Image description
 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ১৭ বছর পর দেশে ফিরে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে তাঁর একটা সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে। সে কথা জানিয়েছেন। জনগণ সম্ভবত তাঁর মাঝে একটা নৈকট্য খুঁজে পেতে শুরু করেছেন। তাঁর কথাগুলো মানুষ আজ আর নিছক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বলে মনে করছে না, বরং তিনি তার রাজনৈতিক পরিকল্পনার কথা যখন বলেন, তখন তাঁর অভিব্যক্তি আর বলিষ্ঠ উচ্চারণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এগুলো তাঁর সযত্নে লালিত স্বপ্ন, আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়িত হবে সেই প্রশ্ন সমালোচকদের থাকতেই পারে। কিন্তু তার ভাবনাটা যে শুদ্ধ আর অন্তরের, সেটা নিয়ে কোনো রকম সন্দেহ বা সংশয়ের সুযোগ নেই। তিনি প্রায়ই আগামীদিনে সরকারে তার কর্মপরিকল্পনার কথা বলেন। তিনি ‘কৃষক কার্ডের’ কথা বলেছেন, যেখানে প্রান্তিক কৃষকের জন্য ভর্তুকিমূল্যে ফসলের জন্য বীজ, সার, কীটনাশক দেওয়ার কথা আছে, আছে কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চয়তার কথা। নামমাত্র সার্ভিস চার্জে কৃষিঋণ প্রাপ্তির সুবিধা, মৎস্যজীবী পোলট্রি চাষিদেরও তিনি এর আওতায় রাখতে চেয়েছেন। ‘কৃষক কার্ড’ নিয়ে কিছু প্রাসঙ্গিক আলোচনা করা যেতে পারে। আর আলোচনাটি নির্মোহ হওয়াই ঠিক হবে। এটা কতটা বাস্তবায়নযোগ্য, কতটা নিছক স্বপ্নবিলাস, কতটা সম্ভবপর, অর্থায়ন কীভাবে হবে, দুর্নীতিমুক্ত থাকবে কি না, সত্যিকার কৃষকরা পাবেন কি-না, পরিকল্পনা কতটা কার্যকর, কতটা বাস্তবায়নযোগ্য ও ফলপ্রসূ হবে- সেটাও দেখা দরকার। প্রমাণ করতে হবে কতটা আন্তরিক তিনি ? নাকি নির্বাচনের আগে প্রথাগত প্রতিশ্রুতির তালিকার নব সংযোজন? দেখা যাক বিশ্লেষণ কী বলে।
আদিকাল থেকেই দেশের কৃষি খাত টিকিয়ে রেখেছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক। সর্বশেষ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট পরিবার রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৫২ হাজার ২৯৬টি। এর মধ্যে কৃষক পরিবার রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার ৫৩৯টি। অন্যদিকে, দেশে কৃষিজমির পরিমাণ প্রতিনিয়তই কমছে। প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি উৎপাদনশীলভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, ৪০ শতাংশ কৃষক পরিবার ভূমিহীন বর্গাচাষি, যথাযথ মজুরি পান না দেশের অর্ধেক কৃষক। একদিকে বাড়ছে কৃষি উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে ফসলের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না কৃষক। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে যান্ত্রিকীকরণ এখনো অনেক পিছিয়ে কৃষক। অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্স অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করে কৃষি খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির হার কমছে। বিপরীতে বাড়ছে খাদ্যশস্য আমদানি।
কৃষি খাতের অগ্রগতির জন্য ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে কৃষি খাতের পর্যালোচনা (রিভিউ) হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৯০ সালেও একটি অর্থনীতি রিভিউ করা হয়। এ দুটি পর্যালোচনা প্রতিবেদনে সে সময়ের বিবেচনায় কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ, বিনিয়োগ বাড়ানো এবং ফসল বৈচিত্রকরণের সুপারিশ করা হয়। এমন প্রেক্ষাপটে ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার এসব সুপারিশসহ কৃষিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়। সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজ ও সার ব্যবস্থাপনা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম জোরদার করে কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির এ মেয়াদে কৃষিতে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা ছিল বড় একটি রূপান্তর। সেচ ব্যবস্থায় বেসরকারি খাতকে যুক্ত করার পাশাপাশি সারের আমদানি ও বিতরণে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো হয়। এতে সার সংকট ও অনিয়ম অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে। সারের প্রাপ্যতা তখন কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমিয়েছিল। ১৯৯০-এর সর্বশেষ রিভিউর পর ৩৫ বছর কেটে  গেলেও কৃষি খাত সংস্কারে দেশে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করেছিলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার কৃষি খাত সংস্কারে কমিশন গঠন করবে। কিন্তু ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও কৃষি খাতের জন্য সে রকম কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
এই বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে তারেক রহমানের প্রস্তাবনা ‘কৃষক কার্ড’। বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই ফসল উৎপাদনকারী কৃষকের জন্য বিশেষ সুবিধা : যেসব কৃষক বছরে দু’টি ফসল (যেমন : রবি ও খরিফ) উৎপাদন করেন, তাদের একটি ফসলের জন্য পূর্ণাঙ্গ সহায়তা (যেমন : সম্পূর্ণ সার ও বীজ) দেওয়া হতে পারে, যা তাদের উৎপাদন ব্যয় কমাতে এবং আয় বাড়াতে সাহায্য করবে। অর্থাৎ কমপক্ষে একটি ফসল উৎপাদন খরচ রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া হবে। ফলে কৃষক কার্ড যদি কৃষককে আর্থিক সুবিধা দেয় তাহলে এর যথাযথ ব্যবহারে কৃষকই সঠিকভাবে উপকৃত হবেন। আরও আগ বাড়িয়ে হয়ত এটাও বলা যায়, এই কার্ডে একজন কৃষকের সমস্ত তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে কৃষক কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর আশ্রয় না নিয়েই কৃষি ঋণসহ অন্যান্য সুবিধা স্বচ্ছভাবে উপভোগ করতে পারবেন। ফলে কৃষকদের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং কৃষি খাতকে আধুনিক ও টেকসই করতে সহায়তা করবে।
পরের প্রশ্ন হলো, বেনিফিশিয়ারি তথা ফলভোগীদের নির্বাচন কীভাবে করা হবে? তারেক রহমানের পরিকল্পনা বলছে, যিনি নিয়মিত কৃষিকাজ করেন (কৃষক), যার নিজস্ব বা পত্তনি (ইজারা) সূত্রে কৃষি জমি আছে, যার নামে কৃষি জমির রেকর্ড (যেমন-খতিয়ান/পর্চা) আছে এবং যিনি কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক) কিনতে চান, শুধুমাত্র তারাই আবেদন করতে যোগ্যতা বলে বিবেচিত হবেন। অনলাইন পোর্টাল/অ্যাপ অথবা কৃষি বিভাগের পোর্টালে গিয়ে নিবন্ধন করা যাবে। নির্দিষ্ট নম্বরে এসএমএস পাঠিয়েও নিবন্ধন করা সম্ভব। এছাড়া নিকটস্থ কৃষি কর্মকর্তার সহায়তায় নিবন্ধন করা যাবে।
কৃষক কার্ডের সম্ভাব্য সুবিধাগুলো বিভিন্ন কৃষি পণ্যে কৃষকরা মধ্যস্বত্ব¡ভোগী ছাড়াই সরাসরি ভর্তুকি প্রদান, সহজ শর্তে কৃষি ঋণ সুবিধা, ফসলের বীমা তথা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতিপূরণ ও সরকারি ক্রয় সুবিধা পাবেন। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে সার (কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ), উন্নত মানের বীজ সরবরাহ, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সহায়তা, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি বিষয়ক প্রশিক্ষণ, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ ও বিক্রির সহায়তা পাবেন। এতে শোষণের অবসান ঘটবে এবং কৃষক জাতীয় অর্থনীতির সমান অংশীদার হবেন।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট : বিশ্বায়নের এ যুগে আমরা অন্যান্য দেশের সঙ্গে সংযুক্ত এবং তাদের সঙ্গে আমাদের কৃষির তুলনা করা স্বাভাবিক। বিশ্বজুড়ে কৃষক কার্ডের প্রচলন মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকের তথ্য নির্ভুলভাবে প্রদান এবং সরকারি সহায়তা সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে একটি কার্যকর ব্যবস্থা। যেমন- ভারতের ‘ফার্মার আইডি কার্ড’ (কৃষক পরিচিতি পত্র) হলো ভারত সরকারের কৃষি-স্ট্যাক উদ্যোগের অধীনে কৃষকদের জন্য তৈরি একটি ডিজিটাল পরিচয়, যা তাদের আধার কার্ডের মতো কাজ করে। যেখানে কৃষকের সমস্ত তথ্য, জমির রেকর্ড এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা একটি একক ডিজিটাল সিস্টেমে লিঙ্ক করা থাকে। এটি একটি ডিজিটালপত্র, যা রাজ্য সরকারগুলো দ্বারা তৈরি ও পরিচালিত হয় এবং এর মাধ্যমে কৃষকরা বিভিন্ন ডিজিটাল পরিষেবা, যেমন-স্কলারশিপ, বীমা, ঋণ, এবং কৃষি সম্পর্কিত তথ্য সহজে পেতে পারে। এভাবে ডিজিটাল কৃষক পরিচয়পত্র চালুর মাধ্যমে ভারত এক নতুন কৃষি বিপ্লবের পথে হাঁটছে। ভারত সরকারের লক্ষ্য, ২০২৭ সালের মধ্যেই দেশের ১১ কোটি কৃষককে এই ডিজিটাল আইডির আওতায় আনা এবং আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার সুবিধা পৌঁছে দেওয়া।
এছাড়া পাকিস্তানে, বিশেষ করে পাঞ্জাব প্রদেশে, ‘কিষাণ কার্ড’ নামে একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র চালু আছে, যা কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সহায়তা যেমন- ভর্তুকি, ঋণ (সুদমুক্ত ঋণসহ) এবং অন্যান্য পরিষেবা সহজে পেতে সাহায্য করে। এটি পাঞ্জাব ইনফরমেশন টেকনোলজি বোর্ড(পিআইটিবি) এবং অন্যান্য সংস্থার সহায়তা তৈরি একটি ডাটাবেস ব্যবহার করে কৃষকের তথ্য যাচাই করে এবং মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই সরাসরি সুবিধা পৌঁছে দেয়।
অনুরুপভাবে, নেপালে ‘কিষান আইডি’ বা কৃষক আইডি কার্ড হলো একটি ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও আর্থিক পরিষেবা, যা মূলত ছোট কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি আর্থিক পরিষেবা (যেমন-বীজ, সার, কৃষি সরঞ্জাম কেনা), ডিজিটাল লেনদেন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি সাধনের জন্য চালু করা হয়েছে; এটি নেপাল রাষ্ট্র ব্যাংক (এনআরবি) এবং কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক লিমিটেড (এডিবিএল)সহ বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়, যা কৃষকদের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পেতে সাহায্য করে।
একইভাবে, ইন্দোনেশিয়ার ফার্মার্স কার্ড (কার্তু টানি) হলো কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকিযুক্ত সার এবং অন্যান্য কৃষি সহায়তা বিতরণের একটি ডিজিটাল ব্যবস্থা। যা সার বিতরণকে লক্ষ্যভিত্তিক ও স্বচ্ছ করে তোলে এবং কৃষকদের ডেটাবেস তৈরি করে, যা তাদের জন্য কৃষি ঋণ ও শিক্ষামূলক সেবা পেতেও সহায়ক। এটি মূলত ভর্তুকিযুক্ত সার কেনা, কৃষি ঋণের তথ্য সংগ্রহ এবং কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সেবার মান উন্নত করে। এভাবে উন্নত বিশ্বে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কৃষক আইডি কার্ড কৃষকদের একটি একীভূত ডিজিটাল পরিচয় প্রদান করে, যা তাদের কৃষি কার্যক্রমকে সহজ, স্বচ্ছ এবং আরও কার্যকর করে তোলে।
বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারেক রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের উদ্দেশ্যে ৩১ দফা ঘোষণার উন্নয়ন পরিকল্পনায় কৃষক ও কৃষিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তিনি অনুধাবন করেছেন, কৃষক ও কৃষিকে অবহেলা করে বাংলাদেশকে উন্নত করা সম্ভব নয়। তাই কৃষি খাতের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে তিনি ‘কৃষক কার্ড’ চালুর কথা বলেছেন। তারেক রহমান কৃষক কার্ডের এই প্রকল্প আটঘাট বেঁধেই নিয়েছেন মনে হয়। এটা নিছক নির্বাচনী চমক হলে এর ভালোমন্দ আর চ্যালেঞ্জ নিয়ে এত বিস্তারিত বলার প্রয়োজন হতো না। আমরাও অপেক্ষায় রইলাম দেশের প্রান্তিক কৃষকগণের কল্যাণে কৃষক কার্ডের মতো একটা যুগান্তকারী প্রকল্প যেন সফল হয়। এর সুবিধা যেন সেই সুবিধাবঞ্চিত কৃষকদের কাছে পৌঁছায়। তারেক রহমানের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো, এটা প্রমাণ করা যে কৃষক কার্ড যেন নিছক কথার কথা না হয়। আমরাও এ বিষয়ে আশাবাদী হতে চাই। 

 

মো. জাহিদ হোসেন

লেখক : উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম), বিভাগীয় প্রধান, হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক 
[email protected]