সংবিধানের অষ্টাদশ সংশোধনীর জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোট ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ কমিটি’ গঠনের যে প্রস্তাব করেছে, তাতে অংশ নেবে না জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। তারা গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের দাবি জানিয়ে যাবে।
বিরোধীদের ভাষ্য, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবেই সংবিধান সংশোধন করতে পারে। বিরোধীদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আমলে না নিলে কিছুই করার নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশগুলো বাছাইয়ে গঠিত সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্ট গ্রহণ করা হয়নি। এগুলো নিয়ে পরে সংসদে আলোচনার সিদ্ধান্ত হলেও তা কার্যকর করা হয়নি।
বিরোধী জোটের নেতারা বলছেন, শুধু ‘বৈধতা’ দিতে কমিটিতে অংশগ্রহণের কোনো অর্থ নেই। তাই তারা রাজপথেই সমাধান দেখছেন।
আগামী ১৩ জুন থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ছয় বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করবে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গত ১৫ মে তারা প্রথম সমাবেশ করেছে রাজশাহীতে। আগস্টে ঢাকায় বড় জমায়েত করার পরিকল্পনা রয়েছে এই জোটের।
সংবিধান সংশোধনে গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। সেদিন তিনি বলেন, ১৭ সদস্যের কমিটি গঠন হবে। এর সাতজন হবেন বিএনপির এমপি। গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন এবং স্বতন্ত্র এমপিদের মধ্যে পাঁচজন হবেন কমিটির সদস্য। বিরোধী দল থেকে আরও পাঁচজন সদস্য থাকবেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সেদিন সংসদে বলেন, কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে তাদের ধারণাগত ভিন্নতা আছে। তারা এ প্রস্তাবটি নিজেরা আলোচনা করে পরে সিদ্ধান্ত জানাবেন। বিরোধী দল চেয়েছে সংস্কার, কিন্তু সরকারি দল করতে চাইছে সংবিধানের সংশোধন।
সেদিন আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, বিরোধী দলের সিদ্ধান্তের জন্য পরবর্তী অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে অসুবিধা হবে না। আগামী ৭ জুন সংসদে বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ সমকালকে বলেছেন, এই কমিটিতে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সংসদ এবং কমিটিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সরকারি দল যা চাইবে, তাই হবে। তাই এ ধরনের কমিটিতে অংশগ্রহণ অর্থহীন এবং বৈধতা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য ২০১০ সালে গঠিত সংসদের বিশেষ কমিটিতে যোগ দেয়নি তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি। আওয়ামী লীগের সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে কো-চেয়ারম্যান করে গঠিত ১৫ সদস্যের ওই কমিটিতে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি এবং জাসদের একজন করে এমপি ছিলেন। বিএনপি থেকে তিনজন সদস্য নেওয়ার প্রস্তাব করেছিল তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগ।
এই কমিটি সংবিধানে ৫১টি সংশোধনের প্রস্তাব করেছিল। এতে সংবিধানে জাতির পিতা বিধান যোগ করা, গণভোট বাদ দেওয়া, সংবিধান সংশোধনকে কঠিন করা, সংবিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানের মতো সুপারিশ ছিল। তবে ছিল না তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের সুপারিশ।
পরে আদালতের রায়ের নজির দিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে অবস্থান নেন। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) তথ্যানুযায়ী, এতে কমিটির ১৫ সদস্য আগেই অবস্থান বদলে ফেলেন। সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপে।
অতীতের এই উদাহরণ দিয়ে সেই সংসদের এমপি হামিদুর রহমান আযাদ গতকাল বুধবার সমকালকে বলেন, এবারও তাই হবে। জামায়াত বা ১১ দলের নিজস্ব কোনো দাবি নেই। গণভোটের ফলাফল যেভাবে হয়েছে, সেভাবেই সংবিধান সংস্কার করতে হবে। এ জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে; কমিটি নয়। আজকের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনী প্রচারে গণভোটে হ্যাঁ ভোট চেয়েছিলেন। সেখান থেকে সরে গিয়ে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংস্কার না করা প্রতারণা। এতে জামায়াত অংশীদার হবে না।
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন একই অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে স্পষ্ট করে বলা আছে, কীভাবে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। কিন্তু সরকারি দল জনগণের অনুমোদিত আদেশকেই অবৈধ বলছে। এনসিপি গণভোটের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হয় এমন কিছু মানবে না। তাতে অংশও নেবে না।
বিরোধী দল কমিটিতে অংশ না নিলেও, সংবিধান সংশোধনের কাজ এগিয়ে নেবে বলে সরকারি দলের সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে হামিদুর রহমান আযাদ ও আখতার হোসেন সমকালকে বলেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তা করতেই পারে। কিন্তু পরিণাম কারও জন্যই ভালো হবে না।
সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হচ্ছে কিনা– এমন প্রশ্নে হামিদুর রহমান বলেন, অন্যান্য বিষয়ে কথা হলেও সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার বিষয়ে আলোচনা নেই। বিরোধী জোট মনে করে, গণভোটের মাধ্যমে বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেছে। রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণ সিদ্ধান্ত দিয়েছে, কীভাবে সংবিধান করতে হবে। যারা তা মানবে না, তারা ফ্যাসিবাদ অব্যাহত রাখার জন্য দায়ী হবে।
জামায়াত জোটে আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমীন সমকালকে বলেন, জোটগতভাবে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ১১ দলের অন্য শরিকদের মতো বাংলাদেশ খেলাফতের অবস্থান হলো গণভোটে ৬৮ শতাংশ জনগণ যেভাবে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে ভোট দিয়েছে, সেভাবে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। অন্য কিছু গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করেছিল জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। সনদের ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান-সম্পর্কিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গঠন পদ্ধতি; ভোটের অনুপাতে সংসদের
উচ্চকক্ষ গঠন ও সংবিধান সংশোধনে অনুমোদন; সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সরকারি কর্মকমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, ন্যায়পাল এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগের প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট (ভিন্নমত) রয়েছে। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে অবৈধ আখ্যা দেওয়া দলটি নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াত, এনসিপিসহ জোটের শরিকরা জুলাই সনদের সংবিধান-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলো হুবহু বাস্তবায়নের পক্ষে। তাদের ভাষ্য, গণভোটে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়ে এসব সংস্কারে সম্মতি দিয়েছে। তা মেনে সংশোধন নয়, সংবিধান সংস্কার করতে হবে।