Image description

সম্প্রতি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের কয়েকটি ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল তৈরি হয়। সেই কোন্দল এবার প্রকাশ্যে এসেছে।

রেশ গড়িয়েছে আদালত পাড়ায়। চলছে একের বিরুদ্ধে অপরের মামলার লড়াই।

অশোভন আচরণ ও হত্যার হুমকির অভিযোগকে কেন্দ্র করে অপপ্রচার ও মানহানির অভিযোগে মামলা করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সদস্য সচিব সাদিয়া আফরিন। সাদিয়া আফরিন ও চট্টগ্রাম বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস. এম. সুজা উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও মিথ্যা অভিযোগ আনার প্রতিবাদে আদালতে এ মামলা দায়ের করা হয়।

রোববার (২১ জুন) সাদিয়া আফরিন বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। আদালতে দায়ের করা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিয়েছেন আদালত।

সেই মামলার পর নারীর সাথে ছবি যুক্ত করে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ছড়িয়ে সম্মানহানি করা এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার অভিযোগ তুলে ১০ কোটি টাকার মানহানি মামলা দায়েরের হুশিয়ারি দিয়েছেন সাবেক জাতীয় যুবশক্তির নেতা হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ।

এর আগে ২০ জুন সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক কাজী মিজানুর রহমানের আদালতে এনসিপি নেতাসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ। মামলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ফেক আইডি ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ছবি ও অডিও বিকৃত করে মানহানি এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ তুলেন তিনি।

মামলায় অভিযুক্তরা হলেন- চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সদস্যসচিব মো. আরিফ মইনউদ্দিন (৩০), সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল হক টিপু (৩২), সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব হুজ্জাত উল্লাহ আবির (৩২), মহানগর জাতীয় ছাত্রশক্তি সংগঠক সাদিক আরমান (২২), জাতীয় যুব শক্তির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব সজিব ভূঁইয়া (২৭) ও সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মাইনুল হোসেন। মামলায় অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই।

সাদিয়া আফরিনের করা মামলায় চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় যুবশক্তির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ, এনসিপি কর্মী সানজিদা সুলতানা ইভাসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া নেপথ্যে ইন্ধন জোগানোর অভিযোগে অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ১০ জনকেও আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, নারী শক্তির সমর্থক সানজিদা সুলতানা ইভা গত ১৪ জুন রাতে চট্টগ্রামের হোটেল পেনিনসুলার রুফটপ রেস্টুরেন্টে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে অশোভন আচরণ ও হত্যার হুমকির অভিযোগ এনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে তিনি সংবাদ সম্মেলনে এস. এম. সুজা উদ্দিন ও সাদিয়া আফরিনের ছবি প্রদর্শন করে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেন।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান, সিসিটিভি ফুটেজ, রেস্টুরেন্টের বিল এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় অভিযোগকারীর বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনার বিভিন্ন অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়, জিডি দায়েরের সময় অভিযোগকারী একজন সাবেক ছাত্রলীগ নেতার পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজে লাইভে অংশ নেন। এ ছাড়া, সংবাদ সম্মেলন আয়োজন ও প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও আনা হয়েছে।

জানতে চাইলে সাদিয়া আফরিন বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই আমাকে ও আমার সহকর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশে নারীকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে হেয় করার চেষ্টা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। তবে একটি নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবে এনসিপির অভ্যন্তরে এ ধরনের বিতর্ক ও সংঘাত দলটির ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক নয়।

তিনি বলেন, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে এবং জড়িতদের মুখোশ উন্মোচিত হবে।

মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট রিজু বলেন, আদালত মামলা গ্রহণ করে তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আমরা মনে করছি।

হুজ্জাতুল ইসলাম সাঈদ বাংলানিউজকে বলেন, কারও মানহানি হয় এমন কোনও মন্তব্য আমি করিনি। একজন নারীর সাথে আমার ছবি যুক্ত করে বিভিন্ন নিউজ পোর্টালে ছড়িয়ে সম্মানহানি করা হয়েছে এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। এজন্য ১০ কোটি টাকার মানহানি মামলা দায়েরের কার্যক্রম চলছে। শিগগিরই এই মামলা দায়ের করা হবে।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

ঘটনার সূত্রপাত গত ১৪ জুন নগরীর জিইসি এলাকার পাঁচ তারকা হোটেল পেনিনসুলায়। নারী কর্মী ইভার অভিযোগ ছিল, সাংগঠনিক আলোচনার কথা বলে সাদিয়া আফরিন তাকে হোটেলের রুফটপ বারে নিয়ে যান। সেখানে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব এস এম সুজা উদ্দিনের উপস্থিতিতে তাকে মদ্যপান ও ধূমপানে প্ররোচিত করা হয়।

ইভার দাবি, একপর্যায়ে সাদিয়া সেখান থেকে চলে গেলে সুজা উদ্দিন তাকে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন এবং অশালীন প্রস্তাব দেন। তবে সাদিয়ার মামলায় এই ঘটনাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং একে একটি পরিকল্পিত ফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি

ভেতরের খবর ও সত্যতা যাচাইয়ে এনসিপি কেন্দ্রীয়ভাবে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। গত ২৩ জুন এই কমিটির প্রধান সারজিস আলম, সদস্য আলী আহসান জুনাইদ এবং মনিরা শারমিন চট্টগ্রামে আসেন। তারা ভুক্তভোগী নারী এবং অভিযুক্তদের মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকায় যেতে না যেতেই আবারও নিজেদের মধ্যে মামলায় জড়ালো মহানগর এনসিপি।

গত ১৯ জুন চট্টগ্রামে সংবাদ সম্মেলন করে এনসিপি নেতা সুজাউদ্দিন ও চট্টগ্রাম মহানগর নেত্রী সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে অনৈতিক প্রস্তাব ও হয়রানির অভিযোগ তোলেন দলটির এক নারী কর্মী। অভিযোগকারী নিজেকে জুলাই অভ্যুত্থানের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী ও এনসিপির সক্রিয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং তদন্ত কার্যক্রম চলাকালে এই দুই নেতার বিরুদ্ধে পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ ওঠে। চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে অভিযোগকারী নারীকে ‘ভাড়া করা নর্তকী’ বলেও মন্তব্য করেন।

দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ 

২০ জুন কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এএসএম সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগে দলটির চট্টগ্রাম মহানগর শাখার শীর্ষ দুই নেতাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেওয়া হয়। তারা হলেন-দলটির মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ শোয়াইব এবং সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিন।

কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির দপ্তর সেলের সদস্য মোহাম্মদ উসামা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, গত ১৮ জুন এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এএসএম সুজাউদ্দিনের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির কাছে জমা পড়ে। ওই অভিযোগ তদন্তের জন্য তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু অভিযোগটি তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় এবং কেন্দ্রীয় কোনো সিদ্ধান্ত আসার আগেই মহানগর কমিটির এই দুই শীর্ষ নেতা অভিযুক্তের পক্ষ অবলম্বন করেন।

মীর মোহাম্মদ শোয়াইবের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তদন্তাধীন বিষয়ে দলীয় প্যাডে ‘প্রেস রিলিজ’ এর মাধ্যমে সরাসরি পক্ষ নিয়েছেন। অন্যদিকে সদস্যসচিব আরিফ মঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনিও দলীয় প্যাডে পক্ষ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ফেসবুকে অভিযোগকারীকে অত্যন্ত হীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন। চিঠিতে বলা হয়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড দলীয় শৃঙ্খলার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের আগেই অভিযুক্তের পক্ষে অবস্থান নেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা দল কোনোভাবেই মেনে নেবে না।