Image description

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক একটি গোষ্ঠীর গোয়েন্দাগিরি। অদৃশ্য সেই খেলায় দারুণভাবে তৎপর বাংলাদেশি রহস্যময় এক যুবক। আন্তর্জাতিক চক্রের নেপথ্যে থাকা সেই যুবক চাকরিচ্যুত একজন নৌ-কর্মকর্তা। তিনি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন অনেকটা নাটকীয়ভাবে। আর এই সুযোগ মিলেছে দেশের অন্যতম একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তার মাধ্যমে। দিল্লি ও ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে সেই যুবক শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের স্পর্শকাতর নানা তথ্য সংগ্রহ করছেন। সেসব তথ্য নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সংযোগের অদৃশ্য জাল বুনে চলেছেন।

চাকরিচ্যুত হলেও নৌবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়েছেন বলে প্রচার চালানো সেই যুবকের নাম মো. জিম জুবাইদ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে যাকে নানাভাবে ব্যবহার করতেন তৎকালীন একটি গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল টি এম জুবায়ের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর সীমান্ত পেরিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান দুজনই। পরে দিল্লিতে জিমকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হতে সাহায্য করেন মেজর জেনারেল জুবায়ের। একইভাবে জিম ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও ভাব জমান। জিমের গোপন তৎপরতায় উঠে আসছে গুপ্তচরবৃত্তি, ভুয়া পরিচয় ব্যবহার আর একাধিক আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংযোগের অদৃশ্য জাল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, তারা। এমনও হতে পারে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়ে বাংলাদেশকে আরও চাপে ফেলতে এসব করা হচ্ছে।

তথ্য বলছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতের দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক ও ভূরাজনীতির নানা মেরূকরণ চলছে। আর সেই মেরূকরণের অংশ হয়ে দাবার ঘুঁটি হিসেবে কাজ করছেন জুবাইদ জিম। অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করা এই যুবককে খুঁজতে এরই মধ্যে মাঠে নেমেছে সেদেশের গোয়েন্দা সংস্থা। তৎপরতা বাড়িয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভারতের সংবাদমাধ্যম নিউ দিল্লি পোস্টে সম্প্রতি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

কে এই জুবাইদ জিম, কীভাবে ঢুকে পড়লেন ক্ষমতার অন্দরে, আর কেনই বা তার সঙ্গ নিয়েছে একাধিক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা— এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই কালবেলার অনুসন্ধান।

জানা গেছে, শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার পরিচয়ে অবৈধভাবে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। ভুয়া এই পরিচয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে চালিয়েছেন গুপ্তচরবৃত্তি। অভিযোগ পাওয়া গেছে, তুরস্কের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স অর্গানাইজেশান (এনআইও) তুর্কি ভাষায় সংক্ষেপে যা এমআইটি নামে পরিচিত এবং পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন শেখ হাসিনা সম্পর্কে স্পর্শকাতর অবাস্তব সব তথ্য। একই সঙ্গে দলীয় পরিচয় ও প্রটোকল অফিসার পরিচয় দিয়ে প্রতারণারও ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে এসব তথ্য নিশ্চিত হয়েছে কালবেলা।

একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র কালবেলাকে নিশ্চিত করেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জুবাইদ জিম কখনো প্রটোকল অফিসার ছিলেন না। আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রমেও তিনি কখনো সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাকে কখনো গণভবন বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও দেখা যায়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গেও তার সম্পর্ক ছিল—এমন তথ্য পাওয়া যায় না। তিনি একটি বাহিনীর অফিসার পদমর্যাদার কর্মকর্তার পরিচয় দেন, যদিও সেটিও ভুয়া। সূত্র বলছে, মূলত তিনি একজন গুপ্তচর ও প্রতারক। ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন এবং বিভিন্নভাবে ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছেন। জিম বিশাল একটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জালের একটি অংশ বলে ধারণা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার কাছাকাছি আছেন—এমন অন্য বাংলাদেশির মাধ্যমেও জিম তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও কালবেলার অনুসন্ধান বলছে, জিমের পাসপোর্ট নম্বর বি ০০১০৩৭৬৬। পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে তিনি ফরেনসিক সায়েন্স বিভাগে (ডক্টরেট) পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ভারতে যাওয়ার আগে গত ডিসেম্বর মাসে শেষবারের মতো তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধা যান। এরপর তাকে আর সেখানে দেখা যায়নি। তবে মাঝেমধ্যে মোবাইল ফোনে পরিবারের সঙ্গে কথা বলেন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে। বিষয়টি জিমের বাবা মো. রেজাউল করিমও স্বীকার করেছেন। এই প্রতিবেদক প্রথমে নিজের পরিচয় গোপন করে জিমের বাবার সঙ্গে কথা বলেন। সেসব কথাবার্তার তথ্যপ্রমাণ কালবেলার কাছে সংগৃহীত আছে। সে সময় তিনি দাবি করেন, জিম ভারতে পিএইচডি করছেন। তিনি সাবেক নৌবাহিনীর কর্মকর্তা। জিমের শ্বশুরবাড়ি ঢাকা মিরপুর-২ নম্বর। সেখানেই তার স্ত্রী বসবাস করছেন। তিনি আরও দাবি করেন, ২০১৩ সালে জিম নৌবাহিনীতে যোগ দেন আর ২০২১ সালে স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়েন। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর আর তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, জুবায়েদ জিমের বাবা মো. রেজাউল করিম জয়েনপুর আদর্শ কলেজের প্রভাষক ছিলেন। চাকরি জীবন শেষে বর্তমানে তিনি অবসরে আছেন। জিমের গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট মোড়। ৫ আগস্টের আগে আওয়ামী লীগ ঘেঁষা পরিবারের হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন ভোল পাল্টে নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দেন।

তার বাড়ি আশপাশের বাসিন্দারা কালবেলাকে বলেন, জিম অনেক আগে থেকে ঢাকায় বসবাস করছেন। তারা শুনেছেন জিম ঢাকায় বড় চাকরি করেন। বড় বড় নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে তার উঠবস। গ্রামে কম আসেন। একটা সময় তাদের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা ছিল। এখন তারা সামর্থ্যবান। এলাকায় অনেককে চাকরি দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু মাঝেমধ্যে গ্রামে এলে জিম বলতেন, সময় পান না। ঢাকায় তার বড় দায়িত্ব পালন করতে হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জহুরুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ৮-১০ বছর বয়সে দেখেছি। পরে শহরে লেখাপড়া করে চাকরি করে এটাই জানি। মোতালেব মিয়া নামের আরেক প্রতিবেশী কালবেলাকে বলেন, শুনেছি জিম বাহিনীতে চাকরি করত। তার বাবা আদর্শ কলেজের একজন প্রভাষক ছিলেন।

সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে ফের আন্তর্জাতিক তৎপরতা চলছে ভারতের দিল্লিতে। এর পেছনে রয়েছে তুরস্কের গোয়েন্দা এমআইটি ও পাকিস্তানের আইএসআই। গোপনে নজরদারি করে নতুনভাবে নানা ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার চেষ্টা করা হচ্ছে। তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করতে তাদের হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন জুবাইদ জিম। তবে এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক রয়েছে ভারতের ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ)। ভারত সরকার বিষয়টিকে কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে দেখছে না; বরং বৃহত্তর জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে বলে কূটনৈতিক সূত্র থেকে বলা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাদের দাবি, শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন বিদেশি চক্রান্ত চলছে। তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থা সেখানে তৎপরতা চালাচ্ছে। তাদের হয়ে মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন জুবাইদ জিম। বাংলাদেশের একটি বিশেষ চক্র এ পরিকল্পনায় যুক্ত বলেও তারা দাবি করেন। তারা মনে করেন, এর মূল উদ্দেশ্য শেখ হাসিনার নিরাপত্তায় বিঘ্ন ঘটিয়ে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করা।

ভারতের নিউ দিল্লি পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার সাবেক ‘প্রটোকল অফিসার’ পরিচয় দিয়ে ভারতের অভ্যন্তরের তথ্য সংগ্রহ করে স্ত্রীর মাধ্যমে জিম তুরস্কে পাচার করছেন। তার স্ত্রী গত বছর একাধিকবার তুরস্কে যান এবং এমআইটি-সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সংবেদনশীল তথ্য পাচার করেন। জিম নিজেকে মেজর বা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাস্তবে তিনি ক্যাডেট থাকা অবস্থায় নৌবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হন। ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জুবাইদ জিম বৈধ ভিসায় ভারতে প্রবেশ করলেও গত বছর ৬ জানুয়ারি তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়।

অপপ্রচার, সাইবার ফাঁদ তৈরি ও প্রবাসীদের হুমকিসহ রাজনৈতিক চক্রান্তের পাশাপাশি জিমের বিরুদ্ধে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ আছে। ইউরোপ ও এশিয়ায় অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিভাজন তৈরির পাশাপাশি, ভারতে থাকা বাংলাদেশিদের হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজি এবং অনেকের পাসপোর্ট আটকে রাখার মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জিম সম্প্রতি এক আফ্রিকান নারীর ছবি দিয়ে তাকে শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের কন্যা বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে তিনি সায়মা ওয়াজেদের আস্থাভাজন হিসেবেও নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছেন। সাইবার জগতেও জিম বড় ধরনের ফাঁদ পেতেছেন বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তিনি ‘ওয়াইজ-গভ’ নামে একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের ওয়েবসাইট চালুর চেষ্টা করছেন, যা মূলত পলিসি গবেষণার আড়ালে দর্শনার্থীদের ব্যক্তিগত সংবেদনশীল তথ্য চুরির একটি ফিশিং সাইট বা হ্যাকিং ফাঁদ।

কূটনৈতিক বিশ্লেষক মুন্সী ফয়েজ আহমদ কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করার জন্য বিষয়টি ষড়যন্ত্রের অংশ হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে বাংলাদেশকে সতর্ক থাকতে হবে, যেন এই ফাঁদে পা না পড়ে। উভয় দেশের জন্যই ভালো হবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশ কী করল এই হিসেবে সম্পর্ক হবে না। কৌশলে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। এক দেশের কথা শুনে অন্যে দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করা যাবে না।

বাংলাদেশি যুবক অবৈধভাবে ভারতে অবস্থান করে তুরস্ক ও পাকিস্তানে তথ্য পাচার করছে—এতে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে এই সাবেক রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, দেশের কোনো নাগরিক অন্য দেশে গিয়ে ষড়যন্ত্রে অংশ নিলে এবং তা প্রমাণ হলে অবশ্যই দেশের সুনাম ক্ষুণ্ণ হবে। তবে এখনই উপসংহারে না গিয়ে সব খতিয়ে দেখতে হবে আসলে এসব কতটা সত্য।