Image description
 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনি প্রচারণা দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত, প্রায় স্থবির ছকের ভেতর আবদ্ধ ছিল। উঁচু ডায়াস, সাজানো মঞ্চ, মুখস্থ ভাষণ এবং নিচে দাঁড়িয়ে থাকা জনতা-যারা শোনে, কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই কথা বলতে পারে। রাজনীতি ছিল একমুখী; নেতা বলতেন, জনগণ শুনত। এই দীর্ঘদিনের অভ্যাস ভেঙে দিয়ে তারেক রহমান যে নতুন নির্বাচনি ক্যাম্পেইন স্টাইল সামনে আনছেন, তা কেবল একটি কৌশলগত পরিবর্তন নয়-এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের মানসিক, সাংস্কৃতিক ও আচরণগত রূপান্তর।

 

তারেক রহমান এখন আর প্রচলিত অর্থে ডায়াস বা পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন না। তিনি মঞ্চে চলমান, গতিশীল; জনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, জনতার মাঝ থেকেই মানুষকে ডেকে নিচ্ছেন মঞ্চে। কোনো স্ক্রিপ্ট হাতে নেই, কোনো পূর্বনির্ধারিত সংলাপ নেই। তিনি জানতে চাইছেন- তাদের এলাকার সমস্যা কী, তারা কী চায়, রাষ্ট্রের কাছে তাদের প্রত্যাশা কী। এই কথোপকথন কোনো সাজানো নাটক নয়; এটি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা, ভোগান্তি ও স্বপ্নের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।

একজন কৃষক, একজন তরুণ, একজন নারী কিংবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কণ্ঠ যখন মঞ্চে উঠে আসে, তখন রাজনীতি আর দূরের কোনো ক্ষমতার ভাষা থাকে না। রাজনীতি হয়ে ওঠে জীবনের গল্প। এখানে নেতা আর আলাদা কোনো উচ্চতায় দাঁড়িয়ে নন; তিনি মানুষের সমতলে এসে দাঁড়ান, শোনেন এবং প্রতিক্রিয়া জানান।

 

এই পদ্ধতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একেবারেই নতুন ধারা। এতদিন রাজনীতি ছিল -আমরা বলব, তোমরা শুনবে। তারেক রহমান সেই ধারাকে ভেঙে দিচ্ছেন। তিনি দেখাচ্ছেন, আধুনিক রাজনীতি মানে শুধু প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়; বরং শোনা, বোঝা এবং সংলাপে অংশ নেওয়া। ভোটার এখানে নিষ্ক্রিয় শ্রোতা নয়; ভোটার হয়ে উঠছে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী।

 

এই ক্যাম্পেইন স্টাইল বিশেষভাবে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। আজকের তরুণ প্রজন্ম মুখস্থ স্লোগান কিংবা আবেগী কিন্তু ফাঁপা ভাষণে বিশ্বাসী নয়। তারা বাস্তব প্রশ্ন করতে চায়, বাস্তব উত্তর শুনতে চায়। তারা এমন নেতৃত্ব দেখতে চায়, যিনি কেবল ক্ষমতার উচ্চতায় দাঁড়িয়ে নন, বরং মানুষের ভিড়ে নেমে আসতে পারেন। তারেক রহমানের এই মুভমেন্ট-বেসড ক্যাম্পেইন সেই মানসিকতার সাথেই গভীরভাবে সংযুক্ত।

এই স্টাইলের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- এটি নেতৃত্বের আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ। আনস্ক্রিপ্টেড কথোপকথনে যাওয়ার জন্য সাহস লাগে, প্রস্তুতি লাগে এবং সর্বোপরি জনগণের উপর আস্থা লাগে। সব নেতা এই ঝুঁকি নিতে পারেন না। তারেক রহমান সেই ঝুঁকি নিচ্ছেন। তিনি যেন স্পষ্টভাবে বলছেন- আমি প্রশ্নকে ভয় পাই না, আমি মানুষের কণ্ঠ এড়িয়ে যেতে চাই না। এই মনোভাবই রাজনীতিতে আস্থা পুনর্গঠনের প্রথম ধাপ।

বিশ্ব রাজনীতির দিকে তাকালে দেখা যায়, এই ধরনের ডায়ালগভিত্তিক নেতৃত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের একটি স্বীকৃত ধারা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তার নির্বাচনি প্রচারণায় নিয়মিত “টাউন হল মিটিং”-এর মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের সরাসরি প্রশ্নের মুখোমুখি হতেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রাষ্ট্রীয় সংকটের সময় ‘Grand Débat National’-এর আয়োজন করে নাগরিকদের মতামতকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছিলেন। তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্বমানে নিয়ে যেতে প্রস্তুত।

এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখলে, তারেক রহমানের উদ্যোগ নিছক একটি নির্বাচনি কৌশল নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিকে বিশ্বের আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারার সাথে যুক্ত করার একটি সচেতন প্রয়াস। বিশেষত দীর্ঘ সময় ধরে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিজ্ঞতা থাকা একটি সমাজে এই ধরনের খোলা সংলাপ মানুষের মধ্যে নতুন আশার জন্ম দেয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- এই ক্যাম্পেইন রাজনীতিকে ব্যক্তি-পূজা বা স্লোগাননির্ভর আবেগ থেকে সরিয়ে এনে সমস্যাকেন্দ্রিক আলোচনায় কেন্দ্রীভূত করছে। জনগন যখন শ্লোগান দিতে চেয়েছে তারেক রহমান তাদের থামিয়ে দিয়েছে স্নেহের অনুশাসনে। 

তারেক রহমানের নির্বাচনী সভায় বক্তা ও  শ্রোতার ইন্টার‍্যাকশনে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছে কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও স্থানীয় উন্নয়ন—অর্থাৎ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব প্রশ্নগুলো। এতে রাজনীতি আবার বাস্তব জীবনের সাথে সংযুক্ত হচ্ছে, যা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো- এই প্রচারণা ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থারও একটি ইঙ্গিত বহন করে। যে নেতা নির্বাচনের আগে মানুষের কথা শোনার সংস্কৃতি গড়ে তোলেন, শাসনকালেও সেই সংস্কৃতি ধরে রাখার সম্ভাবনা তার বেশি থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তারেক রহমানের নতুন ক্যাম্পেইন কেবল ভোটের রাজনীতি নয়- এটি একটি গণতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ।

তারেক রহমানের এই নতুন নির্বাচনি প্রচারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করছে। এটি দেখাচ্ছে- রাজনীতি কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়; রাজনীতি মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, সংলাপ ও পারস্পরিক আস্থার নাম। এই ধারা যদি টেকসই হয়, তবে বাংলাদেশ শুধু একটি নির্বাচনই দেখবে না- দেখবে রাজনীতির ভাষা ও সংস্কৃতির এক নতুন অধ্যায়।

- শেখ আহমেদ ফরহাদ
ব্লগার ও এক্টিভিস্ট
যুগ্ম আহবায়ক,বাংলাদেশ এনিমেল ওয়েলফেয়ার এসোশিয়েসন