন, ‘আগে দল আমাকে প্রার্থী করেছিল, আমি মাঠে ছিলাম। পরে আমার থেকে মনোনয়ন নিয়ে আসলাম ভাইকে দেওয়া হলো, আমি নিজের মনে করে তার নির্বাচন করেছি। সামনেও আমি দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাব না।’
তবে সেই পর্যন্ত আসলাম চৌধুরীর আইনি ভাগ্য এবং কেন্দ্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে সীতাকুণ্ডের সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিকদের।