মো. বাবুল হোসেন
মানুষ বিভিন্ন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে হৃদয়ের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করে থাকে। ভালো সম্পর্ক আমাদের আত্মার মধ্যে একটি প্রশান্তি এনে দিতে পারে। খারাপ সম্পর্কও মনের মধ্যে বিষাদ এনে দেয়। কিন্তু সম্পর্কগুলো আগের মতো এখন আর নেই। মানুষ পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষকে পরিবর্তন হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রীক হতে হচ্ছে।
পরিবর্তন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। প্রতিনিয়তই মানুষ নিজের, পরিবারের এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই পরিবর্তন হচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজের গোলক ধাঁধাায় পারিবারিক সম্পর্কগুলো দিনদিন ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে আমাদের অজান্তেই।
এখন আর মানুষ আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি খুব একটা যায়না খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। ফোনেও খুব কমই কথা হয়। নিজে আরও ভালো থাকা এবং পরিবারকে একটু ভালো রাখার জন্য অবিরাম ছুটছে। প্রতিনিয়তই তাকে নতুন নতুন প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। ডিজিটাল অসংখ্য টুলস আমাদের সময়কে খেয়ে নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দিনের একটা লম্বা সময় আমরা দিচ্ছি তেমন কোনো কারণ ছাড়াই।
মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে। সম্পর্কগুলোতে মানুষ লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে শুরু করেছে। মানুষ আগে একসময় নানা-নানী, খালা, ফুফুদের বাড়ি খুব বেড়াতে যেত। খালাতো, মামাতো, ফুফাতো ভাই-বোনদের মধ্যে অত্যন্ত একটা আন্তরিক ও অকৃত্রিম সম্পর্ক ছিল। আত্মীয়দের বাড়িতে ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে সম্পর্কটা দৃঢ় ছিল। অতীতের সে আত্মীক সম্পর্ক আর যাতায়াত এখন নষ্ট হয়ে গেছে।
নিখাদ সম্পর্কের মধ্যে এখন ভাটা পড়েছে। কেউ কারো খবর নেয় না। আত্মীয়ের বাড়িতেও খুব একটা যাওয়া হয়না। খবর নেওয়ার আগ্রহও তেমনটা নেই। ছোট বেলায় আমরা ভাই-বোনরা মিলে মায়ের সাথে নানী বাড়ি এবং খালাদের বাড়িতে ৮ থেকে ১০ মাইল পথ হেঁটে হেঁটে মাঝে মাঝে রাস্তায় জিরিয়ে যেতাম। খালার বাড়িতে যেতে কী যে আনন্দ লাগত! এটা আসলে লিখে বা বলে পুরোপুরি ব্যাখ্যা দেওয়া কঠিন। আগের সেদিন আর নেই। এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে একটা দূরত্ব আছে। শহরে যারা থাকেন সমপর্যায়ের, তাদের সাথে আবার প্রতিদিনই ভিডিও কলে কথা হয়। যোগাযোগ আছে ঠিকই; তবে সেটার মধ্যে একটা কৃত্রিমতা আছে। আবেগটা সেভাবে আর কাজ করেনা।
সম্পর্কের বিষয়ে আমার এক সহকর্মী মুন্না (ছদ্মনাম)-এর সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বলেন, এখন আমরা বিভিন্ন ধরনের সমিতি, ক্লাব, সংগঠন, অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। আত্মীয়দের সাথে সময় না দিয়ে এসব দিকে আমরা সময় দিচ্ছি এবং অর্থও খরচ করছি। এদিকে অর্থ খরচের বিষয়ে কোনো কার্পণ্য করছিনা। নিজেকে জাহির করার জন্য হলেও টাকা খরচ করছি। তা নাহলে মান থাকবেনা।
তিনি বলেন, একটা অনুষ্ঠানে একজনের চাঁদার পরিমাণ সাড়ে ৬ হাজার টাকা। দুইজন অংশগ্রহণ করলে ১৩ হাজার টাকা লাগবে। দুইদিনের প্রোগ্রামে আনুষঙ্গিক আরও খরচ মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা হয়তো খরচ করতে হবে। কিন্তু এর অর্ধেক টাকা খরচ করে যদি কোনো গরীব আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়া যায়, তাহলে তারা অত্যন্ত খুশি হতেন, সম্পর্কটাও ভালো হতো এবং সে আত্মীয়েরও উপকার হতো। কিন্তু এটা আমরা করছিনা, কেউ কেউ হয়তোবা অবশ্যই করছেন।
আমাদের ইসলাম ধর্মেও আছে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। সম্পর্কগুলোর মধ্যে দূরত্ব আসায়, মানুষ এখন একাকিত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থ-বিত্ত সবই আছে, তারপরও সেখানে প্রাণ নেই। ভালো অবস্থানে থেকে একজন আত্মীয় যদি অন্য একজন আত্মীয়ের বাড়িতে যায়, সেক্ষেত্রে গরীব আত্মীয়ের মধ্যে একটা পজিটিভ প্রভাবও পড়তে পারে। মনের মধ্যে একটা বাসনা তৈরি হতে পারে যে, আমাদেরও ভালোকিছু করতে হবে।
আত্মীয়দের সাথে আগের সম্পর্কগুলো ছিল ন্যাচারাল। এখনকার সম্পর্ক অনেকটাই কৃত্রিম (আর্টিফিশিয়াল), মেকি। সম্পর্কে কোনো প্রাণ নেই। আছে লোক দেখানো আবহ। সম্পর্ক রাখার জন্যই অনেকটা রাখা। দেওয়া-নেওয়ার উপর সম্পর্কগুলো গড়ে উঠছে। যেমন আমি তার জন্য করলে, আমি কী পাব। পাওয়া না পাওয়ার বিষয়গুলো ঢুকে পড়েছে। সম্পর্কে ঢুকে পড়েছে পুঁজিবাদ। আগে মায়ের বোনকে খালা, বাবার বোনকে ফুফু, বাবার ভাইকে কাকা বা চাচা বলা হতো। এখন সে জায়গায় চলে আসছে আংকেল আর আন্টি। এ সম্পর্কে কোনো প্রাণ নেই। মাটির টান নেই।
এখন দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা চলে। মান সম্মানের বিষয়টা চলে আসছে। দেওয়া-নেওয়া এবং প্রতিযোগিতার চাপায় পড়ে সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে। যাদের অর্থ-বিত্ত কম, অর্থবিত্ত যাদের একটু ভালো; তারা সেখানে যেতে পারছেন না অর্থের কথা চিন্তা করে।
এখন সব জায়গায় মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। নিজেকে নিয়েই বেশি ভাবছে। আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশি কেমন আছে, সেটা দেখার সময় আমাদের অনেকেরই নেই। ব্যক্তি নিজের সাথে এমন প্রতিযোগিতায় লিপ্ত যে, আমাকে আরও ভালো থাকতে হবে, আরও ভালোকিছু করতে হবে। অসুস্থ্য এক প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা প্রতিনিয়ত। অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার কোনো সময় নেই। তাই অসুস্থ্য প্রতিযোগিতাকে লাগাম ধরে আত্মীয়তার সম্পর্কগুলোর দিকে যত্নবান হওয়া দরকার।
লেখক
মো. বাবুল হোসেন
উপপরিচালক (জনসংযোগ)
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।