Image description

নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিএনপি সরকার। এমনকি তাদের প্রথম বাজেটেও এই প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সরকার সংস্থায় গত আড়াই বছর ধরে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধি নেই। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে নাগরিক সেবা।

অথচ গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হওয়া এই সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। নির্বাচনের এই বিলম্ব পূর্ববর্তী সরকারগুলোর তুলনায় সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচনের পর, সরকার গঠনের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন শুরু হয়েছিল। একইভাবে, ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের মাত্র এক মাস পর উপজেলা নির্বাচন শুরু হয় এবং এর পরপরই অনুষ্ঠিত হয় পৌরসভা নির্বাচন।

নির্বাচন কমিশন এখন আগামী অক্টোবরে এসব নির্বাচন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ ভেঙে দিয়েছিল। বর্তমানে এসব সংস্থা সরকারি প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তারা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

এই অচলাবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমার মনে হয় সরকার সময় ক্ষেপণ করছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা তৈরি করা ২০১৫ সালের একটি আইন বাতিলের চেষ্টা করছে তারা। যদিও সংসদের এই অধিবেশনে এ সংক্রান্ত কোনো বিল উত্থাপন করা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘তাছাড়া, দেশের অন্যতম একটি বড় রাজনৈতিক দলকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। স্থানীয় নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে সংসদ বিভক্ত এবং এ বিষয়ে এখনও কোনো ঐক্যমত তৈরি হয়নি।’

প্রশাসক পদে দলীয় নেতারা

পদ শূন্য হওয়া কিংবা আদালতের আদেশ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে কখনো প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না—ইশতেহারে এমন প্রতিশ্রুতি দিলেও বিএনপি তা থেকে সরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কোনো জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত না করার যে লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা টেকনিক্যালি ধরে রাখলেও নতুন সরকার ইউনূস সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের পদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে সিটি কর্পোরেশনগুলোতে নিজেদের দলীয় অনুসারীদের বসিয়েছে। এর পাশাপাশি, বিভিন্ন বিশেষায়িত জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বও তুলে দেওয়া হয়েছে বিএনপি নেতাদের হাতে।

এই পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন পর। ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। একইভাবে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক মো. আবদুস সালাম ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নেন। পরে তিনি টাইমসের কাছে নিশ্চিত করেন যে, আগামী মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবেই তিনি এই দায়িত্ব ব্যবহার করছেন।

এই প্রবণতা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং এর দুই সপ্তাহ পর আরও ১৪টি জেলায় একই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরপর ৪ জুন বাকি তিনটি জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণও রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মুস্তাফা দ্রুত স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

এদিকে সাদিক হাসান মন্তব্য করেন, নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পেতেই বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের লোকজনকে বসিয়েছে। এই দলীয় নিয়ন্ত্রণ আগামী নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে ক্ষুণ্ন করবে কিনা—জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে এটি একটি বড় অন্তরায়। বাংলাদেশে সুষ্ঠু স্থানীয় নির্বাচন নিশ্চিত করা ঐতিহাসিকভাবেই কঠিন কাজ।

স্থানীয় সরকার ব্যয় কমিশন গঠনে ব্যর্থ বিএনপি

নির্বাচনী ইশতেহারে একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ কমিশনের মাধ্যমে উন্নয়ন বাজেটের বড় একটি অংশ স্থানীয় সরকারকে বরাদ্দ দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপি। তবে তাদের প্রথম বাজেটে এই কমিশন গঠনের কোনো উদ্যোগ বা ব্যাখ্যা ছিল না।

 

মামুন আল মুস্তাফা উল্লেখ করেন, কমিশন গঠন করতে সময় লাগলেও এ বিষয়ে সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, নিজস্ব রাজস্ব আয় না থাকলে স্থানীয় সরকারগুলো পুরোপুরি কেন্দ্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকে, যার ফলে সরকার নিজের ইচ্ছামতো অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে।

এদিকে অধ্যাপক সাদিক হাসান মনে করেন, এই কমিশন গঠন সরকারের কাছে এখন কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ফলে আগামী বছরের আগে এ সংক্রান্ত কোনো নীতিগত বিবৃতি নাও আসতে পারে।

এমপিদের স্থানীয় উন্নয়ন তহবিল নিয়ে সমালোচনা

সরকার প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে (এমপি) তাদের নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা (বছরে ১০ কোটি টাকা করে পাঁচ বছরে) বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এটি বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর মাধ্যমে এমপিরা নিজস্ব বিবেচনা অনুযায়ী স্থানীয় রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ও হাটবাজারের উন্নয়নে তহবিল বরাদ্দ দিতে পারবেন।

এদিকে, গত ২৯ জুন এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে জানান, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের এমপিদের নির্বাচনী এলাকার জন্য (সিটি কর্পোরেশন এলাকা বাদে) তার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছেন।

সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার সংস্থাকে স্বাধীনভাবে ক্ষমতায়ন করার ইশতেহারি প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল দর্শন এবং বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে।

‘স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা উচিত,’ উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, একজন এমপিকে ৫০ কোটি টাকা দিলে সেই তহবিল কেবল তার রাজনৈতিক অনুসারীদের কাছেই চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন এমপির প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো আইন প্রণয়ন করা, উন্নয়ন তহবিল বিতরণ করা নয়।

প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসেছে কিনা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপাতদৃষ্টে তেমনই মনে হচ্ছে। অন্ততপক্ষে, সরকারের উচিত এ বিষয়ে জনগণকে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া।’

উপজেলা পরিষদে এমপিদের কার্যালয় নিয়ে উদ্বেগ

উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য আধুনিক ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্ত তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এটি স্থানীয় সরকারের ওপর সংসদীয় আধিপত্যকে আরও পাকাপোক্ত করবে।

সাদিক হাসান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে এমপিদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকা উচিত নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, উপজেলা পরিষদে নির্দিষ্ট জায়গা দেওয়া হলে তা রাজনৈতিক কোটারি তৈরি করবে এবং স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্র ব্যাহত করবে।

এ বিষয়ে এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মীর শাহে আলম সংসদে এই নীতির পক্ষে জোরালো বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই উদ্যোগটি একটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সমাধান করবে। এর ফলে এমপিরা যখন তাদের নির্বাচনী এলাকায় যাবেন, তখন বসার জন্য একটি উপযুক্ত জায়গা পাবেন।

তবে সমালোচকরা এই কাঠামোগত পরিবর্তনকে বিকেন্দ্রীকরণের পথ থেকে সরে আসা হিসেবে দেখছেন, যা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে সরাসরি স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্রে বসিয়ে দেবে।

যা বলছে বিএনপি

প্রশাসক নিয়োগ না করার ইশতেহারের প্রতিশ্রুতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলেন, প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব কাজ করছে।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র চার মাস হলো। আমরা এটিকে প্রতিশ্রুতি পূরণের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছি না। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।’

এমপিদের জন্য বিতর্কিত উন্নয়ন তহবিল বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগও তিনি নাকচ করে দেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় অর্থায়নের ধারা সম্পূর্ণ আলাদা। তিনি বলেন, ‘এমপিদের জন্য বরাদ্দ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর কারণে স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’