Image description

নিয়াজ মাহমুদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনের প্রাক্কালে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে জামায়াতে ইসলামী কেন ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ করছে না? সাধারণভাবে দেখলে এটি একটি সাংসদীয় পদ প্রত্যাখ্যানের ঘটনা। কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল একটি পদকে কেন্দ্র করে নয়; বরং গণভোট, জুলাই জাতীয় সনদ, সাংবিধানিক সংস্কার এবং ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের পারস্পরিক আস্থার সংকটকে ঘিরে তৈরি হওয়া বড় রাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।

 

জামায়াতে ইসলামী স্পষ্ট করে বলেছে, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের স্পষ্ট রূপরেখা না থাকলে তারা ডেপুটি স্পিকার পদ নেবে না। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিমের বক্তব্যে এই অবস্থান পরিষ্কার। তার মতে, বিরোধী দল থেকে একজন ডেপুটি স্পিকার দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবের একটি খণ্ডিত অংশ মাত্র। জুলাই সনদ একটি ‘প্যাকেজ’ রাজনৈতিক সমঝোতা; এর আংশিক বাস্তবায়ন মূল লক্ষ্য পূরণ করবে না। এই বক্তব্যের ভেতরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

প্রথমত, জামায়াত বোঝাতে চায় যে তারা ক্ষমতার কোনো প্রতীকী অংশীদার হতে চায় না। তাদের দাবি যে রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন, গণভোট এবং সংসদ গঠনের প্রক্রিয়া হয়েছে, সেই সমঝোতা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে হবে। যদি কেবল একটি পদ দিয়ে বিরোধী দলকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হয়, তবে সেটি গণভোটের রায়কে আংশিকভাবে ব্যবহার করার শামিল হবে।

দ্বিতীয়ত, এই অবস্থান মূলত ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রতি একটি চাপ সৃষ্টির কৌশল। বিএনপি সরকার ইতোমধ্যে ‘গুড উইল’ হিসেবে ডেপুটি স্পিকার পদ বিরোধী দলের জন্য প্রস্তাব করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে সরকার এই প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু জামায়াতের দৃষ্টিতে এটি সদিচ্ছার প্রশ্ন নয়; বরং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা।

জুলাই জাতীয় সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল সংসদব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গড়ে তোলার কথা সেখানে উল্লেখ ছিল। গণভোটে জনগণ সেই প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে বলেই দাবি করা হচ্ছে। ফলে জামায়াতের যুক্তি গণভোটের রায় কার্যকর করার আগে কেবল একটি পদ দেওয়া হলে সেটি হবে রাজনৈতিক প্রতীকীতা, বাস্তব সংস্কার নয়।

রাজনৈতিকভাবে এটি একটি সুপরিকল্পিত অবস্থান বলেই মনে করেন অনেক বিশ্লেষক। কারণ, জামায়াত যদি এই মুহূর্তে ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ করত, তবে সরকার বলতে পারত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে এবং বিরোধী দলও এতে সন্তুষ্ট। সেই সুযোগটি না দিয়ে জামায়াত বরং পুরো সংস্কার প্যাকেজ বাস্তবায়নের দাবি সামনে রাখছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আদালতের সাম্প্রতিক রুল। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ এবং সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে প্রশ্ন উঠেছে। আদালত রুল জারি করার পর পুরো বিষয়টি একটি সাংবিধানিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে।

রিটকারীদের দাবি, সংবিধানে গণভোট বা জুলাই সনদের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। ফলে এই প্রক্রিয়াগুলো সাংবিধানিকভাবে বৈধ কি না, তা আদালতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু জামায়াতের অবস্থান একেবারেই বিপরীত। তাদের যুক্তি যদি গণভোট ও জুলাই সনদকে অবৈধ বলা হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন এবং বর্তমান সংসদের বৈধতাও প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এই যুক্তি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে বোঝা যায় যে জুলাই সনদ এখন কেবল একটি রাজনৈতিক চুক্তি নয়; বরং পুরো ক্ষমতার কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।

ডেপুটি স্পিকার পদ নিয়ে বর্তমান টানাপোড়েনকে তাই অনেকেই বৃহত্তর রাজনৈতিক দরকষাকষির অংশ হিসেবে দেখছেন। সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই এই বিতর্ক সামনে আসায় বোঝা যায়, নতুন সংসদের রাজনীতি সহজ হবে না।

তবে এই পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য আরেকটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সেই সময় জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই প্রস্তাবটি তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

জাতীয় সরকার ধারণাটি মূলত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐকমত্যের ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু বাস্তবে সেই ধারণা কতটা এগোবে, তা নিয়ে এখনও স্পষ্টতা নেই। অনেকের মতে, ডেপুটি স্পিকার ইস্যুতে জামায়াতের কঠোর অবস্থান সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক দরকষাকষিরই অংশ।

এখানে বিএনপির অবস্থানও সহজ নয়। সরকার একদিকে জুলাই সনদের প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলছে, অন্যদিকে সংবিধানের সীমাবদ্ধতার কথাও সামনে আনছে। বিএনপির অনেক নেতা মনে করেন, সংবিধান সংশোধনের আগে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া কঠিন। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ সরকার সংবিধানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এই আস্থার সংকটই মূলত বর্তমান সংকটের কেন্দ্রবিন্দু।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই একটি বিতর্কিত বিষয়। অতীতে দেখা গেছে, বিরোধী দল অনেক সময় সংসদ বর্জন করেছে অথবা সংসদে থেকেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। জুলাই সনদের মাধ্যমে সেই সংস্কৃতি পরিবর্তনের একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিবর্তন কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

জামায়াতের বর্তমান অবস্থানকে কেউ কেউ নীতিগত রাজনীতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দলটি ক্ষমতার একটি পদ পাওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আবার অন্য একটি মত হলো এটি মূলত রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল, যাতে সরকার দ্রুত সংস্কার প্রক্রিয়া শুরু করতে বাধ্য হয়।

যে ব্যাখ্যাই গ্রহণ করা হোক না কেন, একটি বিষয় স্পষ্ট ডেপুটি স্পিকার পদ নিয়ে এই বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এটি কেবল একটি সংসদীয় পদ নিয়ে বিরোধ নয়; বরং গণভোট, সংবিধান, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্নের প্রতিফলন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সামনে। স্পিকার নির্বাচনের পরপরই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল যদি তাদের বর্তমান অবস্থানে অটল থাকে, তবে সেই নির্বাচন নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, জামায়াতের ‘না’ আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা। সেই বার্তা হলো গণভোটের রায়কে প্রতীকীভাবে নয়, বাস্তব অর্থে কার্যকর করতে হবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই বার্তাকে কীভাবে গ্রহণ করে এবং জুলাই সনদের ভবিষ্যৎ বাস্তবায়ন কোন পথে এগোয়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট