Image description

ফয়সাল মাহমুদ

শহীদরা মরে না, তাদের প্রস্থানে কিছু সময়ের জন্য শুধু শোক অনুভূত হয়। তবে মানুষের কর্মব্যস্ততায় সেই শোকও একসময় ম্লান হয়ে যায়। পরে শহীদরা হয়ে ওঠেন প্রতিবাদের প্রতীক, আন্দোলনের অনুপ্রেরণা। ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশের মানুষ এমনই এক অভিজ্ঞতার সন্ধ্যান পেয়েছে। গত ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত হাদির জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি পুরো জাতির আবেগকে নাড়া দিয়েছিল ক্ষণিকের জন্য। তবে বাংলাদেশের জন্য হাদির ঘটনা প্রথম নয়, এর আগেও এ দেশের মানুষ এমন অনেক ঘটনার সাক্ষী।

 

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ, তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে জোরালো ছাত্র আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন অনিবার্য হয়েছিল। আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের অস্ত্রের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকা, পুলিশের রাবার বুলেটের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার দৃশ্য বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত শ্রেষ্ট কর্মগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। তার সেই দৃশ্যটি দেয়ালচিত্রে, ম্যুরালে পুনরুত্থান, শিল্পকলার শিল্পায়নে এবং বইপুস্তকে জায়গা করে নিয়েছে।

 

আবু সাঈদের ছবি অমর, স্মৃতিগুলোও অমর। তার মৃত্যুকে ঘিরে যে শোক তা এখন কেবল তার পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের ছোট বৃত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর বাকিদের জীবনে তার মৃত্যুর বিষয়টি এখন প্রতিদিনকার কর্মব্যস্ততা, দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি, নিরাপত্তার ঝুঁকি ও নির্বাচনি আলাপের সঙ্গে হারিয়ে গেছে প্রায়। এটি মানুষের জীবনে চলমান একটি প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়ে।

 

এখানে আরেকটি কঠোর সত্য হলো- আবু সাঈদদের মৃত্যু শেষ পর্যন্ত একটি পরিণতি এনে দেয় জাতিকে। যেমনটি বাংলাদেশ দেখেছে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার পর ছাত্র আন্দোলন জনতার আন্দোলনে পরিণত হয়, আর শেষ পর্যন্ত হাসিনার দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা স্বৈরশাসনের পতন হয়। জাতি একটি নতুন যুগের সূচনা করে, নতুন স্বপ্ন দেখার সুযোগ পায়। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের একটি উপযোগী উদ্দেশ্য সাধন করেছে, ইতিহাসও নড়েচড়ে ওঠে। তার এই আত্মত্যাগ যতই কষ্টের হোক না কেন, তা পরিপূর্ণতা পেয়েছে।

 
 

 

হাদির মৃত্যু হয়নি, তিনি শহীদ। শাহাদতের এক মাস পার হলেও তার হত্যাকাণ্ডের বিচার এখানো অমীমাংসিত। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে যে আবেগ এবং গণমানুষের স্ফুলিঙ্গ দেখা গেছে তা প্রমাণ করে যে হাদির মৃত্যুর শোক এখানো মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে। মরণোত্তর মানুষের দেওয়া সম্মাননা আর বাঁধভাঙা কান্না প্রমাণ করে যে, একজন বীরের বিদায় নয়, বরং তা ‘হাদি ইফেক্ট’ বা হাদি প্রভাব হিসেবে সমাজে নতুন কোনো বিপ্লবের ইঙ্গিত দেয়।

 

যেমন ছিলেন হাদি

 

হাদি মূলত দেশের মানুষের নজরে আসেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে। বড় বড় রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিত্ব ও সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষের সঙ্গে সরাসরি বিতর্কে জড়ানো তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সাদামাটা মনের মানুষ ছিলেন, উশকোখুশকো চুল-দাড়ি আর ছোটখাটো গড়নের। তার আসল শক্তি ছিল মুখের ভাষায়। কথা বলতেন একদম খাস বাংলায়, যেখানে দক্ষিণবঙ্গের গ্রামীণ টানও মিশেল ছিল। ঢাকার অভিযাত শ্রেণির মার্জিত ভাষার বিপরীতে তার এই ব্যবহার মাটির কাছাকাছি সুর কোটি মানুষের কাছে ছিল অত্যন্ত পরিচিত এবং আপন।

 

মাদ্রাসার শিক্ষা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা এবং নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা হাদি ছিলেন এক অনন্য চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন তথাকথিত ‘সাবঅল্টার্ন’ বা প্রান্তিক প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ, যার হাতে ছিল পৃতিষ্ঠিত উচ্চবর্গের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান ও সাহস। তিনি পুরোপরি দেশীয় ব্যবস্থাপনার ভেতরে ছিলেন না, আবার বাইরেরও কেউ না। এ ছাড়া তার আপসহীন ইসলামি পরিচয় ৯০ ভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর মাঝে তাকে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এমন এক দেশে যেখানে ধর্মই পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি, সেখানে হাদির ধর্মীয় অবস্থান তাকে গণমানুষের হৃদয়ে জায়গা করে দিয়েছে।

 

২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর হাদি মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। যখন আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দোসররা পুনরায় জনপরিসরে ফেরার জন্য পা টিপে টিপে এগোচ্ছিল, তখন হাদি সেখানে ছিলেন পাহাড়ের মতো একটি বাধা। হাদির প্রতিবাদের ভাষা ছিল প্রতিপক্ষের জন্য আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট। তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, রাজনীতিতে ফেরার আগে দলটি যেন এই দেশের জনগণের সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সংযোগে অনুপ্রবেশ করতে না পারে।

 

হাদির মৃত্যু এ দেশের তরুণদের জন্য এক আদর্শিক লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে ওঠেছে। তার লড়াই প্রচলিত কোনো রাজনৈতিক লড়াই ছিল না। তার লড়াই ছিল সরাসরি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। হাসিনার শাসনকালে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রায় আধিপত্য বিস্তার করেছিল। গণমাধ্যম, শিক্ষা এবং শিল্পকলায়- প্রায় সব ক্ষেত্রে তাদের পছন্দের পরিপূর্ণতা নিয়ে এসেছিল। নীতিগতভাবে এটি আশ্চর্য কোনো বিষয় ছিল না। ১৯৭১ সালের মুক্তযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মধ্য-বাম ঘরানার দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভাষা, পরিচয়, সংস্কৃতি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের ওপর তাদের কর্তৃত্বকে বৈধতা দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল।

 

শেখ হাসিনার চার মেয়াদের শাসন সেই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রেখেছিল। একটা সময় দেখা গেছে, তার মতবাদকে একটি প্রতিষ্ঠিত রূপ দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনা তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অনন্য নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয়তাবাদকে সংকুচিত করে, ইতিহাস বিকৃত করে এবং মুক্তিযুদ্ধকে ক্রমশ পুনর্বিন্যাস করার চেষ্টা করেছেন।

 

এই পরিবর্তনের পরিণতি ছিল গভীর। কারণ মূলধারার গণমাধ্যমগুলো এবং প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীরা হাসিনার চাপানো সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তা জনমানুষের ওপর প্রযোগ করার চেষ্টা চালিয়েছিল। এই প্রক্রিয়ায় দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী- মূলত ধর্মপ্রাণ এবং মধ্যপন্থি মুসলিমদের মাঝে প্রান্তিক হয়ে পড়েছিল। রাষ্ট্রনির্ধারিত ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ জাতীয়তাবাদের মাঝে তারা নিজেদের খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা প্রদর্শন কেবল সম্মানের জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে থাকেনি; এটি বাধ্যতামূলক আচারে পরিণত হয়েছিল। এর বাইরে ভিন্নমত পোষণ করা মানেই ছিল সামাজিক বা পেশাগতভাবে চরম মূল্য চুকানো।
কিন্তু সেই মূল্য চুকোনোর জমাটবদ্ধ ক্ষোভ হারিয়ে যায়নি। তা কেবল সময়ের অপেক্ষায় ছিল।

 

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও হাদি

 

২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট হাসিনা পালিয়ে যায় ভারতে। আর তার চাপানো আধিপত্যের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শেখ মুজিবের ম্যুরালগুলো ভাঙার মধ্য দিয়ে। তা কেভল কেবল ‘ভাঙচুর’ হিসেবে দেখা হবে ভুল; বরং এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া একপাক্ষিক আদর্শ থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি বলিষ্ঠ চেষ্টা মাত্র। এর মূলে ছিল একটি দাবি- এমন এক সামাজিক-রাজনৈতিক পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা কৃত্রিম ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীকের বদলে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও গণমানুষের সহজ স্বভাবের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে।

 

এই আমূল পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শরিফ ওসমান হাদি। হাদির উত্থান ছিল কোনো সুনির্ধারিত ছক ছাড়াই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে মূলধারার প্ল্যাটফর্মগুলোতে তিনি পদ্ধতিগতভাবে সেই বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন, যারা নৈতিকতার আবরণে শেখ হাসিনার স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রেখেছিল। হাদির সমালোচনা ছিল আপসহীন; তিনি কোনো তত্ত্বের আড়ালে না গিয়ে সরাসরি অপরাধীদের নাম ধরে চিহ্নিত করতেন। এটিই জনমানুষের ভেতরের চাপা ক্ষোভকে উসকে দিয়েছিল।

 

অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে হাদি হয়ে উঠেছিলেন তাদেরই না বলা কথার প্রতিধ্বনি। লোকে যা ফিসফিস করে বলত বা চেপে রাখত, হাদি তা-ই প্রকাশ্য মঞ্চে উচ্চস্বরে বলতেন। তার এই ‘বেপরোয়া সততা’ দ্বিমুখী রাজনীতিতে ক্লান্ত মানুষের কাছে চুম্বকের মতো কাজ করেছিল।

 

হাদি কেবল সমালোচনাতেই থেমে থাকেননি। তিনি সরকারি অর্থায়নে গড়ে তোলেন ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’। এটি ছিল তার বিকল্প সাংস্কৃতিক কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা। এই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট; এমন একটি বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক ধারা তৈরি করা যা ইসলামী মূল্যবোধ এবং এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর সামাজিক বোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যারা এতদিন অভিজাত ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকে নিজেদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বা একপাক্ষিক মনে করতেন, তাদের কাছে এই কেন্দ্রটি ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’।

 

তবে অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ কেবল সংস্কৃতির পরীক্ষাগার ছিল না। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে মানুষ স্থিতিশীলতার জন্য নির্বাচনের দাবি তুলতে শুরু করে। হাদি দ্রুতই বুঝতে পারেন, রাজপথের সংগ্রামকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে তাকে রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তর করতে হবে। আর সেই ক্ষমতার চাবিকাঠি হলো জাতীয় সংসদ। ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হাদিকে রাতারাতি নতুন এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই হাদি লড়াইয়ে নামেন এমন এক হেভিওয়েট প্রার্থীর বিরুদ্ধে, যার পেছনে ছিল অঢেল অর্থ এবং জয়ের প্রবল সম্ভাবনা। এটি ছিল ‘দাউদ বনাম জালুত’ এর মতো এক অসম লড়াই।

 

হাদির ভিন্নধর্মী প্রচার কৌশল

 

প্রথাগত কোনো প্রচার কৌশল ছিল না হাদির; কৌশল না থাকাটাই ছিল তার কৌশল। তার প্রচার কৌশলে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ বিলবোর্ড বা মোটরবাইক মহড়া নয়, তার প্রচার চলত লিফলেট আর হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে। তিনি ভোটারদের সঙ্গে ফজরের নামাজ পড়তেন, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের পাড়ায় পাড়ায় হাঁটতেন এবং সেই পরিচিত আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্যগুলোকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, যা হাদিকে করে তোলে আরও বিশ্বাসযোগ্য ও জনপ্রিয়।

 

হাদির জনপ্রিয়তার মূলে ছিল একটি দৃঢ় বিশ্বাস- তিনি দুর্নীতির ঊর্ধ্বে। দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে যখন রাষ্ট্রযন্ত্র, আমলাতন্ত্র একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল, তখন হাদি আবির্ভূত হয়েছিলেন তার ঠিক বিপরীত মেরু হিসেবে। তিনি কোনো বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেননি; বরং তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সাহসের। যেখানে যোগান ছিল ক্ষমতার সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করার সাহস। ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের পর ছাত্রনেতাদের ওপর মানুষের যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, রাজনীতির পুরনো মারপ্যাঁচে তা কিছুটা ম্লান হতে শুরু করে। ঠিক ওই মুহূর্তেই সাধারণ মানুষের সেই হারানো বিশ্বাস আর সততার দায়ভার যেন অবলীলায় হাদির কাঁধে গিয়ে পড়ে।

 

মজার ব্যাপার হলো, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল কারিগর বা সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়াদের কেউ ছিলেন না হাদি। কিন্তু আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন এর সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি। টকশোর বিতার্কিক হাদি মানুষের চিন্তার মস্তিষ্ক দখল করেছিলেন ঠিকই, একইসঙ্গে নির্বাচনি প্রচারণার মাঠের হাদি পৌঁছে গিয়েছিলেন মানুষের হৃদয়ের গভীরে। ঠিক এ কারণেই তার মৃত্যু সংবাদে সারা দেশ এক গভীর শূন্যতা অনুভব করেছে। সাধারণ মানুষ মনে করছে, তাদের নিজস্ব বা জরুরি কিছু একটা কেড়ে নেওয়া হয়েছে।

 

মৃত্যুর পর হাদি ব্যক্তি হাদির চেয়ে অনেক বড় হয়ে উঠেছেন। তবে তিনি রাজনৈতিকভাবে কতটা শক্তিশালী হবেন, তা এখনো সময়ের হাতে। ইতিহাস সবসময় নিশ্চয়তা দেয় না। ইতোমধ্যে তার শাহাদাতকে পুঁজি করে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা শুরু হয়ে গেছে। আত্মত্যাগকে রাজনৈতিক মুদ্রায় রূপান্তর করা এ দেশে নতুন কিছু নয়।

 

তবে শোক কমে গেলেই হাদি প্রাসঙ্গিকতা হারাবেন- এমনটা ভাবলে ভুল হবে। জনগণের আবেগ জনআবেগ হয়তো অনিবার্যভাবে কমে যায়, কিন্তু যে সংগ্রামের সূচনা হাদি করেছিলেন, তা এখনো শেষ হয়নি। নিজের সাংস্কৃতিক অধিকার পুনরুদ্ধার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং অভিজাত শ্রেণির আধিপত্যকে প্রত্যাখ্যান করার যে ধারণা তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন, তার চূড়ান্ত মীমাংসা এখনো হয়নি।

 

হাদির প্রকল্প আজও অসম্পূর্ণ। আর এই অসম্পূর্ণতাই তাকে জাতীয় মানসপটে অমর করে রাখবে। যারা মনে করছেন হাদি অধ্যায় শেষ হয়ে গেছে, তারা সম্ভবত এই সময় এবং এই মানুষটি- উভয়কেই বুঝতে ভুল করছেন।

 

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক ও দিল্লি বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

 

আলজাজিরার মতামত বিভাগ থেকে অনূদিত