বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখটি একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই দিনটিতে ঢাকার বঙ্গভবনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন এমন একজন মানুষ, যাঁর গত দুই দশকের জীবন ছিল নাটকীয়তা, ট্র্যাজেডি আর অদম্য লড়াইয়ে ঘেরা। তিনি তারেক রহমান। যাঁর রাজনৈতিক যাত্রার এক বিশাল অংশ কেটেছে হুইলচেয়ারে, আর আজ তিনি আসীন হলেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী আসনে।
তারেক রহমানের এই যাত্রা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০০৭ সালের ১/১১-এর সেই ঝোড়ো দিনগুলোর কথা ভাবলে আজও অনেকের মনে পড়ে যায় সেই ছবিগুলো—যেখানে দেখা গিয়েছিল একজন তরুণ ও প্রভাবশালী নেতাকে স্ট্রেচারে করে আদালতে নেওয়া হচ্ছে। সেই সময়কার অমানবিক নির্যাতনে তাঁর মেরুদণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ ১৮ মাস কারাবরণ শেষে যখন তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান, তখন তাঁর হাতে ছিল না ক্ষমতার দণ্ড, বরং শরীর ছিল হুইলচেয়ারে বন্দি। অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, জিয়া পরিবারের এই উত্তরসূরির রাজনৈতিক জীবন হয়তো সেখানেই শেষ।
দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি বিদেশের মাটিতে নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ডজনখানেক মামলা হয়েছে, আদালতের রায়ে তিনি হয়েছেন দণ্ডপ্রাপ্ত। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা আর ভৌগোলিক দূরত্ব তাঁকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। লন্ডন থেকেই তিনি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৃণমূলের সাথে যুক্ত ছিলেন। একদিকে নিজের শারীরিক চিকিৎসার লড়াই, অন্যদিকে বাংলাদেশে তাঁর দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই—এই দ্বিমুখী যুদ্ধে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ ও ধৈর্যশীল সংগঠক হিসেবে।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর যখন তিনি বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন, তখন সেটি কেবল একজন নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল না, ছিল একটি গণআকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে মাত্র ৫৪ দিনের মাথায় তিনি যেভাবে সারা দেশে নির্বাচনী হাওয়া বইয়ে দিলেন এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিপুল বিজয় ছিনিয়ে আনলেন, তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে এক গবেষণার বিষয়। এই ৫৪ দিনে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, মানুষের হৃদয়ে জায়গা পেতে হলে কেবল শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং আদর্শ আর মাটির সাথে সংযোগ থাকা জরুরি।
তারেক রহমানের এই বিজয়ের আনন্দ পূর্ণতা পায়নি একটি বিশাল শূন্যতার কারণে। নির্বাসন থেকে ফেরার মাত্র ৫ দিনের মাথায় তিনি হারিয়েছেন তাঁর ছায়াসঙ্গী ও আলোকবর্তিকা মা বেগম খালেদা জিয়াকে। এর আগে হারিয়েছেন একমাত্র ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে। পরিবারহীন একাকী এই মানুষটি আজ যখন প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিলেন, তখন তাঁর কাঁধে কেবল বিএনপির দায়িত্ব নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের ভার।
তারেক রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় বারবার বলেছেন, তিনি কোনো প্রতিহিংসার রাজনীতি চান না। তাঁর ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’ (আমার একটি পরিকল্পনা আছে) বার্তায় উঠে এসেছে আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন। হুইলচেয়ারে বন্দি সেই আহত নেতা থেকে আজ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর এই যে রূপান্তর, তা আসলে বাংলাদেশেরই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
তারেক রহমানের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ অনেক। দীর্ঘ দেড় দশকের অপশাসনে বিধ্বস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে মেরামত করা এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করাই হবে তাঁর প্রধান কাজ। হুইলচেয়ারের সেই কষ্টের দিনগুলো নিশ্চয়ই তাঁকে সাধারণ মানুষের যন্ত্রণাকে অনুভব করতে শেখাবে।
তারেক রহমানের এই সিংহাসনে আরোহণ কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়, বরং এটি ত্যাগ আর নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের ফল। যে মেরুদণ্ড ভাঙার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেই শিরদাঁড়া আজ সোজা করে দাঁড়িয়ে তিনি শপথ নিলেন এক নতুন ভোরের। এখন দেখার বিষয়, প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসে তিনি শহীদ জিয়া আর দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার স্বপ্নের ‘সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ কত দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারেন।
শেখ ফরিদ
কবি ও গণমাধ্যমকর্মী