Image description

জাতীয় কাউন্সিল সামনে রেখে এবং সাংগঠনিক শক্তি আরো বাড়াতে মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। ইতোমধ্যে দলটির সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলে নেতৃত্ব বাছাই ও নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শিগগির নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে।

সূত্র বলছে, সরকার ও দলকে আলাদা করে পরিচালনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নিয়েছে বিএনপি। কারণ, সরকার ও দলের দায়িত্ব দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে এমপি বা মন্ত্রীরা দায়িত্বে থাকলে দল ও সরকার উভয় ক্ষেত্রেই কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সংসদ সদস্য এবং সাধারণ সম্পাদক সরকারের মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে তারা সংগঠনের কাজে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে দলের হাইকমান্ড। চলতি বা আগামী বছরের শুরুর সুবিধাজনক সময় কাউন্সিল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এর আগে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, মহানগর এবং জেলা কমিটিগুলো পুনর্গঠনের চিন্তাও করা হচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলকে আরো সুসংগঠিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাংগঠনিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন উদ্যমে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় হতে চায় বিএনপি।

এ উদ্যোগ ঘিরে সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশা-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। যদিও নতুন কমিটি ঘোষণার নির্দিষ্ট সময় এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত ২৮ মার্চ প্রথমবারের মতো রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যান দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে সময় ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানী ও সাধারণ সম্পাদক রাজীব আহসান নতুন কমিটি নিয়ে নিজেদের মতামত চেয়ারম্যানের কাছে তুলে ধরেন।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে শীর্ষ পদপ্রত্যাশী এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি চেয়ারম্যানের কাছে বর্তমান শীর্ষ দুই নেতার মতামত জানানোর পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে লবিং-তদবির শুরু হয়েছে।

২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জিলানীকে সভাপতি এবং রাজীবকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি গঠন করা হয়। পরে ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সংগঠনটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর। সে হিসাবে ২০২২ সালে গঠিত এ কমিটির মেয়াদ গত বছরের সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে। বর্তমানে কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটিতে পদ পেতে স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের সাবেক নেতাদেরও তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদের জন্য একাধিক নাম ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে।

এদিকে, সংগঠনের ভেতর থেকেই শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করা উচিত বলে মনে করছেন নেতারা। তাদের যুক্তি, এতে তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা আরো উৎসাহিত হবেন। অন্য সংগঠন থেকে কাউকে এনে শীর্ষ পদে বসানো হলে দীর্ঘদিন ধরে স্বেচ্ছাসেবক দলে রাজনীতি করা নেতাকর্মীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

নতুন কমিটিতে আলোচনায় যারা

স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটির শীর্ষ দুই পদে আলোচনায় রয়েছেন সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, এক নম্বর সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান। তবে ‘সুপার ফাইভ’ বা শীর্ষ পাঁচ পদ বাদ রেখেও এবারের কমিটি গঠন হতে পারে বলে সংগঠনের ভেতরে গুঞ্জন রয়েছে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের ভেতর থেকে আরো যাদের নাম আলোচনায় রয়েছে তারা হলেনÑঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মোখতার হোসাইন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম রফিক, আব্দুর রহিম হাওলাদার সেতু, সাবেক যুগ্ম সম্পাদক সাদরেজ জামান এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি জহির উদ্দিন তুহিন।

সভাপতি পদে আলোচনায় থাকা বর্তমান সহসভাপতি ফখরুল ইসলাম রবিন এর আগে ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রদলের রাজনীতি দিয়ে তার রাজনৈতিক পথচলা শুরু। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

এছাড়া সাবেক এই ছাত্রনেতা বিগত ১৭ বছরের ভোটাধিকার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের ৮০টি মিথ্যা মামলার শিকার হন। আন্দোলনের মাঠ থেকে কয়েকবার গ্রেপ্তার হয়ে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। তিনি ৯ দিন গুম ছিলেন। পরে হাত-পা ভেঙে আদালতে তোলেন ওসি সালাহউদ্দিন। এছাড়া ডিবি অফিসে বিভিন্ন মামলায় মাসের পর মাস রিমান্ডে ছিলেন রবিন।

বর্তমান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইয়াছিন আলীও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার হাত থেকে রেহাই পাননি। ১৯৮৬ সালে ছাত্রদলে যোগ দিয়ে বিএনপির রাজনীতি শুরু করে তিনি ছাত্রদলের বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পালন করে এখন স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদে রয়েছেন। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার রোষানলে পড়ে তিনি ২১০ মামলায় সাড়ে তিন বছর কারাবন্দি ছিলেন।

এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এরপর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সেখান থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সহদপ্তর সম্পাদক এবং পরে সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান নাজমুল। তিনি এবার স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী।

অন্যদিকে, আলোচনায় থাকা কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক অর্ধশত মামলায় এক বছর পাঁচ মাস ১৭ দিন কারান্তরীণ ছিলেন। বিভিন্ন সময় রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ক্যাম্পাস ও রাজপথে ছাত্রলীগ ও পুলিশের হাতে নির্যাতিত হন।

ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকদের মধ্য থেকে স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ দুই পদে যারা আলোচনায় রয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল।

এছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েলকে নিয়ে জোর আলোচনা রয়েছে। ছাত্রদলের রাজনীতিতে ভীষণ জনপ্রিয়তা পাওয়া শ্রাবণের নাম যুবদলের নতুন কমিটির ক্ষেত্রেও শোনা যাচ্ছে।

স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটির বিষয়ে বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু আমার দেশকে বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল হবে। কাউন্সিল সামনে রেখে বিএনপির সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি পুনর্গঠন হবে। সেক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটিও পুনর্গঠন হবে। শিগগির কমিটি গঠন হবে বলে জানান তিনি।