আহসান হাবিব মারুফ
‘কী রে জন্তু-জানোয়ারেরা, তোরা মানুষ হবি না?’
গণপতি স্যারের নিয়মিত ডায়লগ ছিল এটা। রংপুর জিলা স্কুলে আমাদের প্রথম অভিভাবক ছিলেন গণপতি স্যার, আমাদের প্রথম ক্লাস টিচার। খুব সাধারণ একজন মানুষ। নিরীহ, মাটির মানুষ। ক্লাস থ্রিতে স্যারের মুখে শোনা সেই কথাটা এত বছর পরও কানে বাজে।
শেষবার স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল রংপুর মেডিকেলে। দেখা হতেই আদাব দিয়েছিলাম। স্যার হয়তো আমাকে চিনতে পারেননি, কিংবা চিনেছিলেন। আদাবের জবাব দিয়ে সেই চিরচেনা ভঙ্গিতে জানতে চাইলেন, ‘কেমন আছ, কোথায় আছ এখন?’
সেদিন খুব বেশি কথা হয়নি। শেষে স্যারের কাছে দোয়া চেয়ে চলে এসেছিলাম। তখন কে জানত, একজন শৈশবের প্রিয় অভিভাবকের সঙ্গে সেটাই হবে শেষ দেখা।
এরপর শনিবার রাতে খবর পেলাম গণপতি স্যার আর নেই। শুধু স্যার নন, নেই তার পরিবারের অন্য সদস্যরাও। বাড়ির ভেতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কয়েকটি লাশ। যে মানুষটিকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নেমে আসত, সেই মানুষটিকেই তার নিজের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করা হয়েছে। কেউ মানতেই পারছিল না এমন একজন মানুষেরও শত্রু থাকতে পারে।
কী ভয়ংকরভাবে বদলে গেছে আমাদের চারপাশ! একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যিনি সারাজীবন শিশুদের মানুষ করার চেষ্টা করেছেন, শেষ জীবনে নিজের ঘরেও নিরাপদ থাকলেন না। তার পরিবারের মানুষগুলোও নিরাপদ থাকলেন না।
এ ঘটনায় দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যার কথা স্বীকার করেছে। বলা হচ্ছে, স্যারের বাড়ির ছাদে বসে তারা ইয়াবা সেবন করত। স্যার এতে বাধা দিয়েছিলেন। আর সেই বাধা দেওয়াই নাকি তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। কিন্তু যদি পুলিশের এই বক্তব্যই সত্য হয়, তাহলে ঘটনাটি আরও ভয়ংকর।
একজন মানুষ নিজের বাড়ির ছাদে মাদক সেবনের প্রতিবাদ করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। একজন শিক্ষক, একজন প্রবীণ নাগরিক, একজন পরিবারের কর্তার সেই সামান্য প্রতিবাদের মূল্য যদি জীবন দিয়ে দিতে হয়, তাহলে আমরা কোন সমাজে বাস করছি?
আর যদি এর পেছনে মাদকের নেটওয়ার্ক বা আরও কেউ জড়িত থাকে, তাহলে শুধু দুজনকে আটক করেই তদন্ত থেমে গেলে হবে না। কোথা থেকে মাদক আসছে, কারা সরবরাহ করছে, কারা তাদের আশ্রয় দিচ্ছে, কারা এই তরুণদের এমন বেপরোয়া করে তুলছে, এই সবকিছু খুঁজে বের করা দরকার।
এ ছাড়াও কিছু বিষয় অস্বস্তি তৈরি করে। খবরে শুনেছি, স্যারের বাড়ির বিদ্যুতের সংযোগও নাকি বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পুলিশের বর্ণনা যদি সত্যি হয়, তাহলে এই ঘটনাটিও সেই বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার।
আরেকটি বড় খটকার বিষয়, এতগুলো মানুষের হত্যাকাণ্ডের পর এত দ্রুতই ঘটনার একটি ‘নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা’ সামনে চলে এসেছে। প্রথমে ডাকাতির সম্ভাবনা, এরপর ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে হত্যার কারণ এবং ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ডাকাতির নাটক সাজানোর কথা বলা হচ্ছে। অথচ এত বড় একটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে ঘটনাস্থলের আলামত, ফরেনসিক পরীক্ষা, হত্যার সময় ও ঘটনাক্রম মিলিয়ে নিশ্চিত হতে সময় লাগারই কথা। খেজুরের বিচি বা শসার মতো আলামত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দাঁড় করানো যায়; কিন্তু সেগুলো একাই হত্যার পুরো মোটিভ ও ঘটনাক্রমের ব্যাখ্যা হয়ে যায় না।
তাই একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর আগে তদন্তেই পরিষ্কার হওয়া দরকার। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই কোনো একটি ব্যাখ্যায় পৌঁছে যাওয়ার চেয়ে বরং প্রতিটি আলামত ও সম্ভাবনাকে খোলা রেখে সত্যটা বের করে আনা জরুরি। কারণ আমরা শুধু কাউকে আটক হতে দেখতে চাই না। আমরা জানতে চাই, গণপতি স্যার ও তার পরিবারের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল। এর পেছনে আসলে কী ছিল। ঘটনার কারণ কী এতটাই ক্ষুদ্র, নাকি এর পেছনে রয়েছে বড় কোনো মোটিভ।
কারণ আজ গণপতি স্যার। কাল কে? এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।
আমরা নিয়মিতই হত্যার খবর পড়ি। এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, কয়েক লাইন পড়ে পরের খবরে চলে যাই। যেসব হত্যার ঘটনায় একটু আলোচনা হয়, সেসব নিয়ে কিছুক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ দেখি, তারপর অন্য কোনো ঘটনায় ব্যস্ত হয়ে যাই। কয়েক দিন পর আবার একটি ঘটনা, এরপর আগের ঘটনাটির কথা আর মনে থাকে না।
কিন্তু নিহত মানুষের পরিবারের কাছে সেটি কোনো ‘খবর’ নয়। সেটি তাদের পুরো জীবন।
গণপতি স্যারের পরিবারের জন্যও এই হত্যাকাণ্ড একটি খবর নয়, এটি পুরো পরিবারের একসঙ্গে হারিয়ে যাওয়া। একটি পরিবারের গল্প হঠাৎ থেমে যাওয়া। হিসাববিজ্ঞানের একজন শিক্ষকের হিসাবের খাতা এভাবেই বন্ধ হয়ে যাওয়া।
আর আমার বা আমার মতো রংপুর জিলা স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে স্যার কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের শিকার একজন মানুষ নন। তিনি আমাদের শৈশবের একজন মানুষ, আমাদের শৈশবের স্মৃতি, আমাদের প্রথম অভিভাবক, আমাদের স্কুলজীবনের গল্পের একজন প্রধান চরিত্র।
তাই এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাওয়ার দাবি শুধু একজন নাগরিকের দাবি নয়। স্যারের একজন সন্তানের দাবি। স্যারের দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। কিন্তু আমরা তো আছি। আমি ও আমার মতো স্যারের অজস্র সন্তানের দাবি এই হত্যাকাণ্ডের বিচার।
আমি চাই, পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের শেষ পর্যন্ত যাক। কারা জড়িত, কেন হত্যা করা হলো, কীভাবে পরিকল্পনা করা হলো। বেরিয়ে আসুক সবটা। কোনো অপরাধী যেন তদন্তের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে।
গণপতি স্যার সারাজীবন মানুষকে মানুষ হওয়ার কথা বলেছেন। তার সেই চিরচেনা প্রশ্নটা আজ যেন আমাদের কাছে ফিরে এসেছে, ‘তোরা মানুষ হবি না?’
আমার মনে হয় স্যারের হত্যাকাণ্ড বা দেশে চলমান অরাজকতার সমাধান করতে না পারলে, আসলে আমরা কেউই মানুষ হব না।
এখন তাই মানুষ না হতে পারার ভয় কাজ করছে মনে। আর প্রশ্ন জাগছে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা কি মানুষের জীবন রক্ষা করতে পারবে না? আমর কি মানুষ হতে পারব না?
একজন শিক্ষক নিজের বাড়িতে নিরাপদে থাকতে পারবেন না, এটা কী মেনে নেওয়া যায়? একজন পরিবারের সদস্যকে হারিয়ে আরেকটি পরিবার সারাজীবন কাঁদবে, এটাকেও কি স্বাভাবিক হিসেবে নেওয়া যায়?
গণপতি স্যারের জন্য বিচার চাই। আমার অভিভাবকের জন্য বিচার চাই। তার পরিবারের জন্য বিচার চাই। আর চাই, রাষ্ট্র যেন আর কোনো গণপতি স্যারকে হারাতে না দেয়।
লেখক : সাংবাদিক