বিএনপি এখন ক্ষমতায়, তাই দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রদলও চাঙা। তার মধ্যেই ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার ইফতার পার্টি তৈরি করেছে কৌতূহল। তাতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন কমিটির গুঞ্জন ছড়াচ্ছে।
মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় নতুন কমিটির আলোচনাকে স্বাভাবিকভাবেই নিচ্ছেন ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। তবে তাঁরা বলছেন, নতুন কমিটি কবে হবে, তা ঠিক করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাত সদস্যের কমিটিও, যার নেতৃত্বে আছেন গণেশ চন্দ্র রায় ও নাহিদুজ্জামান শিপন।
গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর, বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির এক বছর। সেই হিসাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ এক বছর আগে শেষ হয়েছে। চলতি মাসে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদও ফুরাবে।
২০২৪ সালে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনের অবসানের পর চাপমুক্ত হয় ছাত্রদলও। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চলছিল তৎপরতা। তবে কোনো নির্বাচনেই প্রত্যাশিত ফল পায়নি সংগঠনটি।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে ২০২৪ সালের ১ মার্চ রাকিবুল ইসলামকে সভাপতি ও নাছির উদ্দীনকে সাধারণ সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাত সদস্যের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাত সদস্যের কমিটিও, যার নেতৃত্বে আছেন গণেশ চন্দ্র রায় ও নাহিদুজ্জামান শিপন।
এর পর থেকে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর সেই আলোচনা জোর পেয়েছে। সম্ভাব্য নতুন কমিটিতে পদ পেতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন নেতারা।
ইফতার পার্টিতে গুঞ্জন
পবিত্র রমজানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ইফতার পার্টির আয়োজন করেছেন বেশ কয়েকজন নেতা। ইফতারের পর ক্যাম্পাসে নেতা-কর্মীদের নিয়ে মহড়া দিতেও দেখা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, সামনে যেহেতু ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কমিটি হবে; সে জন্য পদপ্রত্যাশীরা ক্যাম্পাসে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে ইফতারের আয়োজন করছেন এবং অনুসারীদের জড়ো করছেন।
১২ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অন্তত চারজন নেতার ইফতার পার্টির খবর পাওয়া গেছে। তবে তাঁরা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতার কথা বলছেন না। কেউ প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন, কেউ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনার কথা বলছেন।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নেতা-কর্মীদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম (জিসান)৷ ইফতারের পর তারেক রহমানের সংসদে অভিষেককে স্বাগত জানিয়ে মিছিল বের হয় তাঁর নেতৃত্বে।
১২ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অন্তত চারজন নেতার ইফতার পার্টির খবর পাওয়া গেছে। তবে তাঁরা কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতার কথা বলছেন না। ছাত্রদলের কর্মীরা বলছেন, নতুন কমিটি গঠনকে সামনে রেখেই এ তৎপরতা চলছে।
এর আগে বুধবার এমন ইফতার পার্টির আয়োজন করেন দুজন নেত। তার মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সহসভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম সোহেলের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ইফতারের পর মিছিল বের করা হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের প্রচার সম্পাদক শরীফ প্রধান শুভর উদ্যোগে ইফতারের আয়োজন ছিল হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের মাঠে। ইফতারের পর তাঁর নেতৃত্বেও মিছিল হয়।
এর আগে ৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে নেতা-কর্মীদের নিয়ে ইফতারের আয়োজন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার (অনিক)। আওয়ামী লীগের (এখন কার্যক্রম নিষিদ্ধ) শাসনামলে ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের প্যানেলে জিএস (সাধারণ সম্পাদক) পদে প্রার্থী ছিলেন তিনি।

ছাত্রদলের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী (সম্ভাব্য) নেতাদের এসব আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা যেমন থাকছেন, তেমনি রাজধানীতে অবস্থিত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাশাপাশি মহানগর ও বিভিন্ন থানা ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও অংশ নিচ্ছেন।
এই ইফতার আয়োজন নিয়ে মমিনুল ইসলাম (জিসান) প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কয়েক বছর ধরে প্রতি রমজানেই আমার নেতা–কর্মী যারা থাকে, আমার ইউনিভার্সিটির পাশাপাশি ঢাকা শহরের বিভিন্ন ইউনিটে যারা আমার কলিগ, তাদের নিয়ে ইফতার করার চেষ্টা করি। তারই ধারাবাহিকতায় এবং ঈদের কাছাকাছি সময়ে নেতা–কর্মীদের আনুষ্ঠানিক বিদায় দেওয়ার জন্য ১২ মার্চ বড়সড় করে ইফতারের আয়োজন করেছি।’
মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের সংসদীয় অভিষেকের সাফল্য কামনা করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে হয়েছিল বলে জানান তিনি।
প্রতিবছরের মতো এবারও ইফতারের আয়োজন করেন বলে জানান শরীফ প্রধান শুভ। মিছিল নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জনাব তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবার পরে দেশের জনগণের জন্যে যে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছেন, তাকে স্বাগত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করেছি।’
নতুন কমিটি কবে হবে, কখন হবে, সবকিছু ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নিবেন।নাছির উদ্দীন, সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রদল
আনিসুর রহমান খন্দকারও ইফতার আয়োজন নিয়ে একই কথা বলেন। তবে মিছিল করেননি দাবি করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ইফতার শেষে নামাজ পড়ার উদ্দেশ্যে আমরা একত্র হয়ে কেন্দ্রীয় মসজিদের দিকে হেঁটে যাই এবং সেখানে নামাজ আদায় করি। আসার সময় আমার নেতা–কর্মীরা কোনো প্রকার স্লোগানও দেয়নি।’
খোরশেদ আলম সোহেলও প্রথম আলোকে বলেন, এ ধরনের আয়োজন আগেও করতেন তিনি, এবারও করেছেন।
মিছিল নিয়ে খোরশেদ আলম সোহেল বলেন, ‘আমরা নতুন কমিটি হওয়ার প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানানোর বার্তা দিয়েছি। এটি স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া।’
সিদ্ধান্ত দেবেন তারেক রহমান
নতুন কমিটি গঠনের এই আলোচনাকে স্বাভাবিকভাবেই নেওয়ার কথা বললেন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছর আমরা দায়িত্ব পালন করেছি। যেহেতু আমাদের দুই বছরের কমিটির মেয়াদ সম্পন্ন হয়েছে, তাই আলাপ-আলোচনাকে আমরা স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছি।’
সে ক্ষেত্রে নতুন কমিটি কবে হতে পারে, জানতে চাইলে নাছির উদ্দীন বলেন, ‘নতুন কমিটি কবে হবে, কখন হবে, সবকিছু ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নেবেন। কমিটি গঠন, সংযোজন, বিয়োজন, পরিবর্তন বা বলবৎ রাখা প্রতিটি সিদ্ধান্তই ওনার। জনাব তারেক রহমান যখন চাইবেন, নতুন কমিটি হবে, তার আগপর্যন্ত আমরা দায়িত্ব পালন করব।’
এর আগে বিভিন্ন সময় বিএনপির পক্ষ থেকেই ছাত্রদলের কমিটির ঘোষণা এসেছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে রাকিবুল ইসলাম ও নাছির উদ্দীনের কমিটির ঘোষণাও আসে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠন নিয়ে বিএনপির বক্তব্য জানতে প্রথম আলো দলটির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেননি।