Image description

মাহমুদুর রহমান

গত সপ্তাহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি টাঙানোকে কেন্দ্র করে সেখানে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। ছাত্রদলের প্রতিবাদ থেকে ঘটনা শুরু হয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাওয়া পক্বকেশ এক ছাত্রের ‘অসীম বীরত্বের’ সঙ্গে জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা পর্যন্ত বিবাদের বিস্তৃতি ঘটেছে।

পাঠক আবার ভাববেন না যে, ব্রিটিশ শাসিত উপমহাদেশে এই অঞ্চলসহ ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বকারী সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা জিন্নাহকে অসম্মানের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে চেয়েছেন।

বরং রাগান্বিত জাতীয়তাবাদী কর্তৃপক্ষের ঘোষণায় যারা ছবি ডাকসুতে টাঙিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। ‘ফেইক’ কি না বলতে পারব না, তবে ইউটিউবে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো এক ইমারতের মেঝেতে জিন্নাহ এবং গোলাম আযমের ছবি রেখে তার ওপর দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা হেঁটে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এহেন ‘অচ্ছুৎ’ জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রদল বলেছে, ‘১৯৪৮ সালে তৎকালীন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার জিন্নাহর ঔদ্ধত্যপূর্ণ উক্তির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ যেভাবে গর্জে উঠেছিল, ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল চেতনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে যেকোনো অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।’

 

ছাত্রদলের বিবৃতিতে উর্দু শব্দের আগে ‘তৎকালীন’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার অর্থ আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। যেহেতু উর্দু জানি না তাই ১৯৪৮ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে এসে পাকিস্তানি এবং ভারতীয় ভাষাটা কতটা সমকালীন হয়ে উঠেছে তাও আমার জানা নেই। নাকি ছাত্রদলের চেতনায় তৎকালীন উর্দু পরিত্যাজ্য হলেও এখনকার উর্দু গ্রহণযোগ্য? তবে নব্য বিএনপিতে দলীয় ছাত্র সংগঠনটি যে ক্রমেই আওয়ামী লীগের আদর্শে ‘প্রগতিশীল চেতনায়’ উজ্জীবিত হয়ে উঠছে, সেটা বুঝতে অবশ্য আমাদের কোনো কষ্ট হচ্ছে না। প্রসঙ্গক্রমে, হাসিনার ফ্যাসিস্ট জামানায় হুম্মাম কাদের চৌধুরী (বর্তমানে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য) চট্টগ্রামের জনসভায় ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দেওয়ায় বিএনপির প্রগতিশীল চেতনা যে মারাত্মকভাবে যখম হয়েছিল, সেই ঘটনাটি মনে পড়ল। মৌলবাদী অভিযোগ থেকে বাঁচার অভিপ্রায়ে হুম্মামের ইসলামি স্লোগানটি থেকে দূরে থাকার জন্য দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলের ভাগ্য ভালো বলতে হবে যে তাকে তখন দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। অবাক হওয়ার মতো বিষয় হলো, জিন্নাহর ছবি প্রদর্শিত হলে যে বিশ্ববিদ্যালয় অপবিত্র হয়ে যায় সেখানে গুজরাটের গণহত্যাকারী নরেন্দ্র মোদি বক্তৃতা করলে কোনো প্রতিবাদ উচ্চারিত হয় না। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন এক আজব জায়গা, যেখানে ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় নবাব খাজা সলিমুল্লাহসহ যাদের অসামান্য অবদান ছিল, তাদের অপমান করে যারা সেদিন কথিত ‘ম্লেচ্ছ কৃষকদের’ উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোরতর বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের পূজা করা হয়।

 

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে ছাত্রশিবিরের যারা এই ছবি টাঙানোর অপ্রয়োজনীয় ঝামেলাটি তৈরি করেছেন, তাদের নির্বুদ্ধিতা নিয়ে কিছু কথা বলা আবশ্যক। এই কাজের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ দাবি করেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের প্রস্তাবিত জাতীয় ভাষা নিয়ে জিন্নাহর সেই বহুল আলোচিত বিতর্কিত বক্তব্যের বিষয় উল্লেখ করতে গিয়ে একেবারেই প্রসঙ্গক্রমে তার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তার উপরোক্ত সাফাই থেকে যতটুকু বুঝলাম তিনি বলতে চেয়েছেন, জিন্নাহর বিতর্কিত বক্তৃতার প্রমাণস্বরূপ ওই ছবি তারা ব্যবহার করেছেন। তাকে সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নয়। উল্টো ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ফরহাদ বলেছেন, সরকারি দলের অঙ্গসংগঠন নাকি জিন্নাহকে ‘দায়মুক্তি’ দিতে চায়! ছাত্রশিবির ঠিক জিন্নাহকে কোন অপরাধের দায় দিতে চায় এবং ছাত্রদলই বা কী প্রক্রিয়ায় তাকে দায়মুক্তি দিতে চায়, সেটা এসএম ফরহাদের বক্তব্যে বোঝা গেল না। ফরহাদ কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিন্নাহকে ভিলেন প্রমাণ করার জন্য ছবিটি প্রদর্শন করেছিলেন? তাহলে তো যে ব্যক্তি নাটকীয়ভাবে পাকিস্তানের জাতির পিতার ছবি ছিঁড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিচিতি পেয়েছেন এবং ফরহাদের মধ্যে আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই।

 

জামায়াতের রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে যার বিন্দুমাত্র ধারণা আছে, সে-ই বুঝবে যে ডাকসু নেতার এই বক্তব্য আসলে চিন্তাভাবনা না করে নিজেদের একটি অবিমৃশ্যকারী এবং অপ্রয়োজনীয় কাজ ঢাকার ব্যর্থ এবং অসৎ চেষ্টা মাত্র। এই ইতিহাস অসচেতন বক্তব্য দিয়ে ডাকসু জিএস ফরহাদ খামোখা নিজেও উপমহাদেশের এক প্রধান নেতাকে অপমান করেছেন। কেন যেন জামায়াত সবসময়ই নিজেদের পায়ে কুড়াল মারতে সিদ্ধহস্ত। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ইসলামিস্ট রাজনীতিবিদ ও স্কলার আবুল আলা মওদুদীর সঙ্গে লন্ডনের ব্যারিস্টার সেক্যুলারিস্ট মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কোনোকালেই বিশেষ প্রীতির সম্পর্ক ছিল না। কাজেই এত বছর বাদে জামায়াতের আদর্শভিত্তিক ছাত্রশিবিরের অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে জিন্নাহকে নিয়ে এই অযথা টানাটানির কোনো কারণই আমি খুঁজে পাই না। এবার বাংলাদেশে জিন্নাহবিদ্বেষ নিয়ে মূল আলোচনা শুরু করা যাক। বিএনপি এবং জামায়াত, উভয় দলের নেতাকর্মীদের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রকৃত ইতিহাস জেনে তবেই জিন্নাহর রাজনীতি মূল্যায়নের আহ্বান জানিয়ে আলোচনায় যাচ্ছি। আজকের লেখাটি খানিকটা একাডেমিক করার ইচ্ছায় নিজের মতামত দেওয়ার চেয়ে অন্য লেখক ও রাজনীতিবিদরা জিন্নাহ সম্পর্কে কে কী বলেছেন, সেদিকেই নজর বেশি থাকবে। ইতিহাসের খাতিরেই লেখাটি বেজায় দীর্ঘ করতে হচ্ছে বলে পাঠকের কাছে আগাম ক্ষমা চেয়ে রাখলাম।

 

পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস ভালো করে না জানলে ব্যক্তি ও রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঠিক চেনা যাবে না। পাকিস্তান সৃষ্টির বছরখানেক আগে ১৯৪৬ সালে বোম্বে শহরের দুই নামকরা পার্সি ডাক্তার বুঝতে পেরেছিলেন যে ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং আইনজীবী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আয়ু আর বেশিদিন নেই। ডা. জাল রতন প্যাটেল এবং ডা. জাল দায়েবু জিন্নাহকে পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছিলেন যে তিনি তখনকার মরণব্যাধি যক্ষ্মা রোগে ভয়ংকরভাবে আক্রান্ত হয়েছেন এবং সম্ভবত একেবারেই জীবনের শেষ লগ্নে পৌঁছে গেছেন। ডাক্তাররা আশঙ্কা করলেন, যেকোনো সময় তার জীবনাবসান ঘটে যেতে পারে। সে সময় ভারতীয় মুসলমানদের ১৯০ বছরের গোলামির অবসান হয়ে তাদের জন্য পৃথক স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ত্রিপক্ষীয় (ব্রিটিশ কলোনিয়াল শাসক, মুসলিম লীগ এবং কংগ্রেস) দর-কষাকষি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। সেই দর-কষাকষিতে মুসলমানদের পক্ষে জিন্নাহ প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। মুসলিম লীগের নেতাদের মধ্যে একমাত্র তাকেই ভারতীয় কংগ্রেস এবং ব্রিটিশরা সমীহ করতেন। জিন্নাহর মারাত্মক অসুস্থতার খবর কলোনিয়াল শাসক এবং কংগ্রেস জানতে পারলে উপমহাদেশের মুসলমানদের মুক্তি বাধাগ্রস্ত হতে পারে ধারণা করে জিন্নাহ দুই ডাক্তারকেই অসুখের বিষয়টি গোপন রাখতে অনুরোধ করলেন। উভয় ডাক্তার তার মৃত্যু পর্যন্ত সেই অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন।

 

আমাদের পিতা ও পিতামহরা ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন উপমহাদেশের শেষ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পন্থায় রীতিমতো ভোট দিয়ে মুসলমানপ্রধান পূর্ববঙ্গকে স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ বানিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গে প্রায় সবকটি আসনে জয়লাভ করেছিল। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত এবং পাকিস্তান আমলের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, সম্পাদক এবং লেখক আবুল মনসুর আহমেদ তার রাজনৈতিক ক্ল্যাসিক ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ বইতে পাকিস্তান সৃষ্টি সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ইসলাম রক্ষার জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দরকার ছিল না। ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষার জন্যই এর দরকার ছিল। এখানে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম জাতির স্বার্থের পার্থক্য বুঝিতে হইবে। ইসলাম ধর্মকে দুনিয়ায় টিকাইয়া রাখিতে রাষ্ট্রশক্তির দরকার, একথা যাঁরা বলেন, তাঁরা ইসলামকে ধর্ম হিসাবে ছোট করিয়া দেখেন। ইসলাম ধর্ম হিসাবে নিজের জোরেই বিশ্ব-জগতে প্রচারিত হইয়াছে এবং আজও হইতেছে। নিজের জোরে চিরকাল বাঁচিয়াও থকিবে। অতএব, ইসলাম ধর্ম নয়, ভারতীয় মুসলমানদের রক্ষার জন্যই পাকিস্তানের সৃষ্টি।’ একই বইয়ে আবুল মনসুর আহমেদ আরেক জায়গায় পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে নিজের দেওয়া এক বক্তৃতা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, ‘প্রথমতঃ আমি বলিয়াছিলাম, পাকিস্তান দাবিটা প্রধানতঃ কালচারাল অটোনমির দাবি। বলিয়াছিলাম, রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার চেয়েও কালচারাল অটোনমি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই দিক হইতে পাকিস্তান দাবি শুধু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দাবি নয় এটা গোটা ভারতের কালচারাল মাইনরিটির জাতীয় দাবি।’

 

আজকের কট্টর হিন্দুত্ববাদী ভারতে সংখ্যালঘু মুসলমানদের জীবনধারণের মর্মান্তিক চেষ্টা দেখে যেকোনো চিন্তাশীল পাঠক নিশ্চয়ই আবুল মনসুর আহমেদের সেদিনের লেখার যৌক্তিকতা স্বীকার করবেন। আবুল মনসুর আহমেদ পাকিস্তান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেই শেরে বাংলার কৃষক প্রজা পার্টি ছেড়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব মেনে নিয়ে মুসলিম লীগে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালেই জিন্নাহ যক্ষ্মা রোগে মারা গেলে এবং সেদিন পাকিস্তান আন্দোলন সফল না হলে আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের কথিত অখণ্ড হিন্দু ভারতে কী অবস্থা হতো, সেটা বোঝার জন্য বিজেপির শাসনে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের দিকে তাকালেই চলবে।

 

এই কদিন আগে সেখানে একজন মুসলমান নারী পুলিশ অফিসারকে আসসালামু আলাইকুম এবং ইনশাল্লাহ বলার অপরাধে শাস্তি হিসেবে তাকে কর্মস্থল থেকে বদলি করা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত দরিদ্র মুসলমানদের জোর করে গরুর সামনে প্রণাম করানো হচ্ছে। চরম মুসলমানবিদ্বেষী পার্শ্ববর্তী দেশটিতে সর্বত্র কদিন পরপর মসজিদ ও মাদরাসা ভেঙে ফেলা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আয়োজন ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনে জেতার মোক্ষম কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরপরও বাংলাদেশে এমন মূর্খের অভাব নেই যারা বলবেন, ১৯৪৭ সালে আমাদের বাপ-দাদারা নাকি ভারতের পক্ষে ভোট দিলেই ভালো করতেন। এই শ্রেণির দাদাপ্রেমী বাঙালি মুসলমানদের হীনম্মন্যতা থেকে মুক্তি দেওয়ার উপায় আমার জানা নেই।

 

উপরোক্ত শ্রেণির চমকে যাওয়ার মতো একটা তথ্য দিচ্ছি। বাংলাদেশের সব কিসিমের প্রগতিশীলদের ‘সর্বাধিক শ্রদ্ধেয় দেবতুল্য নেতা’ শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন, ‘অখণ্ড ভারতে যে মুসলমানদের অস্তিত্ব থাকবে না এটা আমি মনপ্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করতাম’ (পৃষ্ঠা ৩৬, সুলভ তৃতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৭, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড)। ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকেই শেখ মুজিব হিন্দুদের অধীনে মুসলমানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সেই ব্যক্তিগত ঘটনাটি তার বই থেকেই উদ্ধৃত করি : ‘একদিনের একটা ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে দিয়েছিল, আজও সেটা ভুলি নাই। আমার এক বন্ধু ছিল ননীকুমার দাস। একসাথে পড়তাম, কাছাকাছি বাসা ছিল, দিনভরই আমাদের বাসায় কাটাত এবং গোপনে আমার সাথে খেত। ও ওর কাকার বাড়িতে থাকত। একদিন ওদের বাড়িতে যাই। ও আমাকে ওদের থাকার ঘরে নিয়ে বসায়। ওর কাকীমাও আমাকে খুব ভালোবাসত। আমি চলে আসার কিছু সময় পরে ননী কাঁদো কাঁদো অবস্থায় আমার বাসায় এসে হাজির। আমি বললাম, ননী কী হয়েছে? ননী আমাকে বলল, তুই আর আমাদের বাসায় যাস না। কারণ, তুই চলে আসার পরে কাকীমা আমাকে খুব বকেছে তোকে ঘরে আনার জন্য এবং সমস্ত ঘর আবার পরিষ্কার করেছে পানি দিয়ে ও আমাকেও ঘর ধুতে বাধ্য করেছে। বললাম, যাব না, তুই আসিস’ (পৃষ্ঠা ২৩)। শেখ মুজিবের প্রতি তার বন্ধু ননীর কাকিমার ‘খুব ভালোবাসার’ বহিঃপ্রকাশ উপরোক্ত বর্ণনা থেকে ঠিকমতো বুঝতে পারিনি! তবে এটা সত্য যে, ভারতে প্রত্যেক মুসলমানকে আজ শেখ মুজিবুর রহমানের মতোই হিন্দু বন্ধু ননীর কাকিমাদের কাছে প্রতিনিয়ত চরমভাবে অপমানিত ও নিগৃহীত হতে হচ্ছে।

 

এবার জিন্নাহর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত বিতর্কিত বক্তব্যে আসা যাক। জিন্নাহ জন্মসূত্রে গুজরাটি ছিলেন এবং কেবল ইংরেজি ও গুজরাটি ভাষা জানতেন। তিনি উর্দু বলতে পারতেন না। সেক্যুলারিস্ট জিন্নাহ যেহেতু ব্যক্তিজীবনে তেমন একটা ধার্মিক ছিলেন না, তাই ধারণা করছি তিনি আরবি ভাষাও জানতেন না। তিনি সচরাচর ইংরেজিতেই কথা বলতেন। পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের জনগণের মাতৃভাষাই উর্দু ছিল না। পাকিস্তানের প্রদেশগুলোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা বাংলা, পাঞ্জাবের পাঞ্জাবি, বেলুচিস্তানের বেলুচি, সিন্ধের সিন্ধি এবং নর্থ ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার প্রভিন্সের ভাষা ছিল পশতু। একটি রাষ্ট্রের একতার জন্য অভিন্ন ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা’ থাকার অপরিহার্যতা অনুভব করে জিন্নাহ ভেবেছিলেন প্রদেশের ভাষা যা-ই হোক না কেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাই তিনি প্রদেশের দাপ্তরিক ভাষা নির্ধারণের অধিকার সেই প্রদেশের জনগণের ইচ্ছার ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দিয়ে কেবল কেন্দ্রের অফিসিয়াল ভাষা উর্দু নির্ধারণ করতে জোর দিয়েছিলেন। জিন্নাহ বাংলা ভাষা সম্পর্কে কোনোরকম বিরূপ মন্তব্য করেননি। ঢাকায় ইংরেজিতে দেওয়া তার সেদিনের একাধিক বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনলেই বিষয়টি বুঝতে পারা যাবে। বহু জাতি ও ভাষার দেশ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর সে দেশের নেতারাও অনুরূপ চিন্তা থেকে হিন্দিকে ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাংকা’ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু বাধাবিপত্তি পেরিয়ে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

 

পশ্চিম পাকিস্তানের সব প্রদেশ রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে জিন্নাহর প্রস্তাব মেনে নিলেও পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মানেননি। এবং এখান থেকেই পাকিস্তানের ভাঙনেরও সূত্রপাত হয়েছিল। হিন্দি নিয়ে দক্ষিণ ভারত বিশেষ করে তামিল জনগোষ্ঠীর বিদ্রোহ শুরু হলেও সেটা পাকিস্তানের মতো বিভক্তি পর্যন্ত যায়নি। সালাম, রফিকরা বাংলা ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে জীবন দিয়েছিলেন। অপরদিকে ১৯৬৫ সালে তৎকালীন মাদ্রাজ এবং আজকের তামিলনাড়ুতে হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে চিন্নাস্বামী নামে এক যুবক গায়ে আগুন দিয়ে আত্মাহুতি দিলে সেখানেও ভাষা আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছিল। বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন। এতদসত্ত্বেও, ভারতের অখণ্ডতা বিঘ্নিত হয়নি। একইভাবে, জাতি, ভাষা ও ধর্মগত বিভেদে শ্রীলঙ্কায় সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সিংহলি এবং সংখ্যালঘু হিন্দু তামিলদের মধ্যে কয়েক দশক ধরে গৃহযুদ্ধ চললেও রাষ্ট্র টিকে গেছে।

 

প্রায় একই প্রকৃতির বিবাদে ভারত এবং শ্রীলঙ্কা ভাঙন এড়াতে পারলেও পাকিস্তান কেন দ্বিখণ্ডিত হলো, তার খানিকটা ব্যাখ্যা আমার ইংরেজিতে লেখা বই ‘The Rise and Challenges of Indian Hegemon in South Asia’-তে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। উৎসাহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন। যাহোক, আজকের মন্তব্য প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির মতো এত ব্যাপক বিষয় বাদ দিয়ে আমি কেবল জিন্নাহবিদ্বেষের আলোচনাতেই লেখা সীমিত রাখছি।

১৯৪৮ সালে ঢাকা সফরকালে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে জিন্নাহর বক্তব্যকে আবুল মনসুর আহমেদ পীড়াদায়ক বলে মন্তব্য করেছেন। তার লেখা থেকেই উদ্ধৃত করছি : ‘কায়েদে আযমের আর যে কথাটি আমাকে পীড়া দিয়াছিল, তা বাংলা ভাষা সম্পর্কে তাঁর ঢাকার বক্তৃতা। পঁচিশ বছর ধরিয়া জিন্নাহ সাহেবকে চিনিতাম। এই পঁচিশ বছরের মধ্যে মাত্র পাঁচ বছর তাঁর বিরোধী ছিলাম। বাকী কুড়ি বছরই তাঁর সমর্থক ছিলাম। তাঁর মুখে এমন গুরুতর ব্যাপারে এমন অবিবেচকের কথা আশা করি নাই। তিনি বাংলা বা উর্দু কোনো ভাষাই জানিতেন না। তবে এটা তিনি জানিতেন যে বাংলা অধিকাংশ পাকিস্তানীর মাতৃভাষা। আর জানিতেন তিনি গণতন্ত্রে মাতৃভাষার তাৎপর্য। কাজেই কায়েদে আযমের মুখে মাত্র একবারের মতো ঐ গণতন্ত্রবিরোধী কথার মানে আমি আজও উপলব্ধি করি নাই।’ অতএব, এটা নিয়ে আজ আর কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই যে, জিন্নাহর ১৯৪৮ সালের বক্তব্য এক বিরাট রাজনৈতিক ভুল ছিল, যার পরিণতিতে ২৩ বছর পরে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল।

অধিকাংশ পাঠক হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন যে, জিন্নাহ যেহেতু ১৯৪৮ সালে ইন্তেকাল করেছিলেন, তাই ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে প্রাদেশিক পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার দায় তার ওপর চাপানোর কোনো যুক্তি নেই। তাহলে জিন্নাহর প্রতি বাংলাদেশের জনগণের একাংশের কেন এত তীব্র বিদ্বেষ? ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ অথবা শেখ মুজিবুর রহমানের বয়ানে জিন্নাহবিরোধী কোনো প্রচারণা খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার পর থেকেই এই উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদ্বেষ ক্রমেই বিস্তার লাভ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের নাম পরিবর্তন করে ব্রিটিশ উপনিবেশকালের ভারতীয় মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা জিন্নাহর জায়গায় কট্টর হিন্দু সূর্য সেনের নাম বসানো হয়েছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের নায়ক সূর্য সেন অবশ্যই ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব।

 

কিন্তু সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে, তিনি একজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী ছিলেন। হিন্দু দেবতা কালীর মন্দিরে নিজের রক্ত দিয়ে পূজা করে তবেই তার দলে প্রবেশ করতে হতো। তার কাছে বিদেশিদের হাত থেকে ভারতমাতার মুক্তির অর্থ ছিল উপমহাদেশে হিন্দুর শাসন। আর অপরদিকে জিন্নাহ ভারতের স্বাধীনতার পাশাপাশি সংখ্যালঘু মুসলমানের মুক্তিও চেয়েছিলেন। সুতরাং আমাদের প্রণিধান করা উচিত কেন স্বাধীনতা-পরবর্তী ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধানতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেক্যুলার চিন্তাধারার মুসলমান জিন্নাহর জায়গায় ধর্মীয় হিন্দু চরমপন্থি সূর্য সেনের নাম স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। রাষ্ট্রভাষা বিষয়ক এক বক্তৃতার জন্য বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছ থেকে এতখানি ঘৃণা কি আসলেই জিন্নাহর প্রাপ্য? নাকি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাঙালি মুসলমানের ইসলামসংশ্লিষ্ট আত্মপরিচয় ক্রমশ লঘু করে দেওয়ার প্রক্রিয়ার সুদূরপ্রসারী অংশ হিসেবেই এদেশে জিন্নাহবিদ্বেষ এভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে? ভারতের কট্টরপন্থি জনগণ যে কারণে তাকে ঘৃণা করে, সে জন্য তো আমাদের জিন্নাহকে বরং শ্রদ্ধা করার কথা ছিল। সেখানকার শাসকশ্রেণি এবং হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠী ভারত ভাগ করে মুসলমানের আবাসভূমি পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য প্রধানত জিন্নাহকে দায়ী করার কারণে তাকে প্রবলভাবে ঘৃণা করে।

 

তাহলে কি এদেশের এসব অতি মাত্রায় জিন্নাহবিদ্বেষীরাও হিন্দুত্ববাদীদের মতো অখণ্ড ভারত তত্ত্বে বিশ্বাস করেন? সেক্ষেত্রে ভারতের প্রমাণিত দালাল ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে বর্তমানের এই প্রগতিশীল চেতনাজীবীদের মধ্যে আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। বর্তমান সূর্য সেন হলের সিঁড়িতে জিন্নাহর ছবি রেখে তার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার কুবুদ্ধি কোন ছাত্র সংগঠনের মাথা থেকে বের হয়েছে, সেটা আমার জানা নেই। যারা এমন দুষ্কর্ম করেছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে জিন্নাহ বিরোধিতার সঙ্গে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টিরও বিরোধিতা করেছেন। ছাত্রদল এই ‘বীরত্বের’ কৃতিত্ব দাবি না করলেও নিন্দাও করেনি। ডাকসু থেকেও কোনো প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়নি। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন সফল না হলে আজ বাংলাদেশ নামে কোনো স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতো না, এই সত্য যারা মানেন না তারা আসলে পূর্ববঙ্গকে ‘ভারতমাতার’ মধ্যে বিলীন করে দিতে চান।

 

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিতে সাম্প্রতিক সময়ে জামায়াতবিদ্বেষের আবরণে যে প্রগতিশীলতার উত্থান দেখা যাচ্ছে, তাতে করে আদর্শগতভাবে দলটির সঙ্গে ভারতীয় চেতনাপন্থি আওয়ামী লীগ ও বামদের ভেদরেখা বিলুপ্ত হওয়ার উপক্রম ঘটছে। শহীদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি অনুগত দলটির প্রকৃত জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা এ ব্যাপারে হয়তো নেতাকর্মীদের সতর্ক করতে পারেন।

 

উল্লেখ্য, ইতিহাস না জেনে কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তি সম্পর্কে একপেশে ও চরম মতামত একমাত্র গণ্ডমূর্খরাই দিতে পারে। বাংলাদেশের তথাকথিত প্রগতিশীল এবং সুশীল লেখক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা জিন্নাহকে প্রায়ই মুসলমানের ধর্ম পরিচয়কে ব্যবহার করে রাজনীতি করার জন্য অভিযুক্ত করে থাকেন। অন্যদিকে তারা আবার সবাই ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মহা ভক্ত। এই অর্ধশিক্ষিতদের অবগতির জন্য ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশবন্ত সিংয়ের জিন্নাহ এবং গান্ধী সম্পর্কে একটি তুলনামূলক মন্তব্য উদ্ধৃত করা আবশ্যক। যশবন্ত সিং তার ‘Jinnah, India-Partition, Independence’ বইতে ১৯২০ সময়কালের ভারতের রাজনীতি প্রসঙ্গে লিখেছেন : ‘In any event, Gandhi’s leadership at this time had almost an entirely religiously provincial character, Jinnah, on the other hand was then doubtless imbued by a non-sectarian, nationalistic zeal’ (Page: 102, Rupa & Co, Fifth Impression, 2009). (যেকোনো বিবেচনায়, সেই সময় গান্ধীর একধরনের সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক মফস্বলের চরিত্রের নেতৃত্বের বিপরীতে জিন্নাহর রাজনীতি নিঃসন্দেহে অসাম্প্রদায়িক, জাতীয়তাবাদী চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল।)

মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কে একটি ফায়দা অবশ্য এমন হতে পারে যে, আমাদের তরুণ প্রজন্ম তার সম্পর্কে নতুন করে জানতে উৎসাহ বোধ করবে।

 

একসময় মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খাজা নাজিমুদ্দিন প্রমুখ থেকে শুরু করে শেখ মুজিব পর্যন্ত বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক নেতার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে আবুল মনসুর আহমেদের নিম্নোক্ত মূল্যায়ন উদ্ধৃত করে আজকের দীর্ঘ লেখায় সমাপ্তি টানছি :

‘এই সার্বিক বিভ্রান্তি-বিরোধের অন্ধকার যুগে যে একজন মাত্র লোক বাস্তববাদীর দৃষ্টিকোণ হইতে সকল অবস্থায় হিন্দু-মুসলিম আপোষের কথা বলিয়াছিলেন, তিনি ছিলেন মি. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। তাঁর মৈত্রী প্রচেষ্টার যে বিশেষ দিকটা তৎকালে আমরা বুঝিতে পারি নাই এবং পরবর্তীকালে পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছিল, তা এই যে তিনি শুধু মুসলমানদের অধিকারের কথা বলেন নাই, তাদের দায়িত্বের কথাও বলিয়াছেন। আরও স্পষ্ট ভাষায় বলিতে গেলে বলিতে হয় তিনিই একমাত্র মুসলিম নেতা যিনি মুসলমানদের বিদেশমুখিতা হইতে স্বদেশমুখী করিয়াছেন।’