২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, কারণ এদিন প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রত্যাবর্তন করেছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং একই সাথে "জুলাই সনদ" সংক্রান্ত জাতীয় গণভোটের রায় দেশের প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক কাঠামোতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। নবগঠিত এই মন্ত্রিসভা কেবল একটি রাজনৈতিক ক্ষমতার রদবদল নয়, বরং এটি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়ার একটি আনুষ্ঠানিক ও কাঠামোগত রূপ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি তরুণ বিপ্লবীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা মূলত "প্রজন্মগত পরিবর্তন" এবং "সংস্কারমুখী সুশাসন" নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
তারেক রহমানের ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর গঠিত এই মন্ত্রিসভা পূর্ববর্তী অনেক মন্ত্রিসভার তুলনায় গঠনগতভাবে ভিন্ন। এটি মূলত একটি "সংস্কারমূলক সরকার" হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যার প্রাথমিক লক্ষ্য হলো আগামী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে দেশের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সাধন। শপথ গ্রহণ করা এই মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। এই প্রশাসনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এতে অন্তর্ভুক্ত ৪০ জন সদস্যই প্রথমবারের মতো সরকারি কোনো নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে প্রতিরক্ষা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নীতি-নির্ধারণী দপ্তরগুলোর দায়িত্ব নিজের কাছে রেখেছেন। এটি মূলত একটি অস্থিতিশীল রূপান্তরকালীন সময়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষা নিশ্চিত করার একটি প্রয়াস। ৩৩ বছরের দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশে একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে লিঙ্গীয় ভারসাম্য এবং নেতৃত্বের ধরনে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
একটি রাষ্ট্রের সুশাসন অনেকাংশেই নির্ভর করে তার মন্ত্রিসভার আঞ্চলিক ও পেশাগত বৈচিত্র্যের ওপর। ত্রয়োদশ সংসদের এই মন্ত্রিসভায় আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে, যদিও এতে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রাধান্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। মন্ত্রী পরিষদ গঠন অনুসারে সরকারের নীতি-নির্ধারণে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের অত্যন্ত জোরালো প্রভাব থাকবে, অন্যদিকে সিলেট বিভাগের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলক কম। তবে টেকনোক্র্যাট কোটায় অন্তর্ভুক্ত অভিজ্ঞ সদস্যদের মাধ্যমে এই আঞ্চলিক ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক ক্ষেত্রেই তাদের অধীনে এমন সব দপ্তর প্রদান করা হয়েছে যেগুলোতে জুলাই সনদের সংস্কার সরাসরি প্রয়োগযোগ্য। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় সক্রিয় থাকা ছাত্র নেতা এবং জোটভুক্ত বিভিন্ন দলের নেতাদের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বন্টনের একটি গভীর বিশ্লেষণ নির্দেশ করে যে, সরকার শ্রম, পররাষ্ট্র এবং স্বরাষ্ট্রের মতো মন্ত্রণালয়গুলোতে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও জোটের শরিকদের স্থান দিয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে একটি "অংশীদারিত্বমূলক শাসন" ব্যবস্থা গড়ে তোলার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
নূরুল হক নূরকে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান সরকারের একটি অত্যন্ত সুচিন্তিত কৌশল। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি এবং মেধার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। নূর, যিনি নিজে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেছেন, তার ওপর এই দপ্তরের দায়িত্ব অর্পণ করার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা পাঠানো হয়েছে। তার অধীনে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়কেও যুক্ত করা হয়েছে, যা মূলত বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে বিদ্যমান "সিন্ডিকেট" ভাঙার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদের অন্যতম প্রধান সংস্কার প্রস্তাব হলো পুলিশ বাহিনীকে একটি রাজনৈতিক "লাঠিয়াল বাহিনী" থেকে নাগরিক "সেবামূলক সংস্থা"তে রূপান্তর করা।
সাকির মতো একজন প্রগতিশীল নেতাকে এই দপ্তরে স্থান দেওয়ার অর্থ হলো পুলিশের ওপর থেকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হ্রাস করা এবং একটি নিরপেক্ষ জবাবদিহিতামূলক নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা। এটি একই সাথে বিএনপির দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী এবং বামপন্থী দলগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি উদাহরণ। অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে উল্লেখ করেছিলেন যে, তিনি ২০,০০০ কিলোমিটার খাল খনন এবং টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে একজন তরুণ ও কারিগরিভাবে দক্ষ নেতার উপস্থিতি জরুরি ছিল, যা অমিতের নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঢাকা-১৬ আসনের জনপ্রিয় নেতা আমিনুল হককে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী সরকারের মূল নীতি-নির্ধারণী স্তম্ভ হিসেবে কাজ করবেন। এদের মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে, যা দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা মূলত বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার একটি পদক্ষেপ। সালাহউদ্দিন আহমদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার মূল দায়িত্ব পালন করবেন। একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এন এম এহসানুল হক মিলনের অন্তর্ভুক্তি। তিনি অতীতে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নকলমুক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত করে প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন। এবার তাকে পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শিক্ষা খাতের আমূল সংস্কার, বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং উচ্চশিক্ষায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য, ২০২৬ সালের এই মন্ত্রিসভা কেবল রুটিন মাফিক দায়িত্ব পালনের জন্য গঠিত হয়নি। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ভোটাররা দেশের আমূল পরিবর্তন চেয়েছেন তা বাস্তবায়নই মুখ্য উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগের উপস্থিতি দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সংকেত দেয়। দীর্ঘ ১৫ বছর পর ভারতের সাথে বিএনপির সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অভিনন্দন বার্তার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদকে একটি অত্যন্ত জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশের সাথে ভারত, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভারসাম্যের কূটনীতি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শামা ওবায়েদ, যিনি আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির যোগাযোগ রক্ষার কাজ করেছেন দীর্ঘকাল, তাকে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে গণতান্ত্রিক সম্পর্ক জোরদার করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের এই মন্ত্রিসভা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রত্যাশিত এবং একই সাথে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং একটি প্রশাসন। প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তর বণ্টনের ধরণ দেখে বোঝা যায় যে, সরকার অভিজ্ঞতার চেয়ে কর্মস্পৃহা এবং সংস্কারমুখী মানসিকতাকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। আমিনুল হক, নূরুল হক নূর, জোনায়েদ সাকি বা ইশরাক হোসেনের মতো তরুণদের অন্তর্ভুক্ত করা কেবল রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং ২০২৪ সালের বিপ্লবের প্রতি একটি প্রশাসনিক সম্মাননা। তবে এই সরকারের সামনে বিশাল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। বিশেষ করে জুলাই সনদের প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়নের সময় পুরোনো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দলীয় স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। দ্রব্যমূল্য কমানো ও বিদ্যুৎ ও খাদ্য সংকটের মতো তাত্ক্ষণিক সমস্যাগুলো মোকাবিলায় অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বা সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুদের মতো প্রতিমন্ত্রীদের দ্রুত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—স্মার্ট, মেধাবী ও অনন্য নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুণী ও সিনিয়র ব্যক্তির কয়েকজনকে রাষ্ট্র গঠনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসম্পন্ন পদে সংযুক্ত করে সহযোগিতা নিচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকার ‘রুলস অব বিজনেস, ১৯৬৬’-এর ৩ (বি) ধারার ক্ষমতাবলে নতুন করে পাঁচজনকে মন্ত্রী পদমর্যাদা এবং পাঁচজনকে প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্বাক্ষরিত এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে। মন্ত্রী মর্যাদায় নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন—মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, মোঃ ইসমাইল জবিউল্লাহ, ডঃ রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। এদের মধ্যে প্রথম তিনজন দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। ফলে মন্ত্রিসভায় সরাসরি স্থান না পেলেও এখন তারা মন্ত্রী সমমর্যাদার উপদেষ্টা হিসেবে নির্বাহী কাঠামোর অংশ হচ্ছেন।
প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় নিয়োগপ্রাপ্তরা হলেন—হুমায়ুন কবির, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল ইসলাম, ডাঃ জাহেদুর রহমান, ডঃ মাহাদি আমিন, রেহান আসিফ আসাদ। এই নিয়োগে বেসামরিক ও সামরিক পটভূমির ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি লক্ষ্য করা যায়, যা প্রশাসনিক পরামর্শ কাঠামোয় বৈচিত্র্য আনার ইঙ্গিত দেয়। বাস্তবিক নতুন মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রথমবারের এমপি ও তুলনামূলক তরুণ নেতাদের অন্তর্ভুক্তি একটি স্পষ্ট কৌশল নির্দেশ করে—দলের নেতৃত্ব কাঠামোতে নবায়ন। এতে দলীয় ভাবমূর্তি “সংস্কারমুখী’’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। জোট ও শরিক দলগুলোর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে গিয়ে জায়গা সংকুচিত হয়েছে। ফলে স্থায়ী কমিটির কিছু সদস্য নির্বাহী দায়িত্বের বাইরে রয়েছেন।
আমার মনে হয় কিছু জ্যেষ্ঠ নেতাকে মন্ত্রিসভার বাইরে রেখে দলীয় সংগঠন শক্তিশালী করার দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। নির্বাচনী বিজয়ের পর দল পুনর্গঠন ও মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জ্যেষ্ঠ নেতারা দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বহন করেন। তাদের বাইরে রাখা মানে প্রশাসনে নতুনত্ব, তবে একই সঙ্গে প্রজ্ঞার সরাসরি প্রয়োগ সীমিত হওয়া। যে নেতারা এবার মন্ত্রিসভায় আসেননি, তারা অনেকেই অতীতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ফলে তাদের সমর্থকগোষ্ঠীর প্রত্যাশা ছিল উচ্চ। এখন প্রশ্ন—দলীয় শৃঙ্খলা ও ঐক্য বজায় রেখে কীভাবে এই ভারসাম্য রক্ষা করা হবে? দল যদি মন্ত্রিসভার বাইরে থেকেও নীতি-নির্ধারণে তাদের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যুক্ত রাখতে পারে—যেমন উপদেষ্টা পরিষদ, সংসদীয় কমিটি বা বিশেষ টাস্কফোর্সের মাধ্যমে—তাহলে অভিজ্ঞতা ও নবায়নের সমন্বয় সম্ভব। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে একটি স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে—এটি পরিবর্তনের সরকার। তবে পরিবর্তন মানেই শুধু নতুন মুখ নয়; পরিবর্তন মানে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের কার্যকর সমন্বয়। যেসব জ্যেষ্ঠ নেতা এবার নির্বাহী দায়িত্বে আসেননি, তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক প্রভাব এখনো দলের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে—দল কীভাবে এই সম্পদকে কাজে লাগাতে পারে এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রেখে সংস্কারের পথ এগিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
পরিশেষে, ২০২৬ সালের এই মন্ত্রিসভা একটি "সেতুবন্ধন" হিসেবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে—যা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের অতীত ইতিহাস এবং তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আকাঙ্খার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের এই দপ্তর বণ্টন সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে তাদের ব্যক্তিগত সততা এবং জনগণেল প্রতি তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ওপর। বাংলাদেশের জনগণ এখন একটি নতুন, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ফ্যাসিজম-মুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্নে বিভোর, যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এই ৬০ জন সদস্যের ওপর অর্পিত হয়েছে।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার ও পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়