Image description
আলী আহমদ মাবরুর
 
বারবারই বলছিলাম, নির্বাচনের আগ দিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সাক্ষাতকার না দিলেই ভালো হয়। এরপরও জামায়াতের আমীর দিয়েছেন। এবার মির্জা ফখরুল সাহেবও দিলেন। এতে লাভ ক্ষতি কী হবে জানি না। তবে আল জাজিরায় মির্জা ফখরুলের সাক্ষাতকার নিয়ে চাইলে যে কেউ নানা ইস্যুতেই বিতর্ক তুলতে পারে।
আল জাজিরা থেকে এবার যিনি সাক্ষাতকার নিচ্ছেন তিনি হলেন ভারতীয় সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জেইন। তিনি অনেকদিন ধরে ভিজুয়াল মিডিয়ায় কাজ করছেন। তবে জামায়াতের আমীর ও মির্জা ফখরুল- এ দুটো সাক্ষাতকার দেখেই আমার মনে হলো, শ্রীনিবাসন জেইন যতটা আল জাজিরার হয়ে প্রশ্ন করেন, সে তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্ন তিনি উত্থাপন করেন একজন ভারতীয় হিসেবে, একজন হিন্দু হিসেবে। ভারতের পার্সপেক্টিভ থেকেই তিনি বেশিরভাগ প্রশ্ন তোলেন। এক্ষেত্রে তিনি আসলে আল জাজিরার নামটি ব্যবহার করছেন মাত্র।
মির্জা ফখরুলকে তিনি নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। বিএনপির বিরুদ্ধে থাকা নানা অভিযোগ সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করেছেন। মির্জা ফখরুলের উত্তর জামায়াত আমীরের তুলনায়ও আমার কাছে দুর্বল মনে হয়েছে। অলমোস্ট প্রতিটি অভিযোগের উত্তরেই তিনি একটি শব্দই বলেছেন, আর তাহলো, এই অভিযোগ বায়াসড, যারা এই অভিযোগ তুলছে তারাও বায়াসড।
যেমন: শ্রীনিবাসন জেইন প্রশ্ন করেছিলেন, “৮০টির ওপর দুর্নীতির কেইস ছিল তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে। ইউনুস সরকার আসার ৬ মাসের মধ্যে সব কেইস শেষ হয়ে গেছে। তিনি সঠিক প্রক্রিয়ায় খালাস পাননি। অথচ এসব অভিযোগের মধ্যে কয়েকটির ব্যাপারে স্বয়ং এফবিআই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পেয়েছে। ফখরুল সাহেব উত্তরে বললেন, “এফবিআই বায়াসড।”
শ্রীনিবাসন জেইন প্রশ্ন করলেন, তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অপকর্মকারীদের প্রতিস্থাপন করেছে বিএনপি। তারা চাঁদাবাজি করছে, ভূমি দখল করছে। ফখরুল সাহেব উত্তরে বললেন, “আওয়ামী লীগ যাদের জমি দখল করেছিল সেই ভিকটিমরা নিজেদের জায়গা বুঝে নিয়েছে। এটা দখল নয়।” জানিনা তিনি এমনটা কেন বললেন। কিন্তু তার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে তিনি বিএনপির দখলদারিত্বের বিষয়টি মেনে নিলেন আর অন্যদিকে দখলদারদের প্রশ্রয়ও দিলেন বলেই আমার মনে হয়েছে।
শ্রীনিবাসন জেইন প্রশ্ন করলেন, “গার্মেন্টস এবং অন্য নানা ব্যবসা থেকে, বাস টার্মিনাল থেকে বিএনপি চাঁদাবাজি করে। ডেইলি স্টারের মতে, প্রতিদিন ২২ লাখ টাকার চাঁদাবাজি করে বিএনপি। ফখরুল সাহেবের সেই একই উত্তর: “ডেইলী স্টার বায়াসড।”
প্রশ্ন করা হলো যে, ছাত্ররা জুলাইতে অভ্যুত্থান করলো, পুরনো দুই পরিবার কেন্দ্রিক রাজনীতি ও পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে। বিএনপি এবার পরিবর্তনের কথা বলছেন। তারেক জিয়া নিজেই তো জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে চেয়ারপারসন হয়েছেন। তাহলে তিনি কীভাবে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়াবেন?
ফখরুল সাহেব বললেন, “তিনি দায়িত্ব কেড়ে নেননি। দল তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি যোগ্য বলেই পেয়েছেন। হি ইজ দ্য মোস্ট ক্যাপাবল ম্যান ইন বিএনপি। তার এই উত্তরে উপস্থাপক সন্তুষ্ট না হয়ে ফিরতি প্রশ্ন করায় মির্জা ফখরুল এবার বললেন উপস্থাপক হিসেবে আপনি নিজেও বায়াসড।
বর্তমান ইউনুস সরকারের সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়েও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার রেফারেন্স যখন দেয়া হলো, তখনও ফখরুল সাহেব একই উত্তর দিলেন। “বায়াসড, বেইসলেস।” উপস্থাপক শ্রীনিবাসন জেইন তখন কিছুটা হুমকির সুরেই বললেন, মি: ফখরুল। আপনি আন্তর্জাতিক সব সংস্থা জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, এফবিআই, এ্যামনেস্টিসহ সবার ফাইন্ডিংসকে অস্বীকার ও অগ্রাহ্য করছেন- এটা আপনাকে আমি জাস্ট স্মরণ করিয়ে দিলাম।
আরেকটি বিষয়ও সাক্ষাতকারে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগলো। মনে হলো, জিয়াউর রহমান সংবিধান থেকে সেকুলারিজম শব্দ বাদ দিয়েছিলেন এটা নিয়ে ফখরুল সাহেব বেশ আনহ্যাপি। তিনি প্রথমে বললেন, “প্রেসিডেন্ট জিয়া এমনটা করেছেন কেননা এটা হয়তো সে সময়ের বাস্তবতা।। আমরা এবার ক্ষমতায় আসলে সবার ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণ করবো, প্র্যাকটিসে সেকুলারিজম নিশ্চিত করবো। তবে পলিটিকালি হয়তো সেকুলারিজম শব্দটি ব্যবহার করতে পারবো না। কারণ বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ আর এখানকার রাজনীতিতে এই শব্দ ব্যবহার করাটা সুবিধাজনক নয়।
আরেকটি প্রশ্নের উত্তরে ফখরুল সাহেব বললেন, আওয়ামী লীগ হোক বা জামায়াত হোক আমি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নই। পুরোটা সাক্ষাতকার শুনে ও দেখে আমার আবারও মনে হলো, এই মুহুর্তে এসব সাক্ষাতকার দেয়ার আসলে কোনো প্রয়োজন ছিল না। অহেতুক বাজ ক্রিয়েট করা ছাড়া এসব সাক্ষাতকারের আর কোনো বেনিফিট নেই।