Image description

 

একটি সমাজকে বুঝতে হলে শুধু দেখতে হয় না, সে কী নিয়ে কথা বলছে। কখনো কখনো আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: সে কী নিয়ে কথা বলছে না।

গত কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশের জনপরিসর একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনায় ভারাক্রান্ত। শিশু অপ্রতীমের নির্মম হত্যাকাণ্ড মানুষকে স্তব্ধ করেছে। একটি শিশুর এমন করুণ মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে। সেই আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই সামনে এসেছে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা: সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার। ঘটনাটি নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তসাপেক্ষ; তাই অনুমান, গুজব কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাৎক্ষণিক ‘বিচার’-এর বদলে নিরপেক্ষ তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করাই দায়িত্বশীল আচরণ।

কিন্তু এই শোক, ক্ষোভ, রহস্য ও সামাজিক আলোড়নের মাঝখানে ঘটে গেল আরেকটি ঘটনা, যার প্রভাব কোনো একটি পরিবার বা নির্বাচনী এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারের রান্নাঘর, যাতায়াত, কৃষি, উৎপাদন ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে পৌঁছে যেতে পারে।

এক লাফে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

সংখ্যাটি আপাতদৃষ্টিতে ‘২০ টাকা’। কিন্তু অর্থনীতিতে ২০ টাকা শুধু ২০ টাকা নয়। ডিজেলের ক্ষেত্রে এই বৃদ্ধি প্রায় ১৭ শতাংশ। ডিজেল আমাদের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালনের সঙ্গে যুক্ত: বাস-ট্রাক চলে, পণ্য পরিবাহিত হয়, কৃষিযন্ত্র চলে, সেচ হয়, জেনারেটর চলে। ফলে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পেট্রোলপাম্পে থেমে থাকে না। এটি ধীরে ধীরে পরিবহন ভাড়া, কৃষি উৎপাদন, শিল্পের logistics cost এবং শেষ পর্যন্ত চাল-ডাল-সবজি থেকে শুরু করে প্রায় সব পণ্যের মূল্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে।

অর্থাৎ, জ্বালানির দাম বাড়ে লিটারে; কিন্তু তার প্রভাব বা অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অর্থনীতিতে।

এখানেই মনে পড়ে কানাডীয় লেখক Naomi Klein-এর বহুল আলোচিত The Shock Doctrine এবং তাঁর ‘disaster capitalism’ ধারণাটি।

Klein দেখিয়েছেন, বড় ধরনের সংকট, যুদ্ধ, দুর্যোগ কিংবা collective shock কেবল মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে না; এগুলো কখনো কখনো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ পরিবেশও তৈরি করে। মানুষ যখন শোকাহত, আতঙ্কিত কিংবা অন্য কোনো নাটকীয় ঘটনায় নিমগ্ন থাকে, তখন এমন কিছু নীতিগত পরিবর্তন তুলনামূলক কম জনপর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে পারে, যা স্বাভাবিক সময়ে অনেক বেশি প্রশ্ন, বিতর্ক ও প্রতিরোধের মুখোমুখি হতো।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘disaster capitalism’ বলে ঘোষণা করা অবশ্যই তাড়াহুড়া হবে। অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড কিংবা মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কোনো পরিকল্পিত সম্পর্ক আছে, এমন দাবি করার মতো কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। এমন দাবি করাও দায়িত্বশীল হবে না।

বরং সরকারের সামনে বাস্তব অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির অভিঘাত বাংলাদেশকেও বহন করতে হচ্ছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারের এই চাপ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনও বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছে। মূল্যবৃদ্ধিকে তাই সরকার লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামলানো এবং সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।

এই যুক্তিগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।

কিন্তু অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা কোনো সিদ্ধান্তকে জনজবাবদিহির ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না।

বরং এখান থেকেই প্রশ্ন শুরু হওয়া উচিত।

কেন একসঙ্গে ২০ টাকা? মূল্য নির্ধারণের পূর্ণ হিসাবটি কোথায়? আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য কমলে একই গতিতে দেশীয় বাজারে দাম কমবে কি? নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর অতিরিক্ত বোঝা কমাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কৃষকের সেচ ও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে খাদ্যমূল্যের ওপর তার অভিঘাত কীভাবে সামাল দেওয়া হবে? পরিবহন মালিকেরা যেন জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধির অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে না পারেন, তার তদারকিই বা কোথায়?

কিন্তু এর চেয়েও বড় একটি প্রশ্ন আছে: 

এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আমরা কতটা কথা বলছি?

এখানেই ‘disaster capitalism’-এর পাশাপাশি আরেকটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—politics of attention বা মনোযোগের রাজনীতি।

মানুষের মনোযোগ সীমাহীন নয়। একটি সমাজ একই সময়ে অসংখ্য বিষয়ে সমান মাত্রায় মনোযোগ দিতে পারে না। ডিজিটাল যুগে এই সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট। Facebook, YouTube, TikTok এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের algorithm স্বভাবতই এমন বিষয়কে সামনে নিয়ে আসে, যেখানে emotion বেশি: মৃত্যু, অপরাধ, কেলেঙ্কারি, রহস্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সংঘাত।

ফলে একটি ব্যক্তিগত tragedy মুহূর্তের মধ্যে জাতীয় spectacle-এ পরিণত হতে পারে।

আমরা ভিডিও দেখি। স্ক্রিনশট খুঁজি। কে কার সঙ্গে কথা বলেছেন তা বিশ্লেষণ করি। কার চরিত্র কেমন ছিল তার বিচার করি। পুলিশি তদন্ত কিংবা আদালতের বিচার শেষ হওয়ার বহু আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা রায় দিয়ে দিই।

ঠিক তখনই হয়তো এমন একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়ে যায়, যা কোটি মানুষের পকেট, বাজার ও ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রভাবিত করবে।

কিন্তু সেটি আমাদের newsfeed-এ একই মাত্রার emotion তৈরি করে না।

এটাই আধুনিক জনপরিসরের একটি গভীর paradox:

যে ঘটনা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান, সেটিই সবসময় সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়; আবার যে সিদ্ধান্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটিই সবসময় সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান নয়।

অপ্রতীমের হত্যাকাণ্ড ভয়াবহ। তার হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। মরিয়মের মৃত্যুও অত্যন্ত মর্মান্তিক। তাঁর মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

কিন্তু একটি শিশুর হত্যার বিচার চাওয়া এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরস্পরবিরোধী নয়। মরিয়মের মৃত্যুর সত্য জানতে চাওয়া এবং সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি দাবি করাও পরস্পরবিরোধী নয়।

একজন সচেতন নাগরিকের মনোযোগের পরিধি এত সংকীর্ণ হতে পারে না যে একটি ঘটনা দেখলে আরেকটি অদৃশ্য হয়ে যাবে।

বরং আমাদের একই সঙ্গে অপরাধের বিচার চাইতে হবে, রহস্যজনক মৃত্যুর সত্য উদ্‌ঘাটন চাইতে হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোকেও কঠোর জনপর্যালোচনার মধ্যে রাখতে হবে।

কারণ জ্বালানির দাম শুধু জ্বালানির দাম নয়।

এটি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়।
এটি শ্রমিকের বাসভাড়া।
এটি মধ্যবিত্তের মাসিক বাজেট।
এটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পরিবহন খরচ।
এটি শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের বাজারের ব্যাগে চাল, ডাল, মাছ ও সবজির দাম।

এই কারণেই সরকারের উচিত মূল্যবৃদ্ধির formula জনসমক্ষে পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করা। কত দামে জ্বালানি আমদানি হচ্ছে, কর ও শুল্ক কত, BPC-এর পরিচালন ব্যয় কত, প্রতি লিটারে প্রকৃত লোকসান কত—এসব তথ্য নাগরিকদের জানার অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে নিম্ন-আয়ের মানুষ, কৃষক ও গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের ওপর সম্ভাব্য অভিঘাত কমানোর উপায়ও জনআলোচনায় আসা দরকার।

কিন্তু নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও আত্মজিজ্ঞাসার জায়গা আছে।

আমাদের মনোযোগের agenda কে ঠিক করছে?

কেন আমরা structural issue-এর চেয়ে scandal-এ বেশি আকৃষ্ট হই? কেন কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি জানতে আমরা উদ্‌গ্রীব, অথচ এমন একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের হিসাব জানতে ততটা আগ্রহী নই, যা আগামী মাসেই আমাদের নিজেদের পরিবারের বাজেট বদলে দিতে পারে?

Naomi Klein-এর শিক্ষা তাই কেবল সরকারকে সন্দেহ করা নয়। আরও গভীর শিক্ষা হলো: সংকটের মুহূর্তে নাগরিকের অন্যতম বড় দায়িত্ব নিজের মনোযোগকে সচেতন রাখা।

গণতান্ত্রিক জবাবদিহির সবচেয়ে বড় শত্রু সবসময় সেন্সরশিপ নয়। কখনো কখনো তথ্য আমাদের চোখের সামনেই থাকে; কিন্তু আমরা অন্যদিকে তাকিয়ে থাকি।

অপ্রতীমের জন্য ন্যায়বিচার চাই।

মরিয়মের মৃত্যুর সত্য জানতে চাই।

একই সঙ্গে জ্বালানির লিটারে ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির পূর্ণ হিসাবও চাই।

কারণ শোক আমাদের প্রশ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না। বরং শোক, উত্তেজনা ও তথ্যের কোলাহলের মধ্যেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ধরে রাখার ক্ষমতাই একটি সচেতন নাগরিক সমাজের পরীক্ষা।

তাই আজ বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু: 

“আমরা কী দেখছি?”

নয়।

তার চেয়েও জরুরি প্রশ্ন: 

“যখন আমরা সবাই ওদিকে তাকিয়ে আছি, তখন এদিকে কী ঘটে যাচ্ছে?”

লেখক: সমাজবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নানইয়াং টেকনোলোজিকাল ইউনিভার্সিটি সিংগাপুর।