উত্তরবঙ্গের জেলা নাটোরের নাম এলেই মানসপটে ভেসে ওঠে জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’। যে কবিতায় তিনি লিখেছেন— আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন, আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।— কবির শান্তি খুঁজে পাওয়া বনলতা সেনের সেই নাটোরের লালপুর-বাগাতিপাড়ার অনেক মানুষ জ্বলছে অশান্তির অনলে। তবে নতুন কেউ সেখানে পা রাখলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে সবকিছু স্বাভাবিক! স্কুল-কলেজ খোলা, হাটবাজারও নিয়মমাফিক সচল। চায়ের দোকানে আড্ডাও বসে আগের মতোই। কিন্তু ভেতরে ভেতরে পাল্টে গেছে এ জনপদ। মানুষের মনে ভর করেছে ভয়, অজানা আতঙ্ক। এ পরিবর্তনটুকু বেশি দিনের নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই দ্রুত পাল্টাতে থাকে লালপুর-বাগাতিপাড়ার চিত্র। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পতিত আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন, এলাকার হাট-ঘাট ও বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি চরমে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা, তাদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুরসহ নানা সহিংসতার ঘটনায় বিএনপি তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন এলাকার অনেকেই।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লালপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হারুনুর রশিদ পাপ্পু ও বাগাতিপাড়া থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে চলছে দুই বাহিনীর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। উপজেলা থেকে গ্রামাঞ্চল— সর্বত্র বিস্তৃত তাদের নেটওয়ার্ক। দুজনই মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের ঘনিষ্ঠ। প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে চলছে তাদের ‘ক্যাডার বাহিনী’র তাণ্ডব। এ কারণে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। উল্টো প্রতিপক্ষের লোকজনকে ‘সাজানো’ মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির অবসান চেয়ে এরই মধ্যে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ও দলীয় হাইকমান্ডের কাছে একাধিক আবেদনও করা হয়েছে; কিন্তু আসেনি কোনো কার্যকর ফল।
ঢাকা থেকে প্রায় ২০৯ কিলোমিটার দূরত্বের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাগোল্লার শহর নাটোর। ১০ মে দুপুরে সেখান থেকে আরও ঘণ্টাখানেকের পথ পেরিয়ে প্রথমে লালপুর, পরে বাগাতিপাড়া উপজেলায় উপস্থিত হন এ প্রতিবেদক। প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
জানা গেল, পুতুলের বিরুদ্ধে গিয়ে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ গত নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী দলটির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপুর পক্ষে কাজ করেছেন। তারাই মূলত পাপ্পু-মোশারফের ক্যাডার বাহিনীর টার্গেট। নির্বাচনের পর থেকেই টিপুর অনুসারীদের মারধর, বাড়িঘরে হামলা ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে এই চক্র। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ১০ মে পর্যন্ত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের চারশর বেশি নেতাকর্মী হামলা-মামলার শিকার হয়েছেন। কারাবন্দি হয়েছেন অনেকেই। শুধু তাই নয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত তিন হাজার নেতাকর্মী পুনর্বাসিত হয়েছেন। তাদের অনেকেই বিএনপির ওপর ভর করে নানা অপরাধে লিপ্ত। বিতর্কিতরা প্রতিমন্ত্রী পুতুলের বাসা, অফিস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে ছবি তুলে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। এমন অনেক ছবি রয়েছে এ প্রতিবেদকের হাতে।
আমাকে বেধড়ক মারধর করে। এরপর আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পুলিশি তল্লাশির নামে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে আমার বাবাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়
গত দুদিন (শনি ও রবিবার) বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও অভিযোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গতকাল রবিবার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার মোবাইল ফোনে কয়েকবার কল করা হলেও রিসিভ করেননি। শনিবার এ প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে কথা বলার সময় চেয়ে তার হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও সাড়া দেননি। সবশেষ গতকাল রাতে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নসহ বক্তব্য চেয়ে একই মাধ্যমে বার্তা পাঠানো হয়। রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জবাব দেননি।
১০ মে দুপুরে লালপুর উপজেলার সালামপুর বাজারে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ৭১ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষক ও আড়বাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি এ কে এম জালাল উদ্দিনের। তিনি বললেন, ‘প্রতিমন্ত্রী পুতুলের অনুসারীরা আমাকেও দুটি মিথ্যা মামলায় আসামি করেছে। যাদের হাত ধরে স্থানীয় বিএনপি প্রতিষ্ঠিত, তারা এখন একেবারেই নিষ্ক্রিয়। এ সুযোগে ‘হাইব্রিড বিএনপি’ গঠিত হচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মীরা। প্রতিমন্ত্রী পুতুলের প্রতিহিংসার কারণে দলের জন্য যারা নিবেদিতপ্রাণ, তারা এখন অনেক দূরে, সুবিধাবাদীরা তার কাছে। এভাবে চলতে থাকলে পুতুলের হাত ধরেই নাটোরে বিএনপির সর্বনাশ হবে।’
জালাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা বলার পর আড়বাব ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা মেলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোখলেসুর রহমানের। আলাপচারিতায় তিনি বললেন, ‘বিএনপির সঙ্গে অনেকটা সহাবস্থানেই আছি।’
ওয়ালিয়া বাজারে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে হামলা ও মিথ্যা অস্ত্র মামলায় হয়রানির চিত্র তুলে ধরেন স্থানীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আউলিয়া হোসেনের ছেলে শামীম আহমেদ। তিনি বলছিলেন, ‘গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পুতুলের ক্যাডার বাহিনী দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। আমাকে বেধড়ক মারধর করে। এরপর আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পুলিশি তল্লাশির নামে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে আমার বাবাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। তিনি এখনো কারাবন্দি। অথচ আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় মামলা করতে গেলে পুলিশ নেয়নি।’
সেখানে উপস্থিত নাটোর জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহাগ জানালেন, তার দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা তো নেয়ইনি, উল্টো তাকে একটি মামলার আসামি করা হয়েছে।
জানতে চাইলে লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলাম পলাশ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে এসেছে, মামলা নিইনি এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে ঘটে থাকতে পারে। আমি শতভাগ পক্ষপাতহীনভাবে দায়িত্ব পালন করছি।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুড়দুড়িয়া এলাকায় ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছেন হারুনুর রশিদ পাপ্পুর অনুসারী শহীদুল ইসলাম ও তার ক্যাডার বাহিনী। এই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের সঙ্গে মিলেমিশে পরিষদের উন্নয়নকাজের নামে লুটপাট চালাচ্ছে। ৫ আগস্টের পর আওয়ামীপন্থীদের নিয়ে গঠিত ভেল্লাবাড়িয়া আব্দুল ওয়াহেদ উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি বাতিল করা হয়। সম্প্রতি শহীদুল ইসলাম ২০ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে সেই কমিটি পুনর্বহাল করেছেন। এ ছাড়া রামকৃষ্ণ সাধুর আশ্রম দখলে নিয়েছেন শহীদুল ও তার অনুসারীরা। আশ্রমের প্রায় ১০০ বিঘা জমি তারা ভোগদখল করছেন। সবশেষ ১১ মে লালপুর উপজেলার আড়বাব ইউনিয়নের মোড়দহ গ্রামে কাশেম নামে এক ব্যক্তির ঘরবাড়ি ভেঙে জায়গা দখলে নেওয়ার হুমকি দেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলাল উদ্দিন ও সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাইনুল হক শিমুল। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৭ শতাংশ খাসজমি দখলে নেওয়ার জন্য তারা পরিবারটিকে উচ্ছেদ করার হুমকি দিচ্ছেন।
হাতের ভেতর এখনো রড দেওয়া আছে। তারা শুধু আমার ওপর হামলা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, আমার বাড়িতেও হামলা চালায়। আমের বাগান কেটে ফেলে
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার আব্দুল হান্নান বললেন, ‘শহীদুল ও তার ক্যাডার বাহিনী আমার স’মিল, ডেকোরেটর ও কাঠের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চাঁদার দাবিতে বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রতিবাদ করায় মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের দিনই আদালত আমাকে জামিন দেন। এখন তারা হুমকি দিচ্ছেন, আগামী পাঁচ বছরে আমার বিরুদ্ধে মামলার হাফসেঞ্চুরি পূরণ করবে।’ হান্নানের ছেলে জেলা ছাত্রদল সদস্য মাসুম আহমেদ জানান, প্রতিমন্ত্রীর অনুসারী সিরাজ তার গায়ে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করার হুমকি দেন।
নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনিহারপুর গ্রামের কৃষক ও বিএনপির কর্মী মাইনুল ইসলাম বললেন, ‘গত রোজার ঈদের নামাজের পর ধল্লাবাড়ী এলাকায় শহীদুলের সন্ত্রাসী বাহিনী আমাকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেয়।’ ভাঙা হাত ও এক্স-রে রিপোর্ট দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘হাতের ভেতর এখনো রড দেওয়া আছে। তারা শুধু আমার ওপর হামলা চালিয়ে ক্ষান্ত হয়নি, আমার বাড়িতেও হামলা চালায়। আমের বাগান কেটে ফেলে। আমার পরিবারের নারী-পুরুষ সবাইকে মিথ্যা মামলায় আসামি বানিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে।’
অভিযোগের বিষয়ে শহীদুল ইসলাম বললেন, ‘আমাদের প্রতিমন্ত্রী ক্লিন ইমেজের, তাই আমরাও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিই না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলেমিশে পরিষদ চালানোর বিষয়টিও অপপ্রচার।’ অন্যান্য অভিযোগও তিনি অস্বীকার করলেন।
জানতে চাইলে লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (সম্প্রতি ঢাকা বিভাগে বদলি হয়েছেন) জুলহাস হোসেন সৌরভ আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমরা সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি, সেটা বলব না। তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তার অনুসারীরা অপরাধে জড়িত বলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারছে না— ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের একার পক্ষে সবকিছু ঠিক করা সম্ভব নয়। এটার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পুলিশের ভূমিকা জরুরি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘রামকৃষ্ণ আশ্রম নিয়ে ঝামেলা আছে। আশ্রমের নগদ টাকা ও জমি ঘিরে দুটি গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব নিরসনে প্রতিমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়েছেন। কোরবানির ঈদের পর তিনি দুপক্ষকে নিয়ে বসবেন।’
আমাদের একার পক্ষে সবকিছু ঠিক করা সম্ভব নয়। এটার জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পুলিশের ভূমিকা জরুরি
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরও বললেন, ‘লালপুর হাটের টেন্ডার করেও ইজারাদার পাওয়া যায়নি। তাই খাস কালেকশন করা হচ্ছে। এ কাজে সহযোগিতা করে বিএনপি নেতা পাপ্পুর লোকজন। লালপুর উপজেলার কোনো বালুমহালও এবার ইজারা হয়নি। তাই বালু উত্তোলনের বিষয়টি যে অবৈধ, এটা বলাই যায়। তবে অবৈধ সব কার্যক্রম বন্ধে আমরা চেষ্টা করছি।’
লালপুর থানা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদুজ্জামান সরকারের অভিযোগ, ‘আওয়ামী লীগের বিতর্কিত যেসব নেতাকর্মী বিএনপিতে ভিড়েছে, তারাই এখন বেশি বেপরোয়া। বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের ওপর হামলায় তারাও অংশ নিচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী পুতুলের ডানহাত হিসেবে পরিচিত লালপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান পাপ্পুর হাত ধরেই আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মীরা পুনর্বাসিত হচ্ছে। এলাকায় আধিপত্য ও নিজস্ব বলয় বাড়াতে পুতুলও তাতে সায় দিচ্ছেন। এতে দলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।’
এ প্রতিবেদকের কাছে প্রায় অভিন্ন তথ্য তুলে ধরে লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান বললেন, ‘আমার বাবা আব্দুর রাজ্জাক লালপুর উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর পাপ্পুর বাবা জাতীয় পার্টি করতেন। পাপ্পু একসময় জড়িত ছিলেন জাসদের রাজনীতিতে। এখন তিনি প্রতিমন্ত্রী পুতুলের সবচেয়ে কাছের লোক। তার আশীর্বাদে যা খুশি তা-ই করছেন। তার অপকর্মের ভাগীদার বিল মারিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মিষ্টু। এ সিন্ডিকেট ইজারা ছাড়াই লালপুর হাটের খাজনা তুলে আত্মসাৎ করছে। গত অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় এ হাট ইজারা দেওয়া হয়েছিল। অথচ সরকার এবার এ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া একাধিক বালুমহাল ও ফসলি জমি কেটে মাটির ব্যবসাও তার অনুসারীদের কবজায়। বালু ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।’
পাপ্পু ও মোশারফের বক্তব্য : অভিযোগের বিষয়ে গতকাল বিকালে মোবাইল ফোনে বিস্তারিত বলেছেন স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিমন্ত্রীর ডানহাত হিসেবে পরিচিত লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ পাপ্পু। তিনি বললেন, ‘যারা মামলা-হামলার অভিযোগ করছেন, তারা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে। ব্যারিস্টার ফারজানা শারমিন পুতুলের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার জন্যই এসব অভিযোগ করা হচ্ছে। আমরা কারও ওপর হামলা-মামলা করেছি, কেউ প্রমাণ দিতে পারবে না। বরং ভোটের আগে বিদ্রোহী প্রার্থী বিএনপির লোকদের বিপুল টাকায় কিনে নিয়েছেন। তারাই এখন অপপ্রচার চালাচ্ছেন।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পর বিচ্ছিন্ন কিছু হামলা-মামলার ঘটনা ঘটতে পারে। লালপুর উপজেলায় রাজনৈতিকভাবে ঘটনা ঘটলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমার কাছে নিউজ আসে। আমি নিশ্চিত করে বলছি, ফারজানা শারমিন পুতুলের হয়ে যারা ধানের শীষের পক্ষে ভোট করেছে, তাদের দ্বারা কলসের ভোট করেছে— এমন নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণের তথ্য আমার কাছে নাই। ব্যক্তিগত কারণে মারামারি কিংবা মামলা হলেও এখন সেটা পুতুল গ্রুপ আর অমুক গ্রুপের বলে চালানো হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে আমরা বলেছি, কলসের যারা ভোট করেছেন, তারা আমাদের সঙ্গে আসেন, মন্ত্রীর দরজা আপনাদের জন্য খোলা আছে। তবে যারা দুর্নীতিবাজ, মাদক কারবারি তাদের নেওয়া হবে না।’
বালুমহাল নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ সম্পর্কে পাপ্পু বলেন, ‘চরমাহদিয়ার একটি বালুমহাল ৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় এক ব্যক্তি ইজারা নিয়েছেন। সেখান থেকে ড্রেজিং করে বালু উঠিয়ে বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হচ্ছে। লালপুরের কিছু মানুষও এই বালু ৩ টাকা সিএফটি কিনে এনে ৭-৮ টাকায় বিক্রি করে। সরকার যদি লিজ দেয়, আপনি এটা ঠেকাবেন কীভাবে? তবে নির্বাচনের পর পদ্মার চর থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন অনেক পয়েন্টে রাতে চুরি করে বালু তুললে আমরা কি এটা পাহারা দিতে পারি? পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। প্রতিমন্ত্রীও এ ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন ও তাদের সঙ্গে মিলে ব্যবসার অভিযোগ ঠিক নয়।’
বাগাতিপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মোশারফ হোসেন তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে আগামীর সময়কে বলেন, ‘স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত নয়। আমাদের এমপি সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেন না।’
বাগাতিপাড়া উপজেলায় গিয়েও মিলেছে একই ধরনের অভিযোগ। বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব সবুজ আলী বলছিলেন, ‘প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ থানা বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেনের অনুসারীরা আমাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে আমাকে মারধর ও ক্যাশ বাক্স থেকে টাকা লুট করে। মোশারফ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জামাল, হায়দার, রেজাউল, মধু, মিঠু, মোক্তার ও রায়হান। তারাই নানা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।’
দেবনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানালেন, মাসখানেক আগে গ্রামের শাজাহানকে মারধর করে ভিটেবাড়ির কিছু অংশ দখল করে নেয় পুতুলের অনুসারীরা। এরপর মিথ্যা মামলায় শাজাহানকে জেলে পাঠানো হয়। ১৫ দিন আগে মারিয়া গ্রামে জাহাঙ্গীরের ৩ লাখ টাকার মেহগনিগাছ বিক্রি করে টাকা নিয়ে যায় রাসেল ও তবিরের নেতৃত্বে থাকা ক্যাডার বাহিনী। জাহাঙ্গীরের স্ত্রীর নামে এই কাঠবাগান ছিল। স্ত্রী মারা গেলে তারা এ জায়গা দখলে নিয়ে গাছ বিক্রি করে দেয়। এ ছাড়া নির্বাচনের পর বাগাতিপাড়া সদর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ক্ষীদ্র মালঞ্চি গ্রামে অন্তত ১০টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর হয়েছে। সংসদ নির্বাচনে টিপুর পক্ষে কাজ করায় দয়ারাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী সরকারকে ভোটের পরদিনই গৃহবন্দি করে ফেলা হয়। ১০ লাখ টাকা চাঁদা না দিলে বাড়ি থেকে বের হতে দেওয়া হবে না বলে ফরমান জারি করে পুতুলের অনুসারী আসলাম। অব্যাহত হুমকির কারণে হার্ট অ্যাটাকে আনসার আলী মারা যান বলে তার ঘনিষ্ঠজনদের অভিযোগ।
বাগাতিপাড়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও থানা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক এ কে এম শরিফুল ইসলাম লেলিন বললেন, ‘মোশারফ ও তার বাহিনীর সদস্যদের অপকর্মের শেষ নেই। ছাত্রজীবন থেকে শহীদ জিয়াউর ও বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শের রাজনীতি করি। আমরা এই বিএনপিকে চিনতে পারছি না। এভাবে চলতে থাকলে প্রতিমন্ত্রী পুতুল হয়তো সবদিক দিয়ে লাভবান হবেন; কিন্তু সর্বনাশ হবে দলের। সেই ধাক্কা সরকারের ওপর আসবে।’
পুতুলের অনুসারীদের জুলুম-নির্যাতন, অবৈধ বালু উত্তোলন ও মাদক কারবার বন্ধের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে একাধিক আবেদন জমা দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। ডাকযোগে ও অনলাইনে পাঠানো এসব আবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিমন্ত্রী পুতুলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রশ্রয়ে লালপুর ও বাগাতিপাড়া এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করছে একটি সিন্ডিকেট। পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় এ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন হারুনুর রশিদ পাপ্পু ও মোশারফ হোসেন।
আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন: জানা গেছে, পুতুল প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পর তার ঘনিষ্ঠদের হাত ধরে লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অন্তত তিন হাজার নেতাকর্মী পুনর্বাসিত হয়েছেন। লালপুরের ওয়ালিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আনিসুর রহমান মাস্টার ৫ আগস্টের পর আত্মগোপনে চলে যান। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুতুলের অনুসারীদের হাত ধরে তিনি এলাকায় ফিরেছেন। একইভাবে পুনর্বাসিত নেতাকর্মীদের তালিকায় রয়েছেন— ওয়ালিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সিদ্দিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আক্তারুজ্জামান আক্তার, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক জয়নাল মাস্টার, চংধুপইল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজাম্মেল হক, আব্দুলপুর সরকারি কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম।
জানা যায়, লালপুর উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র চারটির চেয়ারম্যান বিএনপিপন্থী। অন্য চেয়ারম্যানরা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। অথচ তারা সবাই পুতুলের অনুসারীদের সঙ্গে মিলে ‘ভাগ-বাটোয়ারা’ করে নির্বিঘ্নে পরিষদের কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। দুটি উপজেলায় পুনর্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ।