
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ব্যবহার পুরোনো ও বহুল আলোচিত বিষয়। জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো গঠিত হলেও শাসক দলগুলো ক্ষমতার ভিত্তি শক্ত করা, বিরোধী দল দমন কিংবা নজরদারির কাজে এসব সংস্থাকে ব্যবহার করে আসছে। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের নজিরও এ দেশে রয়েছে। জেনারেল এরশাদের রাজনৈতিক দল গঠনের পেছনে গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এক-এগারোর সময় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রচেষ্টায় বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াসহ দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা যোগ দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘটনাগুলো খুব বেশি দিনের পুরোনো নয় বলে অনেকের স্মৃতিতে এসব গোয়েন্দা তৎপরতা এখনো টাটকা।
রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপে নিকট অতীতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দলগুলোর একটি হলো বিএনপি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর নির্যাতনের পেছনেও গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এক-এগারোর আগে ও পরে উইকিলিকসে ফাঁস হওয়া কূটনৈতিক তারবার্তায় সে সময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোয়েন্দা তৎপরতার নানা তথ্য উঠে এসেছে। এক-এগারোর ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল বিএনপির ভেতরে দলটির নেতাদের অসন্তোষ থেকে। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দলটির বাম বলয়ের নেতারা। এমনকি সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বড় একটি অংশও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এই সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকী এক-এগারোর দুই বছর আগে, ২০০৫ সালের মার্চ মাসে, তারেক রহমানের ভূমিকা নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সে সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব খবর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে কীভাবে উপস্থাপন করেছিল, কিংবা আদৌ করেছিল কি না¬Ñসে প্রশ্ন তোলা যায়।
বিএনপি নেতাদের বিশ্বাসঘাতকতার চিত্রও ফাঁস হওয়া মার্কিন কূটনৈতিক তারবার্তাগুলোতে উঠে এসেছে। ২০০৭ সালের ২৫ মে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হোটেল শেরাটনে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বেগম জিয়ার সঙ্গে ছিলেন তার পুত্রবধূ জোবায়দা রহমান। বৈঠকের শেষ দিকে যোগ দেন তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া। বেগম জিয়া মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছিলেন। মান্নান ভূঁইয়া তার বক্তব্য সমর্থন করে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পাঠানো তারবার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে, এই বৈঠকের এক দিন আগে তার সঙ্গে বৈঠকে মান্নান ভূঁইয়া বলেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হলে তা ভুল হবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পাঠানো এসব তারবার্তায় ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন পরিচালক চৌধুরী ফজলুল বারী ও কাউন্টার টেরোরিজম পরিচালক এ টি এম আমিনের তৎপরতার নানা বিবরণ দেওয়া হয়েছে। বিএনপির একজন মন্ত্রী সে সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বলেছিলেন, দলের ১০০ জন সংসদ সদস্য ‘কিংস পার্টি’ গঠনের ব্যাপারে আগ্রহী। তাদের মধ্যে অনেকে আবার দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা করছিলেন।
শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাজনীতিবিদদের হয়রানি ও নিপীড়নের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। বিএনপির নেতাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হতো বলেও অভিযোগ আছে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতার কারণে বিরোধী জোট, এমনকি বিএনপির মধ্যেও সন্দেহ, অবিশ্বাস ও আস্থার সংকট দেখা দিয়েছিল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে একবার মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। হাসিনার আমলে একতরফা নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৎপরতা বেড়ে যেত। ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাজি না হওয়ায় তৎকালীন ডিজিএফআইপ্রধান মোহাম্মদ আকবর হোসেন তাকে নিজের গাড়িতে তুলে সিএমএইচে ভর্তি করিয়েছিলেন । এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং এরশাদের সঙ্গে দেখা করে নির্বাচনে যাওয়ার জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এছাড়া বিএনএম ও ‘তৃণমূল বিএনপি’ গঠনে ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত।
রাজনীতিতে গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। ২০ আগস্ট রাজশাহীতে এক জনসমাবেশে বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে ও কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে সরকারের কাছে স্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। পলাতক স্বৈরাচারী গোষ্ঠী শ্রমিক অসন্তোষ তৈরিতে অর্থ জোগাচ্ছে এবং নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ‘টিকিট’ বিক্রির চেষ্টা করা কয়েকটি দলও এতে যুক্ত হয়েছে। (আমার দেশ, ২১ অক্টোবর ২০২৬)
এর জবাবে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান মৌলভীবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘উনি (প্রধানমন্ত্রী) খোলাসা করে বলুক, আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমরা আছি। ওনার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছি—প্রধানমন্ত্রী প্রমাণ করুক কোথায়, কখন, কার সঙ্গে, কীভাবে ছিলাম বা কথা বলেছি?’ তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের সূত্র উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী এভাবে কথা বলতে পারেন না। তিনি বলতে পারতেন, তার কাছে প্রমাণ আছে। আর তারা সেই প্রমাণের অপেক্ষায় আছেন। সাহস থাকলে প্রধানমন্ত্রী যেন তাদের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। (আমার দেশ, ২৫ অক্টোবর ২০২৬)
রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার এই বাগ্যুদ্ধ দেশের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। বরং দুই নেতার এ ধরনের বিতর্ক থেকে রাজনীতিতে পতিত আওয়ামী লীগ ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে নানা ধরনের তথ্য পেয়ে থাকেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে, আমাদের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের একটি বড় অসুখ হলো, ক্ষমতাসীনরা যা শুনতে পছন্দ করেন, তাদের কাছে তা-ই উপস্থাপন করা হয়। বিরোধী দলের নেতা যেভাবে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন, তা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর বটে।
এ দেশে বড় ধরনের সংকটের সময় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্ষমতাসীনদের কাছে সঠিক তথ্য দিতে বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর একটি উদাহরণ হলো, জোট সরকারের আমলে সারা দেশে উগ্রপন্থি সংগঠন জেএমবির বোমা বিস্ফোরণ। এ ঘটনা আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করেছিল। এত বড় সন্ত্রাসী হামলার আগাম খবর দিতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। এর আগে ১৯৯৬ সালে জেনারেল নাসিম ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল বিএনপি সরকার। তিনি বিএনপির শাসনামলে ডিজিএফআইয়ের প্রধানের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে জনগণের মধ্যে যেমন একধরনের ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ গড়ে ওঠে, তেমনি সংস্থাগুলো জাতীয় নিরাপত্তার চেয়ে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পেশাগত দক্ষতায় ঘাটতি তৈরি হয়। আবার গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণ অনেক ক্ষেত্রে বুমেরাং হতে পারে। কারণ, একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করতে পারেন, একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার পক্ষে তা সবসময় সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে একটি স্বাধীন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে এসব সংস্থা রাজনৈতিক ব্যবহারের বাইরে থাকতে পারে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের দেশে বছরের পর বছর এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে জাতীয় নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় আনা এবং সংসদীয় তদারকি নিশ্চিত করার দিকে দৃষ্টি দেওয়ার সময় এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর দীর্ঘদিনের পরিচালক ছিলেন অ্যালেন ডালস। তিনি গোয়েন্দা কার্যক্রমের পদ্ধতি, নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে দ্য ক্রাফট অব ইন্টেলিজেন্স (The Craft of Intelligence) নামে একটি বই লিখেছিলেন। তার বক্তব্যের সারকথা হলো, গোয়েন্দা সংস্থাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সেটি সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং সরকারের রাজনৈতিক বয়ান তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হয়। ডালসের যুক্তি ছিল, গোয়েন্দা সংস্থার মূল দায়িত্ব সত্য উদঘাটন করা। কিন্তু সরকার বা রাজনীতিকরা নিজেদের রাজনৈতিক বয়ান তৈরির জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করলে সংস্থাটি তথ্য বিকৃত করতে শুরু করে এবং নিরপেক্ষভাবে সত্য অনুসন্ধানের ক্ষমতা হারায়।
বাংলাদেশের রাজনীতিকদের উচিত, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে বিতর্কের ঊর্ধ্বে রেখে জাতীয় স্বার্থে সেগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, যাতে এসব সংস্থা সত্যিকার অর্থে জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, গোয়েন্দা সংস্থার অতিরিক্ত রাজনীতিকীকরণ বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।