Image description

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম

গণতন্ত্রকে তত্ত্বে আমরা কল্পনা করি একটি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে, যেখানে নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে নেতৃত্ব নির্বাচন করে এবং ক্ষমতা ব্যক্তির নয়, প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে। কিন্তু বাস্তব রাজনৈতিক ইতিহাস অন্য এক ধারাবাহিক গল্প বলে—গণতন্ত্রের ভেতরেই পরিবার টিকে থাকে, উত্তরাধিকার ফিরে আসে, নামের ভরসা ভোটের আচরণকে প্রভাবিত করে। পরিবারতন্ত্রকে প্রায়ই গণতন্ত্রের বিকৃতি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, কিন্তু তুলনামূলক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ দেখায়, বহু ক্ষেত্রে পরিবারভিত্তিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা সঞ্চারের একটি কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে কাজ করেছে। রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, পরিবার একটি “বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠান”—যেখানে জনগণ একটি নামের সঙ্গে অতীত কর্মদক্ষতার স্মৃতি যুক্ত করে। ফলে পরিবার কেবল আবেগ নয়; এটি রাজনৈতিক আস্থার শর্টকাট।

দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবারভিত্তিক রাজনীতি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান, কারণ এই অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলো স্বাধীনতার পর দুর্বল প্রতিষ্ঠান কিন্তু শক্তিশালী নেতৃত্বের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছিল। বাংলাদেশে সামরিক কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়া Ziaur Rahman ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দেশ শাসন করেন এবং তার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করেন Khaleda Zia, যিনি ১৯৯১–১৯৯৬ এবং ২০০১–২০০৬—এই দুই মেয়াদে মোট প্রায় ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এই ধারার বর্তমান মুখ Tarique Rahman, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলেও দলীয় নেতৃত্বের উত্তরাধিকার বহন করছেন। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি Sheikh Mujibur Rahman ১৯৭২–১৯৭৫ সময়কালে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন এবং তার কন্যা Sheikh Hasina ১৯৯৬–২০০১ এবং ২০০৯ সাল থেকে দীর্ঘ ধারাবাহিক শাসনকাল মিলিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতায় থেকে আধুনিক বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচিত নেতা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন। এখানে পরিবার কেবল রাজনৈতিক সুবিধা নয়; এটি মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর রাষ্ট্রের পরিচয়, স্মৃতি এবং আদর্শের ধারাবাহিক রূপ।

ভারতের ক্ষেত্রেও পরিবারতন্ত্র প্রশাসনিক ধারাবাহিকতার একটি বাস্তব রূপ নিয়েছে। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী Jawaharlal Nehru ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৪—টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নির্মাণ করেন। তার কন্যা Indira Gandhi দুই দফায় ১৯৬৬–১৯৭৭ এবং ১৯৮০–১৯৮৪ মিলিয়ে প্রায় ১৫ বছর দেশ শাসন করেন, আর তার পুত্র Rajiv Gandhi ১৯৮৪–১৯৮৯ পর্যন্ত পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সমালোচকেরা এটিকে বংশতন্ত্র বলেন, কিন্তু সমর্থকেরা যুক্তি দেন—এই পরিবার স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক স্কুল তৈরি করেছিল, যেখানে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা প্রজন্মান্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে।

পাকিস্তানে পরিবার রাজনীতির সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। Zulfikar Ali Bhutto ১৯৭৩–১৯৭৭ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তার কন্যা Benazir Bhutto ১৯৮৮–১৯৯০ ও ১৯৯৩–১৯৯৬—দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হয়ে গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে ওঠেন। পরিবার এখানে কেবল ক্ষমতার উত্তরাধিকার নয়; এটি রাজনৈতিক শহীদত্ব ও প্রতিরোধের ধারক।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পরিবারতন্ত্র ভিন্ন অর্থ ধারণ করেছে—এখানে তা কর্মদক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৈধতা পেয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা প্রধানমন্ত্রী Lee Kuan Yew ১৯৫৯ থেকে ১৯৯০—৩১ বছর দেশ পরিচালনা করে একটি উন্নয়ন রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। তার পুত্র Lee Hsien Loong ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থেকে সেই নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন। এখানে পরিবারতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা এসেছে অর্থনৈতিক ফলাফল থেকে—যা রাজনৈতিক তত্ত্বে “পারফরম্যান্স লেজিটিমেসি” নামে পরিচিত।

পশ্চিমা গণতন্ত্রও পরিবারতন্ত্রমুক্ত নয়। কানাডায় Pierre Trudeau ১৯৬৮–১৯৭৯ এবং ১৯৮০–১৯৮৪—মোট প্রায় ১৫ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আর তার পুত্র Justin Trudeau ২০১৫ সাল থেকে ক্ষমতায় থেকে উদার গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক নতুন প্রজন্মকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। এখানে পরিবার দলীয় প্রতিযোগিতার ভেতরেই কাজ করেছে, যা দেখায় পরিবার ও গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী নয়; বরং পরিবার গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে নিজেকে বৈধতা দিতে বাধ্য।

সমাজবিজ্ঞানী বিশ্লেষণে পরিবারতন্ত্রের পক্ষে একটি মৌলিক যুক্তি হলো রাজনৈতিক পুঁজির উত্তরাধিকার। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া উত্তরসূরিরা শৈশব থেকেই রাষ্ট্রচর্চা, কূটনীতি, জনসংযোগ ও ক্ষমতার ভাষা শিখে বড় হয়। এটি এক ধরনের দীর্ঘ প্রশিক্ষণ, যা হঠাৎ উঠে আসা নেতাদের তুলনায় প্রশাসনিক অভিযোজন সহজ করে। উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে যেখানে নীতি-ধারাবাহিকতা দুর্বল, সেখানে পরিবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করতে পারে। বিনিয়োগ, পররাষ্ট্রনীতি বা অবকাঠামো উন্নয়নের মতো ক্ষেত্র ধারাবাহিক নেতৃত্ব থেকে লাভবান হয়। পরিবার এখানে একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ড—যা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পূর্বানুমানযোগ্যতা তৈরি করে, আর পূর্বানুমানযোগ্যতা অর্থনৈতিক আস্থার ভিত্তি।

ডিজিটাল যুগ পরিবারতন্ত্রকে বিলুপ্ত করেনি; বরং তাকে রূপান্তর করেছে। নতুন প্রজন্মের ভোটার ব্যক্তিত্ব চায়, কিন্তু সেই ব্যক্তিত্বের পেছনে বিশ্বাসযোগ্য গল্পও খোঁজে। পরিবার সেই গল্প সরবরাহ করে—ইতিহাস, ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতার গল্প। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব সম্ভবত হবে হাইব্রিড—পারিবারিক উত্তরাধিকার, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সমন্বয়। যে পরিবার নিজেদের প্রতিষ্ঠানগত নিয়মের অধীন রাখবে এবং কর্মদক্ষতার মাধ্যমে বৈধতা নবায়ন করবে, তারাই টিকে থাকবে।

শেষ পর্যন্ত পরিবার গণতন্ত্রের শত্রু নয়; পরিবার তখনই বিপজ্জনক হয়, যখন তা প্রতিযোগিতাকে দমন করে। কিন্তু যখন পরিবার জনগণের ভোটে বৈধতা অর্জন করে এবং প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে, তখন তা গণতন্ত্রেরই একটি বাস্তব রূপ হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকেরা কেবল নীতি নয়—স্মৃতি, পরিচয় ও আস্থাকেও ভোট দেয়। রাজনৈতিক পরিবার সেই আস্থার ধারক। গণতন্ত্র নাগরিকের হাতে থাকে, কিন্তু নাগরিক কখনোই ইতিহাসহীন নয়—আর ইতিহাস প্রায়ই পরিবার নামের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকে।

লেখক: জিওপলিটিক্যাল এনালিস্ট