Image description
 

বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ক্রান্তিলগ্নে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে যখন দেশ এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন তাঁর কর্মময় জীবন ও আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। তিনি কেবল একজন সেনাপতি বা রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের এক স্বপ্নদ্রষ্টা স্থপতি।

 

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের স্বাধীনতার ঘোষণা দিশেহারা জাতিকে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস জুগিয়েছিল। রণক্ষেত্রের বীরত্ব থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার কঠিন চ্যালেঞ্জ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৭৫ পরবর্তী ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের হাল ধরে তিনি যে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ'-এর ডাক দিয়েছিলেন, তা জাতিকে একটি নিজস্ব স্বকীয়তা ও আত্মপরিচয় দিয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল একদলীয় শাসনব্যবস্থা থেকে দেশকে বহুদলীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনা। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি একটি রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি থেকে জাতিকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলে প্রবর্তিত ‘১৯ দফা’ কর্মসূচি ছিল গ্রাম-বাংলার অর্থনৈতিক মুক্তির সনদ। খাল খনন কর্মসূচি, সবুজ বিপ্লব এবং গ্রাম সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে গিয়েছিলেন। আজ আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি যে তৈরি পোশাক শিল্প এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, এর বীজ বপন করেছিলেন এই স্বপ্নদ্রষ্টা মানুষটিই।

 

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে তাঁর হাত ধরেই গঠিত হয়েছিল ‘সার্ক’। তাঁর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির কারণেই বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিল।

 

একজন মানুষ হিসেবে জিয়াউর রহমানের সততা ও সাধারণ জীবনযাপন আজও কিংবদন্তি। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও তাঁর জীবন ছিল অনাড়ম্বর। তাঁর ব্যক্তিগত চারিত্রিক দৃঢ়তা ও দেশপ্রেম বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিকদের জন্য এক বিশাল শিক্ষার উৎস। তিনি বিশ্বাস করতেন, ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে দেশ বড়’।

আজকের এই দিনে তাঁকে কেবল স্মরণ করা নয়, বরং তাঁর কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে ইতিহাসের এই মহানায়ককে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। শহীদ জিয়ার দর্শন ও উন্নয়নমূলক চিন্তাগুলোই হতে পারে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল শক্তি।

 

শেখ ফরিদ