Image description

কামাল হোসেন 

অন্যান্যবারের মতো আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবে—এমন খবর পেয়ে ব্যাপক কাভারেজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আমাদের বার্তা সম্পাদক মানিক মিয়াজী ভাই সব রিপোর্টারকে দুপুর দুইটায় বার্তাকক্ষে উপস্থিত থাকতে বলেন। নির্দেশনা অনুযায়ী অফিসের কাছের মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করে দ্রুত কর্মস্থলে ফিরে আসি। তবে শুরুতেই বিপত্তি দেখা দেয়—বিএনপির অনুষ্ঠানে আদৌ প্রবেশ করতে দেওয়া হবে কি না, সেই সংশয়।

খালেদা জিয়া–পরবর্তী বিএনপিতে সাংবাদিক এড়িয়ে চলার একটি সংস্কৃতি যেন গড়ে উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনসহ দলটির বিভিন্ন কর্মসূচিতে অনেক সময় খোদ বিএনপি বিটের সাংবাদিকদেরও প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাই আজও বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার ভেন্যু হোটেল সোনারগাঁওয়ে প্রবেশ নিয়ে সন্দেহ নিয়েই অফিস থেকে রওনা হই। কিন্তু হলরুমে ঢুকে বিস্মিত হই।

অন্যদিনের মতো কোনো বাধা দেওয়া তো হয়নি, বরং আমার সামনে থাকা একজনের সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি বলেন, ‘এটা তো আপনাদেরই অনুষ্ঠান, আপনারাই প্রবেশ করবেন। তবে কার্ড দেখান।’ যদিও আমাকে কোনো প্রশ্ন না করেই ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়। প্রবেশ করেই দেখি, পুরো হলরুমে কয়েক শ চোখধাঁধানো চেয়ার সারিবদ্ধভাবে সাজানো। অনুষ্ঠানস্থলটি ছিল বেশ জমকালো, আর টেলিভিশন ক্যামেরার জন্য হলরুমের মাঝ বরাবর বিশেষ জায়গা রাখা হয়েছে।

সমস্যা তৈরি হয় বসার জায়গা নিয়ে। অধিকাংশ সাংবাদিক ক্যামেরার সামনের চেয়ারগুলোতে বসে পড়েন। পরে বিএনপি মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন, সামনের আসনগুলো অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত—সাংবাদিকদের পেছনে বসতে বলেন। এই সুযোগে আমি শায়রুল কবির ভাইয়ের কাছে নির্বাচনী ইশতেহারের সফট কপি চাইলে তিনি পরে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।

এরপর ক্যামেরার পেছনের দ্বিতীয় সারিতে বসে দেখি, ঠিক আমার পেছনের সারিতে বসেছেন বর্ষীয়ান সাংবাদিক শফিক রেহমান। তাঁকে ঘিরে টেলিভিশন ক্যামেরাগুলো ছবি ও সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয়—গুণী মানুষ যেখানে বসেন, সেখানেই কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়। আমি পেছনে ফিরে সালাম দিলে তিনি সালাম গ্রহণ করেন এবং এক মুহূর্তের চোখাচোখিতে এমন আন্তরিকতা প্রকাশ পায়, যেন বহুদিনের পরিচিত। পরে বিএনপির মিডিয়া উইংয়ের আরেক সদস্য শামসুদ্দিন দিদার তাঁকে সামনের সারিতে নিয়ে যান।

অনুষ্ঠান শুরু হলে আমি হোয়াটসঅ্যাপে আবারও ইশতেহারের পিডিএফ কপি পাঠানোর কথা মনে করিয়ে দিই। শুরুতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বরাবরের মতো কাব্যিক ভাষায় বক্তব্য দেন। এরপর তিনি বক্তব্য দেওয়ার জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আমন্ত্রণ জানান। বক্তব্যের শুরুতে মির্জা ফখরুল ভাঙা গলায় আন্দোলন-সংগ্রামে দলের অবদানের কথা তুলে ধরে নতুন নেতৃত্বে বাংলাদেশে ‘নতুন সূর্য’ উদয়ের আশ্বাস দেন।

এরপর বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে ইশতেহার পাঠ শুরু করেন। তিনি ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ঘোষণা করেন। বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতি দমনে নীতি হবে—‘অন্যায়কারীর পরিচয় শুধুই অন্যায়কারী’। একই সঙ্গে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়তে যথাসময়ে পে-স্কেল বাস্তবায়নের কথা বলেন। রাষ্ট্র সংস্কারের অংশ হিসেবে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না—এমন ঘোষণাও দেন তিনি।

ইশতেহারে তারেক রহমান জানান, ফ্যামিলি কার্ড একজন নারীকে শ্বশুরবাড়ি ও বাবার বাড়িতে সম্মান এনে দেবে। কৃষক কার্ডের আওতায় উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের পাশাপাশি আধুনিক কৃষি বীমা চালু এবং প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড দেওয়ার উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। এসব ঘোষণা নিঃসন্দেহে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের মানুষের মন জয় করার মতো।

তবে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ই-হেলথ কার্ড চালুর ঘোষণা বড় চমক হতে পারতো। কিন্তু কেন যেন এই ঘোষণা তেমন সাড়া ফেলেনি, ফ্যামিলি কার্ডের মতো হাততালিও পায়নি। এক লাখ নতুন কর্মী মানে শুধু নিয়োগ নয়—প্রশিক্ষণ, বেতন, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা; এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ ইশতেহারে অনুপস্থিত।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি চালু এবং সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস দেওয়ার পরিকল্পনাও চমক হওয়ার কথা। ‘নতুন কুঁড়ি’-তে কোরআন তেলাওয়াত প্রবর্তন, হাফেজে কোরআন, কারি ও আলেমদের আন্তর্জাতিক কৃতিত্বের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি প্রদানের ঘোষণা সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে পারতো।

তরুণ সমাজের জন্য বিদেশি ভাষা শিক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে সংযুক্তিকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি প্রশংসনীয়। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং প্রশিক্ষণ, স্কুল–কলেজ–ক্যাফে ও লাইব্রেরিতে ফ্রি ওয়াইফাই, পেপাল চালু, ই-কমার্স হাব ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগ ডিজিটাল অর্থনীতির পথে ইতিবাচক বার্তা দেয়।

এ ছাড়া ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থার ঘোষণাও ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে।

ইশতেহার ঘোষণার মধ্যেই আমি বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও তারেক রহমানের বক্তব্যের কয়েকটি খবর অফিসে পাঠিয়ে দিই। সবশেষে আমার কাছে মনে হয়েছে, বাস্তবায়নের রোডম্যাপ কিছুটা হালকা হলেও এবারের ইশতেহারে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ১৯ দফা, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ এবং তারেক রহমান ঘোষিত ২৭ ও ৩১ দফার ধারাবাহিকতা ও সমন্বয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

তবে তারেক রহমান স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের দিন যে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলেছিলেন—‘I have a plan’—সেই পরিকল্পনার মূল ভাবনাগুলো আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে ইশতেহারটি আরও পূর্ণতা পেত। তবুও এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তি হিসেবে শতভাগ বাস্তবায়িত হোক—এই প্রত্যাশাই রইল।