ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন
সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের সরাসরি প্রস্তাবে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর’ (সিএমবিইসি)-এর ধারণাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও ভূ-অর্থনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জন্য যেমন বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে, ঠিক তেমনি এতে জড়িয়ে আছে নানামুখী কৌশলগত হিসাব-নিকাশ।
আপাতদৃষ্টিতে সিএমবিইসি করিডোরকে একটি নতুন উদ্যোগ মনে হলেও এর শেকড় মূলত বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা ‘বিসিআইএম’ (বিসিআইএম) ইকোনমিক করিডরের ধারণার মধ্যেই নিহিত। নানা কারণে বিসিআইএম-এর অগ্রগতি থমকে গেলেও বর্তমান প্রস্তাবটিকে সেই পুরনো উদ্যোগেরই একটি যুগোপযোগী সংস্করণ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়।
যেকোনো ইকোনমিক করিডর যখন আলোর মুখ দেখে, তখন তার সবচেয়ে দৃশ্যমান ও ইতিবাচক প্রভাবটি পড়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর স্থানীয় অর্থনীতিতে। করিডর যেখান থেকে শুরু হয় এবং যেখানে গিয়ে শেষ হয়, তার মধ্যবর্তী সংযুক্ত অঞ্চলগুলোতে অভাবনীয় মাত্রায় অর্থনৈতিক গতিশীলতা তৈরি হয়। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হবে না।
এই করিডরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ‘লিড টাইম’ বা পণ্য পরিবহনের সময় উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসা। পরিবহন ব্যবস্থা সহজ ও দ্রুততর হলে স্বভাবতই পণ্যের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ কমবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্য আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
কেবল বাণিজ্য সম্প্রসারণই নয়, এ ধরনের মেগা কানেক্টিভিটি প্রজেক্টের হাত ধরে দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাবে। চাঙ্গা হবে ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংকিং সেক্টর এবং ত্বরান্বিত হবে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন।
যখনই বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এ ধরনের আন্তঃদেশীয় কানেক্টিভিটির উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই ‘এইড ফর ট্রেড’ নীতিতে আন্তর্জাতিক অর্থায়নও আসতে শুরু করে। চীনের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি)-এর মতো বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই করিডর কেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ আকারের উন্নয়ন অর্থায়নে এগিয়ে আসবে, যা আমাদের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা যায়।
তবে এই করিডর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু ভৌগোলিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চট্টগ্রাম এবং মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চল মূলত পাহাড়ি এলাকা। তাই এই করিডরটি ঠিক কোন পথে বা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সড়কপথে, রেলপথে নাকি নৌপথে—তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল রয়েছে। বাস্তবতা হলো, বিষয়টি এখনো নিবিড় সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির পর্যায়ে রয়েছে। আধুনিক বাণিজ্যের প্রয়োজনে এখানে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হতে হবে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার। কোনো নির্দিষ্ট রুটে ট্রান্সশিপমেন্ট বা কানেক্টিভিটি দেওয়ার আগে বাংলাদেশ তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ফায়দা ও কৌশলগত নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।
ভূ-রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই করিডরের আরেকটি বড় দিক হলো ভারতের অনুপস্থিতি। বিসিআইএম-এ ভারতের অন্তর্ভুক্তি থাকলেও নতুন এই চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডরে আপাতত ভারত নেই। তবে ভূ-অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, এই করিডর যদি ভবিষ্যতে একটি সফল রিজিওনাল ট্রেড হাব বা ট্রান্সপোর্ট হাবে পরিণত হয়, তবে একসময় ভারতকেও এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। সীমান্ত সমস্যা নিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকলেও দেশ দুটির দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য থেমে নেই। অর্থনৈতিক স্বার্থের জায়গায় দেশগুলো বরাবরই বাস্তববাদী।
তা সত্ত্বেও আমাদের অঞ্চলে চীনের কোনো মেগা উদ্যোগ মানেই ভারতের একটি স্বাভাবিক ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগ তৈরি হওয়া। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘ডাইভারসিফিকেশন অব কানেকশন’ বা উন্নয়ন অংশীদারত্বের বহুমুখীকরণ।
বাংলাদেশ কোনো একক দেশের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের বড় প্রকল্পগুলোতে জাপানের মতো পরীক্ষিত বন্ধু যেমন যুক্ত আছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও রয়েছে গভীর বাণিজ্য সম্পর্ক। ‘মাল্টি-ডোনার ট্রাস্ট ফান্ড’ (এমডিটিএফ) মডেলে বিভিন্ন দেশের অর্থায়ন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে তা অনেক বেশি স্বচ্ছ হবে এবং কোনো একক দেশের ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের শঙ্কা দূর হবে। আমাদের মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক নয়, বরং নিটোল অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের বিষয়টি এই করিডরের ক্ষেত্রে একটি অবধারিত প্রশ্ন। অনেকেই মনে করেন, এই মেগা প্রজেক্টের মাধ্যমে চীনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে অর্থনৈতিক করিডর এবং রোহিঙ্গা ইস্যুকে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ট্র্যাকে দেখা উচিত।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাথা ঘামানো বাংলাদেশের কাজ নয়। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে কূটনৈতিক চাপ ও দেনদরবার অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, কানেক্টিভিটিকে দেখতে হবে সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে। এই দুই স্পর্শকাতর ইস্যুকে একে অপরের সঙ্গে জুড়ে দিলে তা কোনোটির জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।
আগামী এক থেকে দেড় দশকে এই করিডরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের। মনে রাখতে হবে, আমাদের বঙ্গোপসাগরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ স্ট্র্যাটেজিক অঞ্চল রয়েছে, যেখানে রয়েছে সম্পদের আহরণ ও ব্যবহারের যথেষ্ট সম্ভাবনা। বাংলাদেশ কখনোই চাইবে না বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতে বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণে জড়াতে। তাই এই করিডরের রূপরেখা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে শতভাগ সুরক্ষিত রাখে।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি হলো ‘কানেক্টিভিটি’। ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন বা প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে সতর্কতার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে, সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশকে সামনের দিকে এগোতে হবে। চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর বা যেকোনো ধরনের উদ্যোগ যা আমাদের অর্থনৈতিক স্বার্থর জন্য জরুরি, আমাদের উচিৎ সেদিকে অগ্রসর হওয়া।
- ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন: রিসার্চ ডিরেক্টর, স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস)