Image description

দীর্ঘ ১ বছর ২৬ দিনের কারাজীবন শেষে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার এই প্রত্যাবর্তন শুধু কারামুক্তি নয়, বরং নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।

বুধবার (৩ জুন) রাত ১০টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে মুক্তি পান আইভী। পরে পরিবারের সদস্য, আইনজীবী ও ঘনিষ্ঠ স্বজনদের সঙ্গে নিয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।

বাড়িতে ফেরার আগে আইভী ছুটে যান মাসদাইর কেন্দ্রীয় সিটি কবরস্থানে। সেখানে বাবা ভাষাসৈনিক ও সাবেক জনপ্রতিনিধি আলী আহাম্মদ চুনকা, মা মমতাজ বেগম এবং প্রয়াত ছোট ভাইয়ের কবর জিয়ারত করেন। পরে গভীর রাতের সাড়ে ১২টার দিকে তিনি শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত পারিবারিক বাসভবন চুনকা কুটিরে পৌঁছান।

বাড়িতে প্রবেশের মুহূর্তে আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পর পরিবারের সদস্যরা তাকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। স্বজনদের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দা ও সমর্থকদেরও ভিড় লক্ষ্য করা যায়। যদিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ অনেককে বাড়ির সামনে অবস্থান করতে দেয়নি।

selina hayat ivy
৩৯১ দিন পর পারিবারিক বাসভবন চুনকা কুটিরে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ছবি : সংগৃহীত

 

 

কারামুক্তির পর সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপকালে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বর্তমান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। এছাড়া তিনি বিচার বিভাগ এবং তার পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনাকারী আইনজীবীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। আইভী বলেন, ‘আমি সকলের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমি চাই এমন একটি মানবিক রাষ্ট্র ও সরকার গড়ে উঠুক যেখানে বিচার ও ন্যায়বিচার সবার জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হবে। কারাগারে আমার মতো আরও অনেক মা রয়েছেন, যাদের অনেকেই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। আমি আশা করি, সরকার তাদের প্রতিও সহানুভূতিশীল হবে।’

 

এদিকে আইভীর এই বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি মানবিক আবেদনও উঠে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে গেলে আওয়ামী লীগের অনেক প্রভাবশালী নেতা দেশ ছেড়ে চলে যান বা আত্মগোপনে চলে যান। তবে নারায়ণগঞ্জের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নিজের বাসভবনেই অবস্থান করেন। ২০২৫ সালের ৮ মে রাতে তাকে গ্রেপ্তার করতে দেওভোগের বাসভবনে যায় পুলিশ। খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার সমর্থক তার বাড়ির সামনে জড়ো হন। কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির পর ৯ মে ভোরে তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সে সময় তার সমর্থকদের জয় বাংলা স্লোগানে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

 

আদালতপাড়ায় দীর্ঘ আইনি লড়াই

 

গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে কয়েকটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরবর্তীতে এক মামলায় জামিন পেলেই অন্য মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করা হয়। এভাবে ধারাবাহিকভাবে মোট ১২টি মামলায় তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইভীর আইনজীবীদের দাবি, তাকে মুক্তি থেকে বঞ্চিত রাখতে ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তারা বিষয়টিকে ‘আইনি হয়রানি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

 

প্রথম ধাপে পাঁচটি মামলায় হাইকোর্ট তাকে জামিন দিলে রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে গিয়ে সেই জামিন স্থগিতের আবেদন করে। পরে বিষয়টি আপিল বিভাগে গড়ায়। একইভাবে দ্বিতীয় ধাপে আরও কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও একই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ঘটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, এক মামলায় জামিন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর ঘটনা নিয়মিত হয়ে দাঁড়ায়। পরে এই ধারাবাহিক গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়।

 

রিটের শুনানি শেষে আদালত আইভীকে নতুন কোনো মামলায় হয়রানি বা গ্রেপ্তার না করার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা নিয়েও রুল জারি করেন। সবশেষে ১২টি মামলার জামিন আপিল বিভাগে বহাল থাকার পর তার মুক্তির পথ উন্মুক্ত হয়।

 

এ বিষয়ে আইভীর প্রধান আইনজীবী অ্যাড. আওলাদ হোসেন বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, আইভীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আদালত আমাদের যুক্তিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ধারাবাহিক সিদ্ধান্তের ফলে তিনি ন্যায়বিচার পেয়েছেন।

 

তিনি আরও বলেন, আদালতের আদেশ বিভিন্ন স্তর পেরিয়ে কারাগারে পৌঁছাতে কিছুটা সময় লেগেছে। এর মধ্যে ঈদের ছুটিও ছিল। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অবশেষে তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

 

selina hayat ivy1
চুনকা কুটির ঘিরে স্বজন, সমর্থক ও সংবাদকর্মীদের ভিড়। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

এদিকে আইভীর মুক্তিকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে চাষাঢ়া, দেওভোগ ও শহরের কয়েকটি প্রবেশপথে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এছাড়া চুনকা কুটিরের সামনেও বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

 

ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র পরিচিত নাম। তিনি নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে টানা তিনবার নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকেও রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বজায় ছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের উন্নয়ন, সুশাসন এবং নাগরিক সুবিধা নিয়ে তার অবস্থান তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

 

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

 

কারামুক্তির পর আইভীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার আইনজীবীর দাবি, তিনি ভবিষ্যতে আবারও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। যদিও তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এখনো চলমান, তবুও কারামুক্তির মধ্য দিয়ে তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার সুযোগ ফিরে পেয়েছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

 

অনেকের মতে, রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক বাস্তবতা এবং নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণে আইভীর প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন, মামলাগুলোর নিষ্পত্তির আগে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

দীর্ঘ কারাবাস, আইনি লড়াই এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার অধ্যায় পেরিয়ে ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর বাড়ি ফেরা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তার মুক্তি একদিকে যেমন সমর্থকদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস তৈরি করেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ। এখন দেখার বিষয়, আদালতে চলমান মামলাগুলোর পরিণতি এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইভী কীভাবে নিজেকে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে এতটুকু নিশ্চিত, ৩৯১ দিন পর চুনকা কুটিরে তার প্রত্যাবর্তন নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।