সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে আজাদির লড়াই জারি রেখেছিলেন ওসমান হাদি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সংস্কৃতির আজাদি ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওসমান হাদি। ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে এক অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর ও চব্বিশের জুলাইয়ের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। ঘাতকের গুলি তার জীবন কেড়ে নিলেও তিনি রেখে গেছেন তার সাহস, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের আগুন, যা ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সবার মধ্যে। মাত্র ৩২ বছর বয়সে শহীদি মৃত্যুবরণ করা হাদির বক্তব্য, স্লোগান, কবিতা, প্রতিবাদ-প্রতিরোধের বার্তা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ঠাঁই করে নিয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্তের নানা দেশের মানুষের মনে-মগজে।
শরীফ ওসমান হাদিকে নতুন করে আবিষ্কার করে ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। আন্দোলন, স্লোগান, মিছিল, বিদ্রোহের মিশেলে নির্মিত এক পূর্ণাঙ্গ প্রাণ হাদি। জুলাইয়ের চেতনায় উজ্জীবিত হাদি কখনো পিছপা হননি। যেখানে তার অনেক সহযোদ্ধা বিপ্লবের পর বিত্তবৈভব, অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতার মোহে পড়েছেন, সেখানে জুলাইয়ের চেতনায় অবিচল ছিলেন ওসমান হাদি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার আলোকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় গড়ে তুলেছেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামের নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এই মঞ্চ থেকে তিনি খুনি হাসিনার ফাঁসি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, জুলাই শহীদদের স্বীকৃতি, অপরাধীদের বিচার এবং ‘জুলাই চার্টার’ ঘোষণার দাবিতে রাজপথে ও সভা-সমাবেশে সরব ছিলেন। টকশো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই তার উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল। ‘জান দেব, জুলাই দেব না’ স্লোগানে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন নির্ভীক শরীফ ওসমান হাদি।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হয়ে ওসমান হাদি বারবার গর্জে উঠেছেন অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। লড়াই করেছেন ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, জুলাই আহত ও শহীদদের অধিকার রক্ষায় একচুলও আপস করেননি। কাজ করেছেন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য। ইনসাফের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের স্বপ্ন ছিল ওসমান তার।
বর্তমানে হাদি ফ্যাসিবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একজন ‘জাতীয় বীর’ ও প্রতিবাদী রাজনীতির এক মূর্ত প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন হাদি। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মূলধারার কোনো রাজনৈতিক দলে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন, লিখেছেন বই।
‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের প্রতিটি লাইন যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একেকটি জ্বলন্ত বারুদ। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, দ্রোহ আর শাহাদতের তপ্ত নিঃশ্বাস এই বইয়ের পাতায় পাতায় গেঁথে আছে। একজন কিংবদন্তি হিসেবে তিনি যে সাহসের পরিচয় দিয়ে গিয়েছেন, তা এ বই পড়লে টের পাওয়া যায়। বইয়ের শুরুতে তিনি তার বাবাকে উৎসর্গ করে বলেছিলেন, ‘আব্বাকে, যার ডাকে লাল হয়ে ওঠে শিমুল বাগান/ঝড়ের রাইতে আজও কানে বাজে আব্বার আজান।’ তার কবিতার পঙক্তিমালায় শেকড়ে স্নিগ্ধ সুবাস লুকায়িত আছে। আবহমান বাংলা সংস্কৃতির নির্যাস রয়েছে কবিতার পরতে পরতে।
সাহসী ভূমিকা, ঝাঁজালো বক্তব্য আর আপসহীন অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
স্পষ্টভাষী হাদির বক্তব্য তাকে যেমন জনপ্রিয় করে তোলে, তেমনি তার শত্রুও তৈরি হয়। কিন্তু তিনি পিছিয়ে যাননি। বরং আরো উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। তাকে বারবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইনসাফের লড়াই থেকে পিছিয়ে যাব না।’
হাদির বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ইনকিলাব মঞ্চ হয়ে ওঠে ভারতের আধিপত্যবাদবিরোধী শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোয় ভারতের অবৈধ ও একতরফা সব বাঁধ ভেঙে ফেলার দাবিতে ‘গণধিক্কার ও ভাঙার গান’ এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের পানিসন্ত্রাসের প্রতিবাদে ও আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোয় ভারতের অবৈধ এবং একতরফা সব বাঁধ উচ্ছেদের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে ঢাকা থেকে ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ অভিমুখে লংমার্চ মাঠে নামেন তিনি।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে আহত বীর যোদ্ধাদের দ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবিতে ‘মুমূর্ষু সমাবেশ’, জুলাই ম্যাসাকারে জড়িত সব অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করা, আবরার ফাহাদ, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিসহ এ ধরনের আরো অনেক দাবি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন তিনি। প্রতিটি সভা-সমাবেশে ও কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদী গান, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, পথনাটক ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। তিনি জানতেন, বক্তব্যের চেয়েও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করা যায় সহজে।
ওসমান হাদি বুঝতে পেরেছিলেন যে তার লড়াইটা শুধু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে না; দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধেও। এই আধিপত্যবাদের নানা ডাইমেনশনের মধ্য থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাংলাদেশি সংস্কৃতি দিয়ে মোকাবিলা করবেন ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের। লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি গড়ে তোলেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে দেশকে রক্ষা করতে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। নানা মাধ্যমে জাতিকে আধিপত্যবাদ সংস্কৃতির গোলামি থেকে আজাদ করতে চেয়েছেন তিনি।
ইসলামি আলোকে সংস্কৃতির নানা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শবেবরাতের রাতে নাত, কবিতা ও গজলের মজমা ‘ঝরে আবে জমজম’ শিরোনামে অনুষ্ঠান এবং ‘এলো খুশির ঈদ’ শিরোনামে ঈদের মিছিলের আয়োজন করেছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আয়োজন করেছেন ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠের। ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ব্যানারে পাঠচক্র, সভা-সেমিনার, কবিতার অক্ত নামে কবিতা পাঠের আসর, একক বক্তৃতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন নিয়মিত। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ইতিহাসের মুক্তি’ এবং ‘শাহবাগ-উত্তর জমানায় সার্বভৌম সংস্কৃতির নিশানা’ শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিতে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেছেন তিনি। ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে সংবিধান প্রশ্ন : মুজিববাদ নাকি জনমুক্তি?’ এবং ‘সংবিধান সংলাপ’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে জনগণকে সোচ্চার করার চেষ্টা করেন। আজাদির ঐতিহাসিক তিন পর্ব ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ কর্মশালা আয়োজন করে তরুণদের বুদ্ধিবৃত্তিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন।
ইনকিলাব সেন্টারের ব্যানারে সাপ্তাহিক এককালাপ নামে ধারাবাহিকভাবে—‘গাঠনিক প্রক্রিয়া ও আগামী দিনের রাজনীতি’, ‘গণঅভ্যুত্থানোত্তর বাংলাদেশে সংহতির প্রাসঙ্গিকতা ও জরুরত’, ‘তুমি কে, আমি কে?, ‘বাঙ্গালাহ ও বাঙ্গালীর শুরুর গল্প’, ‘শেখ সাদীর কারিমা ইন্দো-পার্সিয়ান সাংস্কৃতিক জগৎ’, ‘ইন্টেরিম আমলে যাহা দেখিলাম, যাহা বুঝিলাম, যাহা বুঝিবার চাই!’ এবং ‘বাংলাদেশি-সিনেমা কেন ও কীভাবে বাংলা-সাহিত্যের চাইতে আলাদা একটা লিগ্যাসির ঘটনা?’ ইত্যাদি শিরোনামে বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের নতুন বন্দোবস্ত করতে চেয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পায়রা চত্বর, টিএসসিতে জুলাই গণহত্যার ১০০তম দিনে শহীদদের স্মরণে শোকগীতি, পথনাট্য, দোয়া ও শহীদি স্মৃতিকথায় ‘কান্দে আমার মায়’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর, শাহবাগ মোড় বিজয় দিবসে ‘বিজয়ের লাল জুলাই’ শিরোনামে অনুষ্ঠানে ‘লাল জুলাই’ গানের প্রিমিয়ার শো, ভিডিও ডকুমেন্টেশন ও শহীদি স্মৃতিকথা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ফটো এক্সিবিশন আয়োজন করেন।
শরীফ ওসমান হাদির রচনায় মাবরুর রশিদ বান্নাহ পরিচালনায় ‘লাল জুলাই’ শিরোনামে লাল জুলাই ডকুমেন্টারি মিউজিক্যাল ভার্সন প্রকাশিত হয়। রাহাত শান্তনু ও জনতার কবিয়ালের কণ্ঠে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুনি হাসিনার কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ গান আলোড়ন সৃষ্টি করে।
তিনি ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে জুলাইকে ধারণ করে দুটি বই প্রকাশ করেন। গত বছর একুশে বইমেলায় ‘জুলাইয়ের স্লোগান, গ্রাফিতি ও গাইল সমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। এরপর প্রকাশিত হয় ‘জাতিসংঘ প্রতিবেদনে জুলাই অভ্যুত্থান : মানবাধিকার সংকট ও সমাধান’। প্রকাশনা দুটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দালিলিক প্রমাণ হিসেবে সমাদৃত হয়েছে।
শরীফ ওসমান হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি বিপ্লবের এক জ্বলন্ত প্রতীক। অন্যায়কে রুখে দাঁড়ানোর, ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে কথা বলার এবং নির্ভীকচিত্তে সত্য উচ্চারণের এক সাহসী নাম। জুলাই বিপ্লবের অস্থির দিনগুলোয় যখন আতঙ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল মানুষের বিবেককে, তখন ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন দৃঢ়তার অবয়ব। মঞ্চে কিংবা মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না জড়তা, দৃষ্টিতে ছিল না ভয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য বলার ঝুঁকি আছে ঠিকই, কিন্তু নিশ্চুপ থাকার দায় আরো ভয়াবহ। আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে চলার পথে অবিচল থেকে লালন করেছেন ইনসাফের এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।
শত হুমকি আর শত্রুর ভয় কিছুই তার সাহসকে দমাতে পারেনি। বারবার বলেছেন, ‘বুলেট ছাড়া কেউ আমাকে থামাতে পারবে না।’ সত্যিই, সেই বুলেট তার মস্তিষ্ক ভেদ করে রক্ত ঝরিয়েছে বাংলাদেশের বুকের ওপর। হাদি নিজেও চেয়েছিলেন শহীদি মৃত্যু। আল্লাহ তার সে চাওয়া পূরণ করছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব হাদি যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, তা বাস্তবায়নে নতুন অঙ্গীকার গ্রহণ করা।
সীমান্ত আকরাম
লেখক : প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক, কাঠপেন্সিল