Image description

শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী উপজেলা নিয়ে গঠিত শেরপুর-৩ আসন। দীর্ঘদিন ধরেই আসনটি বিএনপি ও স্থানীয় ‘হক’ পরিবারের ঘাঁটি হিসেবেই পরিচিত। ১৯৭৯-১৯৯১ সালে এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচতি হন বিএনপির প্রার্থী হক পরিবারের ডা. সেরাজুল হক। ১৯৯৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর তাঁর ডাক্তারি পড়ুয়া ছেলে মাহমুদুল হক রুবেল বাবার জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৯৪-৯৫ সালের উপনির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেন।

১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির টিকিটে দ্বিতীয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাহমুদুল হক রুবেল। পরে ২০০১ সালের নির্বাচনেও ধানের শীষ নিয়ে সংসদে যান এই রাজনীতিক। এরপর হক পরিবার থেকেই রুবেলের নিজের চাচা প্রকৌশলী ফজলুল হক আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে এমপি নির্বাচিত হলে ২০০৮ সাল থেকে আসনটি বিএনপির হাতছাড়া হয়।

এরপর টানা তিনবার সংসদ সদস্য হয়েছেন প্রকৌশলী ফজলুল হক। সবশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনে একই পরিবারের মাহমুদুল হক রুবেলের আরেক চাচাতো ভাই এডিএম শহিদুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের দুর্গ পুনরুদ্ধারে নামে বিএনপি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ভোটের আগে জামায়াত প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে স্থগিত হওয়া শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনের নির্বাচনে এবার পারিবারিক ‘লিগ্যাসি’ ধরে রাখা ও দলের হারানো আসন পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আবার মাঠে নেমেছেন তিনবারের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল।

প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর থেকেই রুবেলের পক্ষে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের দলীয় নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যরাও সমানতালে মাঠে নামেন। আসনের বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে নিয়মিত অংশ নেন তাঁর স্ত্রী ফরিদা হক দীপা ও মেয়ে রুবাইদা হক রিমঝিম। তরুণ ভোটারদের কাছে টানতে সক্রিয় ছিলেন রুবেলের ছেলে রাফিদুল হকও।

বিএনপি প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেলের দাবি, আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে দুর্যোগকালীন সময়ে তিনি সবসময় মানুষের পাশে ছিলেন। এলাকার প্রতিটি সমস্যা ও সম্ভাবনা তাঁর জানা।

তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য থাকাকালে এই এলাকায় বহু রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্টসহ শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করেছি। কিন্তু ২০০৬ সালের পর এই এলাকায় দৃশ্যমান তেমন কোনও উন্নয়ন করেনি ফ্যাসিস্ট সরকার। এখন যেহেতু বিএনপি সরকার গঠন করেছে। বিপুল ব্যবধানে জনসাধারণ আমাকে বিজয়ী করলে সীমান্তবর্তী অবহেলিত মানুষের পরিবর্তনে রাস্তাঘাট, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পর্যটনসহ কর্মসংস্থান গড়ে তুলতে কাজ করে যাব, ইনশাআল্লাহ।’

অন্যদিকে অন্যদিকে পুনঃতফসিলের পর থেকে মাঠে সরব ছিলেন জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী, প্রয়াত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের ছোটভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মাসুদুর রহমান মাসুদ। ভাইয়ের রাজনৈতিক পরিচিতি ও সংগঠনকে কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করার চেষ্টা করছেন।

দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী মাসুদুর রহমান মাসুদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘এখানকার ভোটাররা এখন সচেতন, তারা পরিবর্তন চায়। চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলদারত্ব থেকে মুক্তির আশায় মানুষ জামায়াতকে বিকল্প হিসেবে দেখছে। ভোটাররা আমাকে জয়ী করলে মরহুম নুরুজ্জামান বাদলের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।’

নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে মোট তিনজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপর সংসদ সদস্যপ্রার্থী হলেন বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) মার্কসবাদীর মনোনীত মিজানুর রহমান। কাগজে-কলমে থাকলেও ভোটের মাঠে ততটা সরব নন এই প্রার্থী।

স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আসনটিতে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আবু তালেব মো. সাইফুদ্দিন ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলাম বাদশা সরে দাঁড়ানোয় এখন মূল লড়াইটা হবে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর মধ্যেই। তবে বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় এবং পারিবারিক ‘লিগ্যাসি’র কারণে মোটামুটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন বিএনপি প্রার্থী।

এদিকে আগামী বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে ঘিরে প্রচার-প্রচারণা, জনসভা ও গণসংযোগ শেষ হয়েছে আজ মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সকাল ৭টায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপে গত কয়েকদিন মুখরিত ছিল পুরো আসন। ভোটারদের মন জয়ে চলেছে ব্যাপক প্রচারণা, গণসংযোগ, পথসভা। প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ে দিয়েছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও তার আগেই ৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদলের অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যু হওয়ায় এ আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়। ফলে ১২ তারিখের ভোট উৎসবে শামিল হতে পারেননি এ এলাকার ভোটাররা। তাই ৯ এপ্রিলের নির্বাচনে ভোট দিতে মুখিয়ে রয়েছেন তারা।

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্যমতে, শ্রীবরদী উপজেলার একটি পৌরসভা ও ১০টি ইউনিয়ন এবং ঝিনাইগাতী উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে শেরপুর-৩ আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৩ হাজার ৩৭৭ জন। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি নারী ভোটার।

নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবিসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে বসানো হচ্ছে সিসিটিভি ক্যামেরা। এছাড়াও থাকছে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা।

এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, শেরপুর-৩ আসনের দুটি উপজেলায় মোট ১২৮টি ভোটকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে গারো পাহাড়ি এলাকার ৩২টি কেন্দ্রকে দুর্গম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।