স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন চলতি বছরের শেষের দিকে শুরু করার কথা সরকারের মন্ত্রী পর্যায় থেকে বলা হয়েছে, তবে ক্ষমতাসীন দলের তরফে কোনো প্রস্তুতির আলামত দেখা যাচ্ছে না।
বরং তোড়জোড় শুরু করেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি।
জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা না করলেও এনসিপি সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভা স্তরের শতাধিক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াত জোটের অন্য শরিকরাও প্রস্তুতি শুরুর কথা বলেছে।
বাপপন্থি দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, তারা দলের ভেতরে আলোচনা শুরু করেছে।
সংসদ নির্বাচনের মতো ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত ইসলামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনও জোটগতভাবে করবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের জায়াগায় আসতে পারেনি।
গেল ২৭ এপ্রিল সংসদে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
এরপর ৫ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার বিষয়ে আলোচনা শেষে তিন সংবাদিককদের বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচন আয়োজনের চেষ্টা করবেন।
সে দিনই এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হবে, বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনগুলো আয়োজন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে।
স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের ফলে এবার ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গেল বছরের অগাস্টে স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের জন্য ত্রয়োদশ সংসদে বিল পাস করা হয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৫ সালে সিটি, পৌর, উপজেলা ও ইউপিতে দলীয় প্রতীকে ভোটের বিধান রেখে আইন সংশোধন করে। সেই আইন সংশোধন করে এবার নির্দলীয় প্রতীকে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হল।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থী যাচাই-বাছাই ও ঘোষণা আইন সংশোধনের লক্ষ্যকে কতটা এগিয়ে নেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এভাবে আগেই প্রার্থী ঘোষণা করে রাজনৈতিক দলগুলো ‘ঠিক করছে না’ বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার।
বিএনপি কী করছে?
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ কয়েকটি দলের তৎপরতা দেখা গেলেও ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।
দলের কেন্দ্রীয় কমিটির একাধিক নেতা বলেছেন, এখনো স্থানীয় সরকারের নির্বাচন নিয়ে দলের ভেতরে কোনো প্রক্রিয়া শুরু হয়নি।
বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেছেন, সিটি করপোরেশনগুলোয় প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। যে কারণে চলতি বছরে সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা নেই। এছাড়া উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের প্রার্থীদের বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত কী হবে, এ নিয়ে এখনো কোনো কিছু ঠিক করা হয়নি।
দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “এই বিষয়ে দলে আলোচনা হয়নি।”
মঙ্গলবার রাতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেহেতু দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে না, সে কারণে প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়ে আগে দলে আলোচনা হবে। এরপর সিদ্ধান্ত আসবে।”
বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি এখন বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী। ২০১৫ সালে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর জোনায়েদ সাকি দলীয় প্রধানের দায়িত্ব ছেড়েছেন।
তার দল গণসংহতি আন্দোলন স্থানীয় সরকারের সব পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নেবে।
দলটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী দেওয়ান আবদুর রশীদ নীলু বলেন, “আমরা স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে অংশ নেবো। প্রার্থী কোথায়, কীভাবে হবে, এ নিয়ে দলের অভ্যন্তরে কাজ শুরু হয়েছে।”
জামায়াত জোটের কী কৌশল?
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দাবি করেছিল জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি।
গেল বছর মে মাসে এনসিপি নির্বাচন কমিশনের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচিও দিয়েছিল।
আর জুনের শেষ সপ্তাহে দলীয় প্রতীকসহ নিবন্ধন পুনর্বহাল করে গেজেট প্রকাশের পর নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দাবি জানায় জামায়াতে ইসলামী।
সে দাবি পূরণ হয়নি, কিন্তু দলটি সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রার্থী বাছাই ও ঘোষণা করেছিল।
জামায়াতের মতো এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনসিপিও এই কৌশল নিয়েছে। তারা ইতোমধ্যে পাঁচ সিটি করপোরেশন এবং ১০০ উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
২৯ মার্চ পাঁচ সিটি এবং ১০ মে উপজেলা ও পৌরসভার নির্বাচনের প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করে তরুণদের দলটি।
অর্থাৎ এনসিপি এখন পর্যন্ত ‘এককভাবে’ স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার পক্ষে।
একইভাবে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, আমার বাংলাদেশ পার্টি বা এবি পার্টিও একক নির্বাচনের পথে হাঁটছে।
তবে জোটের কোনো কোনো নেতা ‘জোটগত’ প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে বলে জানা যায়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহীর কমিটির একজন সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, দলটি ইতোমধ্যে সব পর্যায়ের প্রার্থীদের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত করেছে। দলের পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনে দলীয় সমর্থিত প্রার্থীদের নাম কেন্দ্রীয়ভাবে জানানো হবে। বাকি স্তরের প্রার্থীদের তালিকা স্ব-স্ব কমিটি থেকে দেওয়া হবে।
জামায়াতে ইসলামী গেল ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলের প্রার্থী হিসেবে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান হেলালীর
দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন নেতা বলেন, জামায়াতের ১৪টি অঞ্চলের পরিচালকেরা জেলা ও উপজেলার আমির, সেক্রেটারিসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতারা সঙ্গে বসে প্রার্থী চূড়ান্ত করেন। সাধারণত স্থানীয় কমিটিগুলো তিন সদস্যদের একটি প্যানেল প্রস্তাব করে কেন্দ্রে পাঠায়। এরপর তালিকা যাচাই বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ।
স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত রয়েছে জামায়াতের।
দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন সদস্য মঙ্গলবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে প্রত্যেক দল স্ব-স্ব জায়গা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। জোটগত কিছু হবে না।”
দলটির নেতারা বলছেন, এ বছর স্থানীয় সরকারের সবগুলো পর্যায়ের নির্বাচনে বাড়তি মনোযোগ দেওয়ার পক্ষে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের কাজ চলমান আছে। সিটি করপোরেশনের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ পর্যায়ে। যেকোনো সময় ঘোষণা দেব। আর স্থানীয় সরকারের বাকি পর্যায়ের প্রার্থীদের নাম, পরিচয় প্রত্যেক ইউনিট উদ্যোগ নিয়ে ঘোষণা দিচ্ছে। কারো-কারো নাম আসতেছে।”
তিনি বলছেন, সিটি করপোরেশনগুলোর মধ্যে অন্তত নয়টির প্রার্থী বাছাইয়ে প্যানেল প্রস্তাব পেয়েছে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ।
“কোনোটিই চূড়ান্ত হয়নি। আলাপ-আলোচনা চলছে।
জামায়াত-জোটের অন্যতম শরিক এনসিপি। জুলাই অভ্যুত্থানের তরুণদের নিয়ে গঠিত এই দলটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সর্বাগ্রে আগ্রহ দেখায়।
দলটির কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা বলছেন, নতুন দল হিসেবে স্থানীয় সরকারের প্রার্থিতা এককভাবে করার পক্ষে এনসিপি।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হোসাইন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন এককভাবে করার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে দল।
তিনি বলেন, “জোট হলেও আমরা সারাদেশে আগে নিজেদের প্রার্থী দেব। এর মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির উপর ফোকাস করব। পরবর্তীতে জোট হলে আমরা নির্বাচন করতে পারব, আর জোট না হলেও এককভাবে পূর্ণাঙ্গ নির্বাচনের পরিপূর্ণ প্রস্তুতি এনসিপির থাকবে।”
তবে জামায়াতের ১১ দলীয় জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস চাইছে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে।
দলের আমির মামুনুল হক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন, পৌরসভা, উপজেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবো। আর সিটি করপোরেশনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তে আমরা যাবো, তবে যেহেতু আমরা জোটে আছি, সেখানেও আলোচনার দাবি রাখে।”
তিনি বলেন, “আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি। বিগত দিনে ইসলামি দলগুলো স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের বেশি গুরুত্ব না দিলেও এবার পরিস্থিতি ভিন্ন, প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিশেষ করে ‘ফ্যাসিজমের’ বিরুদ্ধে জুলাই অভুত্থানে ইসলামি দলগুলো ও মাদ্রাসা সংশ্লিষ্টরা যেভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, তাতে রাজনৈতিকভাবেও এর প্রভাব তৈরি হয়েছে।
“ইসলামি দলগুলোর প্রতিনিধিদের সমাজের তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ হচ্ছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন।”
জামায়াত জোটের আরেক শরিক এবি পার্টিও দলীয় প্রার্থীদের প্রস্তুতি নিতে বলেছে।
বুধবার দলের চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেহেতু দলীয় প্রতীকে হবে না, তাই এই নির্বাচন দলীয়ভাবে বা জোট আকারে করার সম্ভাবনা কম।
“এবি পার্টির যেসকল নেতারা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী, আমরা ইতোমধ্যে তাদের কাজ শুরু করতে বলেছি।”
তিনি বলেন, “ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সিটিতে যারা নির্বাচন করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন আমরা প্রাথমিকভাবে প্রার্থীদের সবুজ সংকেত দিয়েছি।”
আলোচনা শুরু করেছে বামরা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রার্থী চূড়ান্ত করা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্বাচন করার বিষয়ে বামপন্থি দলগুলোতে ঘরোয়াভাবে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন দলের কয়েকজন নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সিটি বা পৌরসভার মেয়র, উপজেলার চেয়ারম্যানের পদের চেয়ে কাউন্সিলর, মেম্বার পদে নির্বাচনের বিষয়ে বাড়তি জোর দিতে চান তারা।
একইসঙ্গে স্থানীয়ভাবে সৎ, সজ্জন ব্যক্তি প্রার্থী হলে তাকে সমর্থন দেওয়ার পক্ষে তারা।
সিপিবি, বাসদ ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি বলছে, তাদের দলের পক্ষ থেকে সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে কারা অংশ নেবেন, সেটি যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে।
বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের দলের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে কমিটিগুলোকে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্দেশনা দেওয়া আছে। কারা উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়নে ভোট করবেন, তারা যেন স্থানীয় পার্টিকে অবহিত করেন।”
একাধিক বাম দলের নেতা বলেছেন, ঢাকা, বরিশাল, রংপুর, সিলেট অঞ্চলে জোর দিচ্ছেন তারা। ঢাকা উত্তরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ ক্বাফী রতন, ঢাকা দক্ষিণে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বরিশাল সিটি করপোরেশনে মনীষা চক্রবর্ত্তীর নাম আলোচনায় আছে। এছাড়া সিলেট ও রংপুরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থিতা করার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্বাফী রতন এর আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচন করেন। আর মনীষা ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে বাসদের প্রার্থী ছিলেন।
সিপিবি, বাসদসহ কয়েকটি বামপন্থি দলের মোর্চা গণতান্ত্রিক বামজোটের সমন্বয়ক বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, “এখন যেহেতু দলীয় প্রতীক নেই, যে কারণে একই ঘরানার দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করে প্রার্থী নির্ধারণের আলোচনা আছে।”
সিপিবির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল হওয়ার পর বলা যাবে নির্বাচনে আমরা কীভাবে যাব, জোটে নাকি এককে।”
তিনি বলেন, “আমাদের কাজ চলমান আছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে আমরা এককভাবে কেবল না, স্থানীয়ভাবে বামজোটের সঙ্গে প্রার্থী সমন্বয় করা হবে। এটা নির্ভর করবে নির্বাচনের পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর। নির্বাচনে আমরা যদি ভালো মানুষ পাই, এমন মানুষকেও আমরা সমর্থন করতে পারি।”
স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পর্যায়ের নির্বাচনে এবার জোর দিতে চান বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা করে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক। তার দল স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে অংশ নিতে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সাইফুল হক বলেন, “পুরো জিনিসটা এখনো নির্দিষ্ট হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোন স্তর আগে হবে, এটি সরকারকে বলতে হবে। আমরা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে ইউনিয়ন পর্যায়ে বেশির জোর দিচ্ছি। আমাদের এবারের চেষ্টা অধিকাংশ জেলার ইউনিয়নে প্রার্থী দেওয়ার।”
আগেভাগেই প্রস্তুতির পক্ষে ইসলামী আন্দোলনে
একটি আসন নিয়ে এই প্রথম সংসদে আসা ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ স্থানীয় সরকারের প্রায় সব পর্যায়ের নির্বাচনে অংশ নিয়ে আসছে।
আওয়ামী লীগের সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বয়কট করলেও সিটি করপোরেশন নির্বাচন করা দলটির এক নেতা বলছেন, তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও মেম্বার নির্বাচনের প্রস্তুতির নির্দেশনা আরো আগেই দিয়েছেন।
এ বিষয়ে ইসলামী আনন্দোলনের সহকারী মহাসচিব আহমদ আবদুল কাইয়ুম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “উপজেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে প্রার্থী চূড়ান্ত করছে। স্থানীয়ভাবে অনেকে সম্ভাব্য প্রার্থী পরিচয় দিয়ে প্রচারও চালাচ্ছেন।”
দলের কেন্দ্রীয় একজন নেতা বলেছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়রপ্রার্থীর হিসেবে দলীয় আলোচনায় আছেন ইসলামী আন্দোলনের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক আবুল কাশেম ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ-সভাপতি এমএইচ মোস্তফা। ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র প্রার্থীর আলোচনায় আছেন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি শেখ ফজলে বারী মাসউদ এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ।
গাজীপুর সিটিতে মেয়র পদে ফজলুর রহমান, চট্টগ্রাম সিটিতে মেয়র পদে দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক ও মহানগর সভাপতি জান্নাতুল ইসলামের নাম আলোচনায় রয়েছে।
ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতা আহমদ আবদুল কাইয়ুম বলেন, “এবার আমরা ঢালাওভাবে প্রার্থী দিচ্ছি না। যেখানে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা আছে, কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারবে, সেখানেই প্রার্থী দেওয়া হচ্ছে।”
কোন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন আগে?
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয় ২০২৪ সালের মার্চে। ২০২১ সালের শুরুতে ধাপে ধাপে পৌরসভা, ২০২১ সালের এপ্রিলে শুরু হয়ে ধাপে ধাপে ইউপি, ২০২২ সালের অক্টোবরে একদিনে জেলা পরিষদ এবং ২০২৪ সালে ধাপে ধাপে উপজেলা পরিষদের ভোট হয়।
গেল ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন ও চলতি মাসে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট শেষ হয়েছে। এখন ইসির সামনে একগুচ্ছ স্থানীয় নির্বাচন, যেগুলোর মেয়াদ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। যেখানে সিটি ও জেলা পরিষদে বিএনপি নেতারা আছেন প্রশাসক হিসেবে।
নির্দলীয় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন সামনে রেখে সরকারের নানা পদক্ষেপের মধ্যে আইন ও বিধিমালা সংশোধনের কাজ হাতে নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
গেল রোববার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, “কয়েক দিন পর কিছু হালনাগাদ তথ্য জানানো যাবে। সিটি নির্বাচন নাকি পৌর নির্বাচন, কোনটি আগে হবে, তা নিয়ে এখনও আমাদের কাছে স্পষ্ট বার্তা নেই। আমাদেরও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তবে ইউপি নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন শুরু হতে পারে বলেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে, কোনটা আগে হবে, আমরা এখনো ‘ডিসাইড’ করিনি, তবে ইউনিয়ন পরিষদই আগে হবে।”
কবে থেকে শুরু হবে, এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, “দিনক্ষণ ঠিক হলে জানা যাবে।”
মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ বিএনপির একজন নেতা বলেন, “বৃষ্টির মওসুম শেষ হলে পরিস্থিতি দেখেই সরকার ঘোষণা দিতে পারে। শীতের আগে-আগে শুরু হতে পারে।”
জামায়াতের একাধিক নেতা বলেছেন, সরকার কোনটা আগে করবে তারা স্পষ্ট নয়। নির্বাচন কমিশনে যোগাযোগ করা হলে সরকারের তরফে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে তাদের বলা হয়েছে।
তবে দলের একজন নেতার ধারণা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই শুরু হচ্ছে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন।
আগেই প্রার্থী ঘোষণা করা ‘ঠিক হচ্ছে না’
২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুথানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রসংস্কারে ১১টি কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশে স্থানীয় সরকার আইনে সংশোধনী আসে।
স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের কারণে দলীয় প্রতীকে এবার স্থানীয় সরকারের চার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন হচ্ছে না। তবে এনসিপি আগেভাগেই দলের প্রার্থী ঘোষণা করে দিয়েছে। জামায়াতের প্রার্থীর নামও আসছে সংবাদ মাধ্যমে।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট্কমকে বলেন, “দলীয়ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচন করার পর পুরো ব্যবস্থাটিকে ধ্বংস করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সমাজে ভূমিকা রাখেন এমন ব্যক্তিরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন, কিন্তু দলভিত্তিক হওয়ার পর তারা অনাগ্রহী হয়েছেন। যে কারণে যোগ্য প্রার্থী কমেছে, প্রার্থীর মান কমেছে।
“দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ফিরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ‘ত্রুটি ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা’ থেকে বেরুনোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।”
তিনি বলেন, “সরকার আইন করলেও মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। আমাদেরকে আইন মানতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকেও মানতে হবে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো কোনো দল স্থানীয় সরকারের প্রার্থীদের নাম, তালিকা প্রকাশ করছে-এগুলো ঠিক করছে না। এটা তো দলীয় মনোনয়নই হল শেষ পর্যন্ত।”
বদিউল আলমের মতে, স্থানীয় সরকারে দলীয় বিষয় যুক্ত করার মানে আবারো মারামারি-কাটাকাটির দিকে যাওয়া, আর এটা যদি হয় তাহলে সংঘাত, সংঘর্ষের ষোলআনা পূর্ণ হবে।