গত ৩ জুলাই 'একাত্তর টিভি' একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম, "প্রায় দেড়শো কোটি টাকা নিয়ে নয়ছয়! ডকুমেন্টারি বানানোর ঠিকানায় মিললো অটোরিক্সা গ্যারেজ!"
প্রতিবেদনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিভিন্ন কার্যক্রমে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে। দ্য ডিসেন্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল। তিনি একটি দীর্ঘ লিখিত প্রতিক্রিয়া পাঠিয়েছেন যা দ্য ডিসেন্ট এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রসঙ্গত, একাত্তর টিভির উল্লিখিত প্রতিবেদনটিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সত্যতা যাচাই করে একটি ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন শিগগিরই প্রকাশ করবে দ্য ডিসেন্ট।
সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর প্রতিক্রিয়া হুবহু নিচে তুলে ধরা হলো:
“৭১ টিভির রিপোর্টটা দেখলাম। নাথিং নিউ। একটা বিশেষ জায়গায় বসে কয়জন লোক রচিত এই চোথা নিয়া আগেও রিপোর্ট হইছে। জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদ জানাইয়া ফ্যাক্ট প্রেজেন্ট করছে, যে প্রতিবাদ কখনো ছাপা হয় নাই। এই রিপোর্টেরও রিবাটাল হয়তো পাঠাবে জাতীয় যাদুঘর, এবং সেই রিবাটালও কোনো ট্র্যাকশন পাবে না।
যেহেতু আমি এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলাম, সেহেতু আমি যা যা জানি সেটা বলা দরকার।
প্রথমেই শিরোনাম। ক্যাপশনটাই এক্সট্রিম ডিসইনফরমেশন। প্রায় দেড়শো কোটি টাকা নিয়ে নয়ছয়! প্রথম কথা, এই পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৩০ কোটি প্রায়, আমি যদি ঠিক মনে করতে পারি। তো এক কলমের ঝটকায় ২০ কোটি বেড়ে গেলো কেমনে?
দ্বিতীয়ত, এই ১৩০ কোটির মধ্যে ৯৬ কোটি খরচ করেছে পূর্ত মন্ত্রণালয়। যেটা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জিটুজি পদ্ধতিতে পূর্ত মন্ত্রণালয়কে দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখানে ফ্রেম করা হয়েছে জাতীয় জাদুঘরকে।
ফলে '১৫০ কোটি টাকা নয়ছয়' বলা থেকেই বোঝা যাচ্ছে এই রিপোর্টের ইনটেনশন।
এবার আসি রিপোর্টে। প্রথমেই একটা রিকশা গ্যারেজ দেখিয়ে গা ছমছম একটা গ্রাউন্ড তৈরি করা হয়েছে যে, দর্শক হিসাবে আমরা একটা কঠিন অপরাধ দেখতে যাচ্ছি।
জ্বি, না ভাই, রিকশা গ্যারেজ জুলাইয়ের সব অসাধারণ ডকুমেন্টারি বানায় নাই। এই কাজগুলো করেছে বাংলাদেশের এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ ইয়াং ফিল্মমেকাররা। অনম বিশ্বাস, কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়, রাকা নোশিন নাওয়ার (যার জুলাই উইমেন লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটিতে দেখানো হচ্ছে কয়দিন পর), মাহাথির স্পন্দন, নাজমুল সূকর্ণ, মোমিন বিশ্বাস, মাহমুদুল হাসান আদনান, শাহরিয়ার সজীব (হাউজ অব কমনসে প্রদর্শিত দীপক কুমার গোস্বামী স্পিকিং যে বানাইছে), নাজমুল নবীন, সাদিয়া ইসলাম রোজা, এবং আরো অনেকে।
এর মধ্যে জাদুঘর ফাইন্যান্স করছে ১৯টা থিমের উপর ৬২টা কনটেন্ট। আর শিল্পকলার ফান্ড থেকে ফাইনান্স করা হইছে জুলাইয়ে আহতদের নিয়ে জুলাই বীরগাঁথা সিরিজ আর জুলাই রিমেমবারেন্স সিরিজ।
রিপোর্টের শুরুতেই একটা ডাহা মিথ্যা কথা বলা হইছে। ‘ইন্টারভিউ নির্ভর দুয়েকটি লম্বা ডকুমেন্টারি বাদে মাত্র চার-পাঁচ মিনিটের প্রতিটি প্রামাণ্যচিত্রের খরচ ধরা হয়েছে সাতাশ লক্ষ টাকা।’
কোন কাজে কত টাকা ডিরেক্টর-প্রোডিউসার পাইছে এটার তালিকা এই রিপোর্টার পাইছেন কিনা আমি জানিনা। না পাইলে উনি উনার কাজটা ঠিকমতো করেন নাই। পাইলে উনি মিথ্যাচার করছেন।
চার-পাঁচ মিনিটের কোনো ডকুমেন্টারির জন্যই ২৭ লক্ষ টাকা খরচ করা হয় নাই। আমি খরচের লিস্ট সংগ্রহ করছি একটু আগে। এই লিস্ট ঐ রিপোর্টারকে জাতীয় জাদুঘর সরবরাহ করার পরও এই ডিজইনফরমেশন ছড়ানো হয়েছে।
তাহলে রিকশা গ্যারেজের ঘটনাটা কী?
জুলাই কোমেমোরেশন প্রোগ্রামের আগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা প্রদান করা হয় এই ডকুমেন্টারিগুলো এবং জাদুঘরের কাজ যতোটা সম্ভব শেষ করে আনার জন্য। এবং সরকার আইন অনুযায়ী সময়ের স্বল্পতার জন্য কাজগুলো ডিপিএম পদ্ধতিতে করার অনুমতি দেয়।
জাতীয় জাদুঘরের উপর দায়িত্ব পড়ে এক মাসের মধ্যে এই কাজগুলো করার। তখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কোয়ালিফায়েড ফিল্মমেকারদের দিয়ে কাজ করানো। যাতে এগুলো টিপিক্যাল সরকারি কাজ মনে না হয়। আপনারা জানেন সরকারি কাজ কেউ দেখেও না। আর আমাদের কাজগুলোর কম্বাইন্ড ভিউ শুধু মাত্র চিফ অ্যাডভাইজার পেজে ১৪৮ মিলিয়নের উপরে।
তো এটা সম্ভব হয়েছে এই ফিল্মমেকারদের জন্যই। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ যখন এদের দিয়ে কাজ করাতে যায় তখন তাদের সামনে চ্যালেন্জ দাঁড়ায় এই ফিল্মমেকাররা কমার্শিয়াল কাজের পদ্ধতিতে অভ্যস্ত। তারা বিজ্ঞাপন বানায়। এজেন্সির কাছ থেকে অ্যাডভান্স পেলে কাজ করে।
তখন জাদুঘর বেশ কয়েকজন লগ্নিকারীকে অ্যাপ্রোচ করে যাতে তারা কাজটা নিয়ে ঐ ফিল্ম মেকারদের দিয়ে ছবিগুলো করায়। কিন্তু বেশিরভাগ লগ্নিকারীই জুলাই নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী না। তারা উসিলা দেখায় পলিটিক্যাল কাজে তারা ঢুকবে না। যদিও তারা সবাই ফ্যাসিবাদি সরকারের সাথে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছে। অ্যানিওয়ে তখন এই ভেন্ডরকে অনুরোধ করলে তারা বিনিয়োগ করতে রাজী হয়। এবং এর বিনিময়ে তারা ৭ শতাংশের মতো ফি-তে কাজ করতে রাজি হয়। সরকারি টেন্ডার ১৫-২০ শতাংশের কম ফি-তে কেউ করে কিনা একটা কন্ট্রাকটরদের সাথে কথা বললেই জানতে পারবেন।
এই রিপোর্টের দায়িত্ব ছিলো দুইটা: কাজটা ঠিকমতো ডেলিভার করা হইছে কিনা দেখা! এবং ফিল্মমেকাররা যতো টাকা পাওয়ার কথা সেটা পেয়েছে কিনা। এর দুইটা উত্তরই যদি হ্যাঁ হয় তাহলে এটা অভিযোগ কেমনে হয়? রিপোর্টার কি এই দুইটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন?
এবার আসি ট্রেড লাইসেন্সের প্রসঙ্গে। আমার ছবিয়ালের ট্রেড লাইসেন্স আমার বাবার বাসার ঠিকানায়। কারন আমি ডিওএইচএস-নিকেতন বিভিন্ন জায়গায় ভাড়া বাসায় অফিস চালাইছি সারা জীবন। এই বছর এখানে, পরের বছর আরেকখানে। তো পারমানেন্ট ঠিকানা হিসাবে বাবার বাসাই দিয়ে রাখছি।
এখন কালকে একটা রিপোর্টার পাঠাইলে সেও তো বলতে পারে, ছবিয়াল একটা ভুয়া প্রতিষ্ঠান। ট্রেড লাইসেন্সের ঠিকানায় গিয়ে দেখা গেলো এখানে এরকম কোনো অফিসই নাই। লে হালুয়া।
এবার আসি, কোনো মেজর কনস্ট্রাকশন (রিপোর্টারের ভাষায়) না করে কিভাবে খরচ হলো এতো টাকা? বেশ সেনসেশনাল প্রশ্ন। কিন্তু এর উত্তর খোঁজার কাজই তো ছিলো রিপোর্টারের। যাবতীয় কনস্ট্রাকশন রিলেটেড কাজ করেছে পূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন গণপূর্ত অধিদপ্তর। তাদের বাজেট অনুযায়ী সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তাদের ৯৬ কোটি টাকা জিটুজি ট্রান্সফার করেছে মাত্র।
তারপরে নাশতার টাকার কথা বলা হয়েছে। এটা তো আর মন্ত্রী পর্যায়ে জানার কথা না। তবে এর আগে এই বিষয়ে প্রশ্ন উঠায় আমি জিজ্ঞেস করে জানতে পারি গড়ে খাওয়া দাওয়ার পিছনে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর বেশি আমার জানার কথা না। রিপোর্টে দেখলাম পিডব্লিউডির এক স্টাফকে ধরে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে, ভাই আপনাদের নাস্তা দেয়? হাহাহা। তাকে নাস্তা কেনো দিবে?
আবার রিপোর্টার সাহেব সম্প্রতি গিয়ে ওখানে কোনো লোক না পেয়ে বেশ সেনসেশনাল কমেন্ট করলেন। কোথাও কোনো লোক নাই। হাহাহা। আদতে গত চার মাস ওখানে মেজর কোনো কাজই হচ্ছে না। যখন মিউজিয়ামের কাজ হতো তখন কখনো কখনো ৭০-৮০ জন লোকও থাকতো। এতো বড় মিউজিয়াম তো নিজে নিজে দাঁড়িয়ে যায়নি।
এবার আরেকটা ডাহা মিথ্যা তথ্য। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হয়েছি বাউন্ডারি ওয়ালের কোনো খরচ জাদুঘর কর্তৃপক্ষ করে নাই। রিপোর্টে পিডব্লিউডির অফিসার রাইটলিই বলেছেন, বাউন্ডারির খরচ তারা করেছেন। তাহলে রিপোর্টার ভাই কিভাবে দাবী করলেন এই ভুয়া খরচ জাদুঘর করেছে?
এবার স্কালপচার। তেজশ হালদার জশ বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ভাস্কর। মিউজিয়ামে তাঁর কাজগুলো নানা দেশের দর্শকরা যারাই দেখেছে, তাঁরাই প্রশংসা করেছে। এই মিউজিয়াম নিয়ে ব্রিটিশ টাইমস, লা মোঁদে, জার্মান টাজ কি লিখেছে গুগল করে দেখে নিতে পারেন। তাকে দিয়ে কাজ করানোর ক্ষেত্রেও একই বিষয়। একজন ভেন্ডার ছাড়া কার কাছ থেকে তেজশকে টাকা অ্যাডভান্স দেবে জাদুঘর?
হাজার বাধার মধ্যেও এই জাদুঘরের কাজ কিভাবে প্রায় শেষের দিকে আসলো- এর উত্তর কেউ খুঁজতে যাবে না। জার্মান সাংবাদিক যেমন বিশ্বাস করেন নাই এটা মাত্র এক বছরে দাঁড়াইছে। সরকারি প্রজেক্টগুলা দেখবেন বছরের পর বছর মেয়াদ বাড়ায় আর খরচ বাড়ায়। এই জাদুঘর সেরকম না হওয়াই বোধ হয় অপরাধ হইছে।
তাই আপনি কোনো প্রশংসা শুনতে পাবেন না জাদুঘর কর্তৃপক্ষ কিংবা তানজিম ওয়াহাবের। শুনবেন শুধু প্রোপাগান্ডা। কারন জুলাই যাদুঘর এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বানানো ডকুমেন্টারিগুলো অনেকের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। তারা কারা তাদের নাম সময় হলেই প্রকাশ করা হবে।”