‘আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের’ হুমকি দিয়েছেন জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তার এ মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্র কাঠামো ও সংবিধান বাতিল করার এমন বিপ্লব দেশে এখনও হয়নি। আর জামায়াতের নেতৃত্বেও এ ধরনের বিপ্লবেরও ইতিহাস নেই।
তারপরও এই সময়ে এসে দলটির আমির বিপ্লব নিয়ে তির্যক বক্তব্য দিলেন। আসলে জামায়াত কোন বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখে। আবার একটি নতুন সরকারের চার মাসের মাথায় দেশে কী এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যে বিপ্লবের পথে হাঁটতে হবে? এছাড়া ডাক দিলেই যে মানুষ রাজপথে নেমে আসবে— তার নিশ্চয়তা কতটুকু? জামায়াতের আমির কি জুলাই আন্দোলনকে বিপ্লব হিসেবে মনে করেন? এমন প্রশ্নও উঠছে।
আর এক সময়ের মিত্র বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে হঠাৎ এমন সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হচ্ছে রাজনৈতিক মহলে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ওরা তো (জামায়াত) প্রতিষ্ঠাকাল থেকে বিপ্লবের কথা বলে আসছে। কিন্তু তাদের কথা ও কাজে মিল নেই। তাই সাধারণ রাজনীতি করলেও তারা বক্তব্য-বিবৃতিতে বিপ্লবের বুলি আওড়ায়। তবে আমরা মনে করি, দেশে সে ধরনের কোনও পরিস্থিতি নেই। জুলাই অভ্যুত্থানকে যদি তারা বিপ্লব মনে করে, সেটি ভুল ধারণা। কারণ সেখানে ছাত্র-জনতা স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাঠে নেমে এসেছে। আর এর মাধ্যমে কোনও বিপ্লবী সরকার গঠন হয়নি।’’ ভবিষ্যতে জামায়াতের নেতৃত্বে কোনও বড় আন্দোলনে দেশের মানুষ সাড়া দেবে না বলে মনে করেন তিনি।
কী বলেছিলেন জামায়াত আমির
দেশে আরেকটি বিপ্লবের সম্ভাবনা নিয়ে গত ২০ জুন খুলনা সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশে বক্তব্য দেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘‘মনে হচ্ছে আরেকটা অনিবার্য বিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। এ বিপ্লব কোনও দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, কোনও গোষ্ঠী এবং পরিবারকে তোষামোদ করার জন্য নয়—কোনও আধিপত্যবাদের কাছে মাথা নত করার জন্য নয়। বরং দুনিয়ার বুকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান, ইজ্জত নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য হবে আগামীর বিপ্লব।’’
তিনি বলেন ‘‘‘বিএনপি জাতির সঙ্গে দেওয়া কথা রাখেনি। জনরায়কে সম্মান না করার পরিণতি কী হতে পারে—দফায় দফায় দেখার পরও যদি শিক্ষা না হয়, জীবনেও তাদের শিক্ষা হবে না।’’
জামায়াত আমির আরও বলেন, ‘‘আমরা জানি সহজে আপনাদের কানে পানি ঢুকবে না। সিরিঞ্জ দিয়ে যদি পানি ঢুকাতে হয়, তাহলে সেভাবেই পানি ঢুকাবো।’’
রাজনৈতিক বিপ্লব ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
রাজনৈতিক বিপ্লব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের এক ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখতে চান রাজনীতিবিদরা। এ নিয়ে দুই ধরনের মত দিয়েছেন তারা। একপক্ষ মনে করে, দেশে বর্তমানে বিপ্লব হওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। আবার কেউ কেউ মনে করেন, বিশেষ প্রেক্ষাপটে বিপ্লব হতে পারে। এটা অনিবার্য বাস্তবতা।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, বিপ্লব হলো একটি মৌলিক ও দ্রুত পরিবর্তন প্রক্রিয়া। যার মাধ্যমে একটি বিদ্যমান সরকার, রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সামাজিক কাঠামো আমূল বদলে যায়। এটি শুধু সাধারণ ক্ষমতার রদবদল নয়। বরং সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে নতুন করে গঠন করার একটি বিশাল গণ-আন্দোলন।
দেশের রাজনীতিবিদরা বিষয়টিকে নিজস্ব অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা করেন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জামায়াত আমিরের বিপ্লব নিয়ে বলা কথার অনেক মাত্রা। তিনি মূলত এ ধরনের কথা বলে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে রাখতে চান। বাস্তবে তারা যে গণতন্ত্রের কথা বলেন, তা অনেকটা কৌশলগত। কারণ মূলগতভাবে তারা এ ধরনের পশ্চিমা গণতন্ত্রের ধারেকাছেও নেই। এটি তারা এখন এক মুখোশ হিসেবে ব্যবহার করছেন। মূলত তারা ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেন। তবে আমি মনে করি, বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাংলাদেশে তার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মানুষ ধর্মপ্রাণ সন্দেহ নেই। তবে ধর্মের নামে কোনও চরমপন্থাকে দেশের মানুষ গ্রহণ করবে না। এটা বিবেচনায় থাকা দরকার। আমরা স্মরণ করতে পারি, অতীতে চরম বামপন্থাকেও দেশের মানুষ স্বাগত জানায়নি।’’
অন্যভাবে দেখছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার তুষার। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিপ্লব হতে পারে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী। প্রত্যাশিত সংস্কার না হওয়া এবং মানুষের অধিকার পূরণ না হলে যেকোনও সময় বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। এটা যে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হতে পারে তা নয়, মানুষের ক্ষোভ থেকেও পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’’
বিএনপি ও জামায়াত দা-কুমড়া সম্পর্ক, এখনই কেন?
দীর্ঘ প্রায় তিন দশক একসঙ্গে ঘর-সংসার করলেও ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভিন্নপথে চলতে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াত। বিশেষ করে গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে তাদের মধ্যে তিক্ততা আরও বাড়তে থাকে। বর্তমানে তাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক বিরাজ করছে বলে মনে করেন কেউ কেউ। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কথায় কথায় সরকার পতনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
একটি সরকারের মাত্র চার মাসের মাথায় বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এমন আচরণকে অনেকে অনেকভাবে দেখছেন।
জানতে চাইলে ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘সরকার গণভোটের রায় মেনে না নিয়ে এক ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। অথচ জুলাই আন্দোলনের দাবি ছিল— রাষ্ট্র কাঠামো ও সংবিধানের পরিবর্তন। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকার যদি গণদাবি না মানতে চায়, তাহলে তো অনিবার্য পরিণতি ভোগ করতে হবে।’’
আমিরের বিপ্লব তত্ত্ব, বিএনপি ও জামায়াতের ভিন্ন ব্যাখ্যা
আরেকটি অনিবার্য বিপ্লব নিয়ে জামায়াতের আমিরের এমন বক্তব্য নিয়ে নানা আলোচনা হলেও দলীয় নেতারা দেখছেন স্বাভাবিকভাবে। অতীতে বাংলাদেশে বিপ্লবী সরকার হয়নি, এখন কোন তত্ত্বের ভিত্তিতে তিনি এ ধরনের কথা বলছেন— এমনটি জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিপ্লব হয় একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও এক ধরনের বিপ্লবের প্রত্যাশা ছিল। দেশের শাসন ব্যবস্থাও সংবিধান সংস্কার করা। কিন্তু মানুষের সঙ্গে প্রতারণা হয়েছে। তাই বিরোধীদলীয় নেতা ক্ষোভ থেকে এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে বিপ্লব কোন ইস্যুতে বা কোন পরিস্থিতিতে হতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।’’ তিনি মনে করেন. অধিকার আদায়ে বিপ্লব ছাড়া বিকল্প নেই।
এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘জামায়াত আমিরের বিপ্লব নিয়ে দেওয়া বক্তব্য রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। মূলত মাঠ গরম করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে দেশের মানুষ তাদের এমন খায়েশ কখনও পূরণ হতে দেবে না।’’