২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতন ঘটে পতিত আওয়ামী লীগের। দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরও নানাভাবে দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার চেষ্টা করছে পতিত দলটি। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার গঠন হওয়ার পরই গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডার সংগঠন ও দলগুলোর মধ্যে বিভেদ ও বিভক্তির রেখার পরিসর দীর্ঘ হওয়ায় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। নতুন সরকার গঠন হওয়ার পরপরই আওয়ামী লীগের জেলা ও মহানগর পর্যায়ে শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই জামিনলাভ করেন এবং অনেকেই কারামুক্ত হন। যার ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে পুনরায় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ফেরার গুঞ্জনের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক বোদ্ধাদেরও কেউ কেউ বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হওয়ায় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের বিষয়টি পুনরায় প্রাসঙ্গিকতা লাভ করছে। কিন্তু ফেরার কৌশলটা কি হতে পারে, কারা পতিত দলটিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসনে সহায়তা করতে পারে কিংবা আদৌ ফিরতে সক্ষম হবে কি না- এ রকম নানা প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরই বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস, পিরোজপুর-২ আসনের সাবেক এমপি অধ্যক্ষ শাহ আলম, বরিশাল-৫ আসনের সাবেক এমপি জেবুন্নেছা আফরোজ, বরিশাল মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন, মহানগর যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হক খান মামুনসহ তৃণমূল আওয়ামী লীগের অনেকেই জামিনলাভ করেন। বরিশাল জেলায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের একের পর এক জামিনলাভে এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি পতিত দলটির নেতাদের জামিনলাভে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি আদালত বর্জনও করেছে। এদিকে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আখলাক হায়দার কুমিল্লা কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার বাসায় মিষ্টি ও ফুল নিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে যান উপজেলা বিএনপির আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক সোহেল আহমেদ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় বগুড়ায় সংঘটিত সহিংসতার অভিযোগে করা এক মামলায় কক্সবাজারের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদিকে নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকেও কয়েকটি মামলায় জামিন দেয়া হয়েছে। এদিকে জুলাই আন্দোলন চলাকালে বর্বোরচিত হত্যাকাণ্ডের মতো বড় অপরাধ করলেও গত দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও বিন্দুমাত্র অনুশোচনাবোধ দেখা যায়নি দলটির কোনো পর্যায়ের নেতৃত্বের মধ্যে। তারপরও ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করা শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ ও শিশু হত্যার দায় এড়াতে পুলিশ নিহত হওয়ার ঘটনাকে বারবার সামনে নিয়ে এসে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব ও কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে। এমন প্রেক্ষাপটে এসব চিহ্নিত অপরাধীদের একের পর এক জামিন দেয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নিজেদের ভুলের কারণে আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে সঙ্কটময়কাল পার করছে পতিত দলটি। পতনের মাত্র ৪ মাসের মাথায় হওয়া বিদেশী গণমাধ্যমের এক জরিপে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে দেশের মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও অপরাধের মাত্রা এত বেশি দীর্ঘ যে গত দেড় বছরের বেশি সময় পার হলেও পতিত দলটির জন্য দেশের মানুষের মন গলেনি, তারাও ফিরে আসতে পারেনি। তথ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে এক হাজার ৪০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে এবং ১০ হাজারের ওপরে আহত ও পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। কিছু কিছু কতিপয় সুশীল নামধারী আওয়ামী বুদ্ধিজীবী মাঝে মধ্যে টিভি টকশোতে ভিন্ন ন্যারেটিভ উপস্থাপন করে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। পতিত দলটির সমর্থকগোষ্ঠীর কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছেন- ‘শেখ হাসিনা আসছে, বাংলাদেশ হাসছে!’
অবশ্য বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ইকতেদার আহমেদ একটি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের কথা বলছেন। তার মতে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগতো অপরাধ করেনি। দলের সবাইতো অপরাধী না। জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার সাথে জড়িত দলের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনাও যদি থাকে তাহলে তার অবশ্যই বিচার করতে হবে। তবে যারা অপরাধ করেনি তাদেরকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে রাজনীতি বিশ্লেষক গোলাম মওলা রনি মনে করেন, আওয়ামী লীগের যে সমস্ত নেতার প্রতি জনঅসন্তাষ তৈরি হয়ে আছে, যারা অন্যায় করেছে তাদের বিচার হওয়া উচিত, তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত। শুদ্ধ রাজনীতির স্বার্থে তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া উচিত হবে না। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে দেশে যে রাজনৈতিক দলগুলো আছে তাদের কর্মকাণ্ড, তাদের মধ্যে বিভক্তিসহ সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগ ফেরার প্রাসঙ্গিকতা দেখা যাচ্ছে।