দলে অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে হাইকমান্ডের নির্দেশনার অনেকটাই তোয়াক্কা করছেন না বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীর অনেকে। দলটির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, একদিকে দলের অনুপ্রবেশকারী ঠেকাতে হাইকমান্ডের কঠোর নিষেধাজ্ঞা, অন্যদিকে তৃণমূল পর্যায়ে দলে যোগদানের প্রতিযোগিতা—এই দুই বিপরীত চিত্রের মুখোমুখি এখন মাঠপর্যায়ে বিএনপি। দলের হাইকমান্ড যখন দুই দফায় স্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেছে যে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে বিএনপিতে যোগদান করানো যাবে না। কিন্তু দেড় বছর যেতে না যেতেই স্থানীয় কোন্দল ও নিজেদের পাল্লা ভারী করতে অনেক জায়গাতেই নির্দেশনা অমান্য করে নতুন নেতাকর্মীকে বিএনপিতে ভেড়াচ্ছেন। এতে করে দলের ভাবমূর্তি সংকটের পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ অনিয়ন্ত্রিত যোগদান দলের শৃঙ্খলাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। ভবিষ্যতে দলের জন্য বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
যদিও বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবি, কোনো চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী বা বিতর্কিত ব্যক্তিকে দলে নেওয়া যাবে না—কেন্দ্র থেকে এমন বার্তা দেওয়া আছে। তবে ক্লিন ইমেজধারী নেতাকর্মী বা অতীত কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ থাকলে তাদের দলে নেওয়া যাবে। বিতর্কিত কাউকে দলে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছে না বলেও জানান তারা।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের নতুন সদস্যদের যোগদানের ব্যাপারে আমাদের আগের নির্দেশনা জারি রয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দলের নেতাকর্মীদের যোগদান বন্ধে কঠোর নির্দেশনা জারি করে বিএনপির হাইকমান্ড। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিএনপির ওয়ার্ড থেকে জাতীয় পর্যায়ের কোনো কমিটিতে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কেউ বা অরাজনৈতিক কেউ যোগ দিতে পারবেন না। এ সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করতে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব স্তরের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আবারও একই বার্তা দিয়ে নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়। কিন্তু বছর যেতে না যেতেই সেই নির্দেশনা মানছেন না তৃণমূলের অনেক নেতাই। ফলে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা কৌশলে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে যোগদান করছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. কে এম বাবরের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেছেন নিজড়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখের নেতৃত্বে ১২০০ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী। গতকাল বুধবার সদর উপজেলার নিজড়া ইউনিয়নের জাঙ্গাল বাজার এলাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে তারা দল পরিবর্তনের ঘোষণা দেন।
জানা যায়, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলামের অনুসারী ১২০০ নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদান দেন। নিজড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী ছনোয়ার হোসেন মোল্লা। তিনি এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। ছনোয়ার হোসেন মোল্লা স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে দাঁড়ালেও তার ভোটগুলো ছিনিয়ে নেওয়া নৌকা প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া দল থেকে মূল্যায়নের পরিবর্তে অবমূল্যায়ন পাওয়ায় তারা বিএনপিতে যোগদান করেন। এ ছাড়া নৌকার প্রার্থীর বাইরে অন্য ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা বিএনপিতে যোগ দিতে পারে বলেও স্থানীয় পর্যায়ে গুঞ্জন রয়েছে।
যোগদান অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ড. কে এম বাবর বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের প্রত্যাশা পূরণে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় ব্যক্তিরা বিএনপিতে যোগদান করলে তাদের স্বাগত জানানো হবে।
নবাগত দুই নেতা ছনোয়ার হোসেন মোল্লা ও নুর ইসলাম শেখ বলেন, এলাকার উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তারা বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন। তারা দলের আদর্শ ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
এর আগে গত ৫ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের টঙ্গীতে জাতীয় পার্টির (জি এম কাদের) থানা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাইফুল ইসলাম খান, সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক, সহসভাপতি সালাহউদ্দিন, মজিবুর রহমানসহ শতাধিক নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগদান করেছেন। তারা সবাই শ্রমিক দলের কার্যকরী সভাপতি মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন সরকারের হাতে ফুল দিয়ে যোগদান করেন। তারও আগে গত ২৮ জানুয়ারি কুমিল্লার তিতাস উপজেলায় জিয়ারকান্দি ইউনিয়ন (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমল সরকারের নেতৃত্বে শতাধিক নেতাকর্মী ও সমর্থক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিম ভূঁইয়ার হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেন।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের মে ও জুন মাসে দলে নতুন সদস্য সংগ্রহে ফরম বিতরণ করে বিএনপি। সেই সময়ে একটি শর্ত ছিল, আওয়ামী লীগের যারা ক্লিন ইমেজ, অতীত কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ এবং দুর্নীতি-লুটপাট বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে। তবে দলের এ নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গোপনে ও প্রকাশ্যে তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের হাত ধরে দলবদল করে বিভিন্ন ঘরানার নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় পর্যায়ে দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ।
বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (রাজশাহী বিভাগ) আমিরুল ইসলাম খান আলিম কালবেলাকে, দলে নতুন নেতাকর্মী যোগদানের ব্যাপারে এখনো নিষেধাজ্ঞার নির্দেশনা রয়েছে। আমি মনে করি, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা সবার মেনে চলা উচিত।
বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক (ফরিদপুর) সেলিমুজ্জামান সেলিম কালবেলাকে বলেন, যাদের নামে ফৌজদারি মামলা নেই, যারা কোনো অপকর্মে জড়িত নেই অথবা বিগত সময়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের জুলুম-নির্যাতন করেননি, তাদের দলে যোগদানের ব্যাপারে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু যারা চিহ্নিত অপরাধী ও মামলা রয়েছে তাদের যোগদানের ব্যাপারে নিষেধ রয়েছে। এ ছাড়া গোপালগঞ্জের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। অন্য দলের নেতাকর্মীদের যোগদানের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাহলে কীভাবে যোগ দিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর দলে যোগদানের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা আছে কি না, তা জানা নেই।