Image description

রাজীব নন্দী

গ্রিক পুরাণের “ট্রোজান হর্স”-এর গল্পটি আজকের ডিজিটাল ট্রল আর্মিকে বোঝার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত উপমাগুলোর একটি। ট্রয়ের মানুষ ভেবেছিল কাঠের ঘোড়াটি একটি উপহার; কিন্তু সেই উপহারের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল ধ্বংসের সৈন্যদল। আজকের সাইবার জগতেও ট্রল আর্মি ঠিক তেমনই কাজ করে। তারা দেশপ্রেম, ধর্ম, জাতীয়তাবাদ কিংবা “জনগণের কণ্ঠস্বর”-এর মোড়কে হাজির হয়; কিন্তু সেই আবেগঘন ভাষার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে ঘৃণা, বিভাজন, অপপ্রচার ও ভয়। মানুষ মনে করে তারা কোনো মতাদর্শকে সমর্থন করছে, অথচ অজান্তেই তারা হয়ে ওঠে ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার বাহক।

ট্রোজান হর্স যেমন শহরের দরজা ভেতর থেকে খুলে দিয়েছিল, তেমনি ট্রল আর্মিও সমাজের ভেতর থেকেই যুক্তি, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক আলোচনার ভিত্তিকে ধ্বংস করে দেয়। তাই সাইবার যুগের সবচেয়ে বড় বিপদ বাইরের আক্রমণ নয়; বরং সেই অদৃশ্য ডিজিটাল ঘোড়া, যাকে আমরা অনেক সময় নিজেরাই স্বাগত জানাই।

কর্তৃত্ববাদী শাসক ও রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে একদিকে জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ও দেশপ্রেমের আবেগ; অন্যদিকে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও সহিংসতার বিষবীজ। এই দুই শক্তিই এখন সবচেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে সাইবার পরিসরে। ফলে রাজনৈতিক সংঘাত আর কেবল রাজপথে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন মানুষের মোবাইল স্ক্রিন, নিউজফিড এবং কমেন্ট বক্সে অবস্থান করছে। বিশ্বজুড়ে সংগঠিত অনলাইন ঘৃণাচর্চার নতুন নাম—ট্রল আর্মি। তারা কেবল কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নয়; বরং ডিজিটাল যুগের এক নতুন ধরনের সৈনিক, যারা তথ্যের বদলে আবেগ, যুক্তির বদলে উন্মাদনা এবং আলোচনার বদলে আক্রমণকে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছে।

সাইবার যুগে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখন আর কেবল সভা-সমাবেশ, পোস্টার বা বক্তৃতার ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা গড়ে উঠছে অনলাইন পরিচয়, অ্যালগরিদমিক উত্তেজনা এবং আবেগনির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে। জাতীয়তাবাদ, ধর্ম ও দেশপ্রেমকে এমনভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে সাধারণ নাগরিকও অজান্তে হয়ে উঠছে একেকটি ডিজিটাল যোদ্ধা। কোথাও সমালোচনা “রাষ্ট্রদ্রোহ” হিসেবে তকমা পাচ্ছে, কোথাও ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে তৈরি করা হচ্ছে “ডিজিটাল শত্রু”। এই নতুন রাজনীতির মূল শক্তি আর তথ্য নয়; বরং তথ্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগ। আর সেই আবেগকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে সংগঠিত ট্রল বাহিনী।

বিশ্বব্যাপী ট্রল আর্মি এখন রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার অন্যতম প্রধান বাহন। তাদের কাজ কেবল সমালোচককে নীরব করা নয়; বরং অনলাইনে এক ধরনের সম্মিলিত ঘৃণার পরিবেশ তৈরি করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র—যেখানে সত্য চাপা পড়ে শব্দের তীব্রতায়, যুক্তি ডুবে যায় চিৎকারে, আর জনমত গঠিত হয় অজ্ঞতা ও উস্কানির ওপর দাঁড়িয়ে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, সংগঠিত বট নেটওয়ার্ক কিংবা উস্কানিমূলক কনটেন্ট—সবকিছু মিলিয়ে ট্রল আর্মি এখন ডিজিটাল জনপরিসরকে সংকুচিত করছে এবং সমাজে ভয়, অবিশ্বাস ও বিভাজনকে গভীর করছে।

সোশ্যাল মিডিয়া স্টাডিজে “ট্রল আর্মি” বলতে বোঝানো হয় এমন একটি সংগঠিত ডিজিটাল গোষ্ঠী, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে অনলাইন আলাপকে দূষিত করে, বিরোধী মতকে আক্রমণ করে এবং জনমতকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক ট্রলরা সাধারণত তিনটি কৌশল ব্যবহার করে—ডিসইনফরমেশন, ভয়ভীতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি। “Predicting the Role of Political Trolls in Social Media” গবেষণায় দেখানো হয়েছে, রাজনৈতিক ট্রলদের কার্যক্রম ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং তারা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয় এবং সামাজিক বিভাজনকে বাড়িয়ে তোলে।

বাংলাদেশের ডিজিটাল রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে “সহমত ভাই” থেকে “আলবটর” হয়ে ওঠার ইতিহাস আসলে অনলাইন রাজনৈতিক আনুগত্যের বিবর্তনের ইতিহাস। ২০১০-এর দশকের শুরুতে ফেসবুকভিত্তিক রাজনৈতিক মতপ্রকাশ জনপ্রিয় হতে শুরু করলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি অন্ধ সমর্থন জানানো একটি দৃশ্যমান অনলাইন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। যে কোনো রাজনৈতিক পোস্ট, বক্তৃতা বা সরকারি সিদ্ধান্তের নিচে প্রশ্নহীন সমর্থন জানিয়ে “সহমত ভাই” মন্তব্য করা ছিল সেই সময়ের একটি বহুল ব্যবহৃত ব্যঙ্গাত্মক প্রতীক। ধীরে ধীরে এই “সহমত ভাই” কেবল একটি ইন্টারনেট মিম বা ঠাট্টা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি এমন এক রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে, যেখানে দলীয় আনুগত্য যুক্তি, সমালোচনা বা তথ্যের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্নমতকে দেশবিরোধী, ধর্মবিরোধী বা ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়তে থাকে।

 

ট্রল আর্মির উত্থান কেবল অনলাইন গালাগালের বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত। নীতিনির্ভর বিতর্কের জায়গায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে চরিত্রহনন, গুজব, ভয়ভীতি এবং ব্যক্তিগত লাঞ্ছনা। সমালোচনা এখন “ষড়যন্ত্র”, আর প্রশ্ন হয়ে উঠছে “রাষ্ট্রবিরোধিতা”।

 

পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমিক বিস্তার, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সংগঠিত ডিজিটাল প্রচারণার কারণে এই সংস্কৃতি আরও আক্রমণাত্মক ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে। ফেক অ্যাকাউন্ট, বট, পেইড ট্রল টিম এবং সমন্বিত কমেন্ট-অপারেশনের মাধ্যমে অনলাইন জনমতকে প্রভাবিত করার নতুন প্রবণতা তৈরি হয়। এই পর্যায়ে সমালোচকরা “আলবটর” শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন—যেখানে “আওয়ামীবিরোধী”, “বট” এবং “ট্রল” সংস্কৃতির সমন্বয়ে এমন এক ডিজিটাল বাহিনীকে বোঝানো হয়, যারা কৃত্রিমভাবে রাজনৈতিক সমর্থনের পরিবেশ তৈরি করে এবং ভিন্নমতকে আক্রমণ করে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক আনুগত্য ধীরে ধীরে মানবিক মতপ্রকাশের জায়গা থেকে সরে গিয়ে স্বয়ংক্রিয়, সমন্বিত এবং অ্যালগরিদম-নির্ভর ডিজিটাল প্রোপাগান্ডায় রূপ নেয়।

এই রূপান্তর দেখায়, বাংলাদেশের অনলাইন রাজনৈতিক সংস্কৃতি কীভাবে “সহমত ভাই”-এর সরল দলীয় সমর্থন থেকে “আলবটর”-এর সংঘবদ্ধ সাইবার যুদ্ধে প্রবেশ করেছে, যেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কেবল মতপ্রকাশের প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং রাজনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে ট্রল সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একাডেমিক গবেষণাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বুশরা আনোয়ার -এর “ট্রল কালচার ইন বাংলাদেশ: এ কেস স্টাডি অন সোশ্যাল মিডিয়া” শীর্ষক গবেষণা, যা জার্নাল অফ ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিতে দেখানো হয়েছে যে, বাংলাদেশের অনলাইন ট্রলিং কেবল “মিম কালচার” বা বিনোদনের অংশ নয়; বরং এটি সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার একটি ডিজিটাল রূপ। মিক্সড মেথড পদ্ধতিতে পরিচালিত এই গবেষণায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটারের বিভিন্ন কনটেন্ট বিশ্লেষণ করে ট্রলদের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক ও সাইবার বুলিংভিত্তিক বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। গবেষণাটি যুক্তি দেয় যে, দলীয় আনুগত্য, অনলাইনের অজ্ঞাত পরিচয়ের নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ বাংলাদেশের ট্রল সংস্কৃতিকে তীব্র করেছে। এর ফলে অনলাইন ঘৃণাচর্চা, মিন ইনফরমেশন এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সামাজিক আচরণে পরিণত হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক মতবিনিময়ের পরিবেশকে সংকুচিত করছে।

এই ট্রল আর্মিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। কারণ ডিজিটাল কর্তৃত্ববাদ এমন এক শাসনব্যবস্থা, যেখানে রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে নাগরিকের মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করে। আধুনিক কর্তৃত্ববাদ আর কেবল কারাগার, পুলিশ বা সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং অ্যালগরিদমিক নজরদারি, অনলাইন সেন্সরশিপ, ইন্টারনেট শাটডাউন এবং সংগঠিত ডিজিটাল হামলার ওপরও নির্ভর করে। ফলে ট্রল আর্মি কেবল কিছু উগ্র সমর্থকের দল নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতার এক অনানুষ্ঠানিক সম্প্রসারণ।

ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা ডিজিটাল ট্রল রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তের আমলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গবেষণা সংস্থা অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুতের্তে সরকারের পক্ষে সংগঠিত “কম্পিউটেশনাল প্রোপাগান্ডা” পরিচালিত হতো, যেখানে পেইড ইনফ্লুয়েন্সার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট এবং সমন্বিত ট্রল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করা হতো। বিশেষ করে মাদকবিরোধী অভিযানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার সমালোচনা উঠলে, অনলাইনে সমালোচকদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি, অপপ্রচার এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ চালানো হয়। সাংবাদিক মারিয়া রেসা দেখিয়েছেন, কীভাবে ফেসবুকভিত্তিক ট্রল বাহিনী ফিলিপাইনে সত্য, সংবাদ ও গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিসরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

রাশিয়াও ডিজিটাল ট্রল রাজনীতির আরেকটি বড় উদাহরণ। সেন্ট পিটার্সবার্গভিত্তিক “ইন্টারনেট রিসার্চ এজেন্সি” দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রপন্থী অনলাইন প্রোপাগান্ডা পরিচালনার অভিযোগে আলোচিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, এই সংগঠনটি ভুয়া সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিভাজন উসকে দেওয়া, ভুয়া তথ্য ছড়ানো এবং আন্তর্জাতিক নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। ২০১৬ সালের মার্কিন নির্বাচনে রুশ ট্রল নেটওয়ার্কের হস্তক্ষেপ নিয়ে হওয়া গবেষণাগুলো দেখায়, তথ্যযুদ্ধ এখন বৈশ্বিক ভূরাজনীতির অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে।

তুরস্কে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের শাসনামলে “একে ট্রলস” নামে পরিচিত সংগঠিত অনলাইন নেটওয়ার্কের উত্থান ঘটে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারপন্থী এই ডিজিটাল গোষ্ঠীগুলো সাংবাদিক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বিরোধী রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অনলাইন হামলা চালায়। তাদের কৌশল ছিল সমালোচকদের দেশবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করা, সামাজিকভাবে হেয় করা এবং ভয়ভীতির সংস্কৃতি তৈরি করা। এর ফলে অনলাইন পরিসরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির অন্যতম লক্ষ্য।

ট্রল আর্মির উত্থান কেবল অনলাইন গালাগালের বিষয় নয়; এটি গণতান্ত্রিক আলোচনার সংস্কৃতির ওপর সরাসরি আঘাত। নীতিনির্ভর বিতর্কের জায়গায় এখন প্রাধান্য পাচ্ছে চরিত্রহনন, গুজব, ভয়ভীতি এবং ব্যক্তিগত লাঞ্ছনা। সমালোচনা এখন “ষড়যন্ত্র”, আর প্রশ্ন হয়ে উঠছে “রাষ্ট্রবিরোধিতা”। ফলে নাগরিকরা ধীরে ধীরে আত্মনিয়ন্ত্রণ শিখছে—চুপ হয়ে যাচ্ছে—এবং গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। ডিজিটাল যুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক এখানেই: এটি মানুষের চিন্তার ভেতরে ভয় ঢুকিয়ে দেয়।

গ্রিক পুরাণে “হাইড্রা” নামে এক দানবের কথা বলা হয়—যার একটি মাথা কেটে ফেললে তার জায়গায় জন্ম নিত আরও বহু মাথা। আজকের ট্রল আর্মিগুলো যেন সেই আধুনিক ডিজিটাল হাইড্রা। একটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট বন্ধ হলে জন্ম নেয় আরও দশটি; একটি অপপ্রচার থামলে ছড়িয়ে পড়ে আরও নতুন বিভ্রান্তি। তারা ব্যক্তিকে নয়, আক্রমণ করে সত্যকে; বিতর্ককে নয়, ধ্বংস করে চিন্তার স্বাধীনতাকে। ফলে সাইবার যুগের এই যুদ্ধ কেবল তথ্যের যুদ্ধ নয়, এটি বাস্তবতা নিয়ন্ত্রণের যুদ্ধ। এখানে অ্যালগরিদম হয়ে ওঠে অস্ত্র, ঘৃণা হয়ে ওঠে প্রোপাগান্ডা, আর নীরবতা হয়ে ওঠে কর্তৃত্ববাদের সবচেয়ে বড় বিজয়। তাই এই ডিজিটাল অন্ধকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জরুরি প্রতিরোধ হলো—সমালোচনামূলক চিন্তা, তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি এবং সত্য বলার নাগরিক সাহসকে বাঁচিয়ে রাখা।

ডিজিটাল যুগে রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল এবং ট্রল বাহিনীর এই অদৃশ্য জোট গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য গভীর হুমকি হয়ে উঠেছে। তথ্যের বিকৃতি, আবেগের রাজনীতি এবং বিভাজনমূলক প্রচারণা গণতন্ত্রকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। এর মোকাবিলায় প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা, প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়বদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক নৈতিকতা। কারণ জনমতকে বিভাজনের মাধ্যমে নয়, বরং যুক্তি, সত্য ও সমালোচনামূলক চিন্তার মাধ্যমে পুনর্গঠন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ে গবেষক