Image description

কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় নেই। ফলে বাড়ছে ঘাটতির অঙ্ক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল—আইএমফের ঋণের কিস্তিও সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না শর্ত পূরণে ব্যর্থতায়। সরকারের তহবিলে ‘হাতখুলে’ খরচের টাকা নেই।

তাই ধারকর্জই এখন ভরসা। এরই মধ্যে ব্যাংক থেকে রেকর্ড পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়ে গেছে। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও চাওয়া হয়েছে সোয়া তিন বিলিয়ন ডলারের ঋণ। এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম লাগামহীন বাড়তে থাকায় সরকারের পক্ষে বেশি দামে জ্বালানি কিনে কম দামে বিক্রির সুযোগ কমে আসায় বাধ্য হয়ে দেশের বাজারেও দাম বাড়াতে হয়েছে।
 
এরই মধ্যে আসছে নতুন অর্থবছরের জন্য উচ্চাভিলাষী বাজেটের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু আয় না থাকলেও ঠিকই সরকারকে খরচ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। দেশি-বিদেশি ঋণের সুদও দিতে হচ্ছে কড়ায়গণ্ডায়। তথ্য-উপাত্ত বলছে, সব মিলিয়ে সরকার ‘মধ্যবিত্তের সংসার’ চালানোর মতো এখন অনেকটাই অর্থকষ্টে আছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডএনবিআরের চলতি অর্থবছরের আট মাসের তথ্য বলছে, রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। এই সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছিল তিন লাখ ২৫ হাজার ৮০২ কোটি টাকা, কিন্তু আদায় হয়েছে মাত্র দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে রাজস্ব আয়। বাকি চার মাসে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা আদায়ের প্রয়োজন হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় হয়নি। অথচ লক্ষ্য পূরণে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আদায় করার কথা।

আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্কতিনটি প্রধান খাতেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। বিশেষ করে আয়কর খাতে বড় ঘাটতি দেখা গেছে। করদাতাদের বড় অংশ এখনো কর নেটের বাইরে রয়েছে। প্রায় এক কোটি ২৮ লাখ টিআইএন-ধারীর মধ্যে মাত্র ৪৬ লাখ রিটার্ন জমা দিয়েছেন, যা কর ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। এর বাইরেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আমদানি শুল্ক না পাওয়া, ব্যবসা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্লথগতির জন্য ভ্যাট আদায় কম হওয়ার কারণেও এর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আয়ে।

কিন্তু মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো সরকারের আয় কমে গেলেও খরচ ঠিকই করতে হচ্ছে। রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানান খাতে কৃচ্ছ্রসাধনের পরও মোটা টাকাই খরচ হয়। যেহেতু রাজস্ব আয় ঠিকমতো হচ্ছে না, তাই সরকার বাধ্য হয়েই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ধার করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ঘাটতি মেটাতে সরকার ক্রমেই ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অর্থবছরের ৯ মাসেই ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ প্রায় এক লাখ ৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। শুধু জানুয়ারি থেকে মার্চএই তিন মাসেই নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বেসরকারি খাত ঋণ পাবে না। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানও হবে না। পরিণামে তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আরো কমিয়ে দেবে।

শুধু সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস্য থেকেই ঋণ নিচ্ছে তা নয়; ইআরডি বলছে, বর্তমানে দেশের মোট বিদেশি ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। এমন অবস্থায়ও নতুন করে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি বিদেশি ঋণ চাওয়া হয়েছে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে।

অথচ আয় না থাকলেও এসব ঋণ সময়মতোই শোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। সূত্র জানায়, আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে, যা অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।

আইএমএফ থেকে সরকার ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ নিলেও এখন সংস্থাটি শর্ত পূরণের ব্যর্থতাকে ইঙ্গিত করে পরবর্তী কিস্তি নিয়ে টালবাহানা করছে। ওয়াশিংটনে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে সংস্থাটি নিশ্চয়তা দেয়নি নতুন কিস্তি ছাড়ের। এর ফলে বাজেট বাস্তবায়নে আরো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে তড়িঘড়ি করে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হলো। যদিও সরকার বারবারই বলছে, আপাতত জ্বালানির দাম বাড়াবে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ক্রমাগত বাড়তি দামে জ্বালানি কিনে দাম কম দামে ভোক্তার কাছে বিক্রির কারণে সরকারকে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছিল। এটিই কমিয়ে আনতে চাপ দিচ্ছিল আইএমএফ। এখন সরকারের যেহেতু বাজেট বাস্তবায়ন ঝুঁকিতে এবং দেশ চালাতে টাকার প্রয়োজন। তাই সাতপাঁচ না ভেবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে হয়েছে। এটি কিছুটা হলেও সরকারকে আর্থিকভাবে স্বস্তি দেবে। তবে তা সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি উসকে দিতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা, যা পরিণামে সরকারের আরেক মাথাব্যথার কারণ হতে পারে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।

এ অবস্থায় সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সোয়া ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের বাজেট প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, নতুন বেতন-কাঠামো এবং ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। তবে রাজস্ব আয় সেই হারে না বাড়ায় বাজেট ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।

ব্যয়ের বড় অংশই এখন ঋণের সুদ ও ভর্তুকিতে চলে যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরে সুদ পরিশোধে বরাদ্দ ছিল প্রায় এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা আগামী বছর আরো বাড়তে পারে। জ্বালানি খাতে ভর্তুকিও বাড়ছে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নয়ন ব্যয় বৃদ্ধি, যা সামগ্রিক ব্যয়চাপকে আরো তীব্র করছে।

ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি গ্রহণ না করলে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তারা রাজস্ব আয় বাড়ানো, করব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, কর ফাঁকি রোধ ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাছাইয়ে সতর্কতা এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণের ওপর জোর দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সরকার যদি এ রকম ব্যাংক থেকে ঋণ বেশি নেয়, সেটা কিন্তু আলটিমেটলি রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এত যে ঋণ নিচ্ছে, তা পরিশোধ করা নিয়েও দেখা যাবে যে সরকার সংকটে পড়ে গেছে।

এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা যাতে একটা ঋণ ফাঁদের মধ্যে না পড়ি, এটা মূল টার্গেট হতে হবে এই সরকারের। বোঝলাম যে এখন তাদের জ্বালানিসহ বিভিন্ন কারণে ঋণ নিতে হচ্ছে। বিভিন্ন কিছু সামাল দিতে হচ্ছে। তাদের ইলেকশনে দেওয়া আশ্বাস যেগুলো আছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তাদের একটা বাধ্যবাধকতা আছে। কিন্তু আমাদের সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে সম্পদ আহরণ, রাজস্ব কিভাবে আমরা বৃদ্ধি করতে পারি, সেদিকে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রদান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চাপে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাহিদা বাড়লেও শুধু ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যালান্স অব পেমেন্টসহ সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর কোথায় কী চাপ তৈরি হচ্ছে, তার স্পষ্ট মূল্যায়ন জরুরি। তিনি জানান, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় কমা ও রেমিট্যান্স ঝুঁকির কারণে চাপ বাড়ছে। একই সঙ্গে রাজস্ব ঘাটতি, ভর্তুকি বৃদ্ধি ও সামাজিক ব্যয়ও বাড়বে। এসব মোকাবেলায় সমন্বিত সংকট ব্যবস্থাপনা, সংস্কার অব্যাহত রাখা এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সমন্বিত সহায়তা প্রয়োজন।