তখন ঘোর অন্ধকার। ফ্যাসিবাদী শাসকের দমন-পীড়ন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। খুনি হাসিনা পরিণত হয়েছেন এক সাক্ষাৎ দানবে। কেউ কথা বলছে না। সবাই চুপ। ২০০৯ সালে পাতানো নির্বাচনে ক্ষমতায় আদিষ্ট হয়ে স্বৈরাচার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। দেশের মানুষের মতামতকে তোয়াক্কা না করে দিল্লির ইশারায় আর যোগসাজশে সংবিধান সংশোধন করে গুঁড়িয়ে দেন নির্বাচনব্যবস্থা। ২০১৪ সালে তামাশার নির্বাচনের মাধ্যমে টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতা দখল করেন হাসিনা। পরিপূর্ণ স্বৈরাচার আর ফ্যাসিস্ট হওয়ার পথে শুরু হয় তার কালোযাত্রা।
বিজ্ঞাপন
ফ্যাসিজম আর ইভিল রেজিম তৈরি করতে দরকার হয় খুনের। হাসিনা ক্ষমতায় আরোহণ করেই হরর সিনেমার চরিত্রের মতো রক্ত পান শুরু করেন। ক্ষমতায় বসার ৫০ দিনের মাথায় তিনি পিলখানায় বসান তার হায়েনা-নখর। দিল্লির পরিকল্পনায় পিলখানায় হাসিনা হত্যা করেন দেশপ্রেমিক ৫৭ সেনা অফিসারকে। ড্রাকুলা হাসিনা সেই থেকে শুরু করেন তার খুনে রাজত্ব। একদিকে ক্রসফায়ার করে হত্যা, গুম করে হত্যা এবং পাশাপাশি চালাতে থাকেন বিচারিক হত্যা। পুরো দুনিয়ার সব মানবাধিকার প্রশ্নকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দিল্লির পাপেট হাসিনা ছয়জন শীর্ষ স্থানীয় রাজনীতিবিদকে বিচারের নামে হত্যা করেন।
খুন করতে করতে হাসিনার সামনে আসে ২০১৮। ইভিলরা একইভাবে প্রসেস করতে করতে বিরক্ত হয়ে পড়ে । তারা নতুন নতুন পন্থায় আরো বড় ইভিল হয়ে ওঠে। হাসিনা ২০১৮ সালের নির্বাচনে নিয়ে আসেন নতুন ফর্মুলা। আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দল বিএনপি এবং তার জোটকে হাসিনার অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করার নীলনকশা ফাঁদেন। তাতে সফল হন হাসিনা। বেগম খালেদা জিয়া জেলে বন্দি থাকেন, আর তার দল বিএনপি ড. কামালের পেছনে নির্বাচনে আসে। পাকাপোক্ত হয় হাসিনার ফ্যাসিজমের রাস্তা। হাসিনা বিএনপি এবং তার জোটকে উপহার দেন উপহাস।
এরপর সব ঠান্ডা হয়ে যায়। মানুষ নিমজ্জিত হয় অন্ধকারে। গলায় পরে পরাধীনতার রশি। আর সেই পরাধীনতার বুদবুদের ওপর বসে কেউ কেউ যাপন করতে চায় আয়েশের জীবন। কিন্তু এভাবে চলে না দুনিয়া। পৃথিবীর ইতিহাস নির্ঝঞ্ঝাট পরাধীনতারই নয় কেবল; এর ইতিহাস লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সন্তান হয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনা আর তার প্রভু দিল্লির মসনদের সামনে সটান দাঁড়িয়ে যান বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ। মাত্র ২১ বছর বয়সি আবরার ফাহাদ উপর্যুপরি প্রশ্ন নিয়ে হাজির হন হাসিনা রেজিমের সামনে। ফেনী নদীর পানির হিস্যা আর পদ্মার ইলিশ নিয়ে আবরার প্রশ্ন তোলেন; প্রশ্নই তোলেন কেবল, এর বেশি কিছু নয়। আর তাতেই আঁতে ঘা লাগে খুনি হাসিনার পোষা সন্ত্রাসীদের। তারা রাতের আঁধারে আবরার ফাহাদকে হত্যা করে। সারা রাত নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে ইতিহাসের এই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। আবরার ফাহাদ সেই নক্ষত্র, যিনি কি না বলে গিয়েছিলেন—‘অনন্ত মহাকালে মোর যাত্রা অসীম মহাকাশের অন্তে।’ আবরার ফাহাদ সেই মহাকাল আর মহাকাশের নক্ষত্র হয়ে বিদায় নেন।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আবরার ফাহাদ যেন এক উচ্ছ্বসিত সাহসের সাইরেন—যেন এখনই ঘুম ভেঙে উঠতে হবে, এখনই। সেই সাইরেনে ঘুম ভাঙে পুরো জাতির। ঢাকাসহ সারা দেশ ফুঁসে ওঠে। আবরার ফাহাদের নামে ওঠে রোনাজারি। দিল্লির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এ দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা জেগে ওঠে। মানুষ প্রশ্ন করতে থাকে—‘আমার ফেনী নদীর পানি কই? আমার পদ্মার ইলিশ যায় কই? আমার বোন ফেলানী কই? আমার শাকিল গুলজার কই?’ ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভিত নড়ে ওঠে। বাংলাদেশের আকাশে উদিত হন শত শত নক্ষত্র-আবরার। অঙ্কুরিত হয় বিপ্লবের বীজ। টুংটাং আওয়াজ আসতে থাকে গৃহকোণ থেকে। কোথা থেকে যেন একটা উদ্দাম হাওয়ার ঘ্রাণ আসতে থাকে। কে যেন দূরে কোথাও বসে বাজান ঘুম-ভাঙানিয়া বাঁশি! তিনি আর কেউ নন, শহীদ আবরার ফাহাদ, যার নামে ঢাকার ছাত্র-যুবা শপথ নেন—‘এ শিকল ভাঙতে হবে,’ যার নামে রংপুরে দুহাত প্রসারিত করার প্র্যাকটিস করেন শহীদ আবু সাঈদ!
সময় বয়ে যায়। হাসিনা আরো একবার একটা ডামি নির্বাচন করে ক্ষমতা পোক্ত করেন। তবে কি আবরারের রক্ত বৃথা যাবে? তবে কি আমার ফেনী নদী মরুভূমি হবে? তবে কি আমার বোন ফেলানীর রক্ত ভুলে যাব? না। আবরার ফাহাদ নামটা গিলে সুস্থ থাকতে পারেন না হাসিনা। এ সম্ভব নয়। তার শুরু হয় ক্ষমতার উদ্গিরণ। মানুষ আবার জেগে ওঠে। জেগে ওঠে সারা বাংলাদেশ। আসে চব্বিশের জুলাই। ৩৬ দিনের এক প্রলয়ংকরী গণবিপ্লবে দিল্লির দাসী পালিয়ে আশ্রয় নেন দিল্লিতেই। মানুষ বুঝে নেয় বাংলাদেশ; শহীদ আবরার ফাহাদের বাংলাদেশ।
লেখক:আবদুস সামাদ রাজু
কবি ও রাজনীতি বিশ্লেষক