বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই নতুন মোড়। গতকাল ১৪ জুন রাতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে নয়াদিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েক ঘণ্টা আটকে হয়রানির ঘটনায় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও পরবর্তী সময়ে দিল্লি কর্তৃপক্ষ তাঁকে ভারতে প্রবেশের অনুরোধ জানালেও তিনি দেশটিতে প্রবেশ না করে শ্রীলঙ্কা হয়ে আজ ঢাকায় ফিরে আসেন।
একটি দেশের প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার প্রতিনিধিকে এভাবে হয়রানির বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইন ঠিক কী বলে? এটি কি সরাসরি কোনো আইনের লঙ্ঘন, নাকি স্রেফ কূটনৈতিক শিষ্টাচারের অভাব? ঘটনার নেপথ্যের আইনি দিকগুলো বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ সামনে আসে।
যা ঘটেছিল
আজ সোমবার (১৫ জুন) থেকে দিল্লিতে ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশনের (আইওআরএ) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দুই দিনের বৈঠক শুরু হওয়ার কথা। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে উপদেষ্টার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
ডা. জাহেদের এই সফর ও সরকারি পরিচয়ের বিষয়টি বাংলাদেশ হাইকমিশন আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে (এমইএ) আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছিল। কিন্তু বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ভারতীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপত্তা যাচাইয়ের’ কারণ দেখিয়ে তাঁকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় রাখে। এর প্রতিবাদে তিনি নিজের পাসপোর্ট ফেরত নেন এবং দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
আন্তর্জাতিক আদালত ও ‘নিরঙ্কুশ দায়মুক্তি’
এক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মানেই কি অন্য দেশে বিনাবাধায় প্রবেশের অধিকার পান?
২০০২ সালের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট কেসের ঐতিহাসিক রায় অনুযায়ী, প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনে কেবল তিনটি পদের ব্যক্তিরা, কূটনীতিতে যাদের ‘ট্রয়কা’ বলা হয়, বিদেশে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ ব্যক্তিগত দায়মুক্তি বা ‘অ্যাবসোলিউট ইমিউনিটি’ পান। তাঁরা হলেন: রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও, আন্তর্জাতিক আইনের চোখে তিনি ওই ত্রয়ীর অংশ নন। তাই, এই সুনির্দিষ্ট আইনের অধীনে ভারত তাঁকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের আওতার বাইরে রাখতে আইনত বাধ্য ছিল না।
ভিয়েনা কনভেনশন ও পাসপোর্টের রঙ
এই ঘটনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পাসপোর্টের ধরন। ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস (ভিসিডিআর) মূলত স্থায়ী রাষ্ট্রদূত এবং দূতাবাসের লাল পাসপোর্টধারী কূটনীতিকদের পূর্ণ আইনি সুরক্ষা দেয়।
ডা. জাহেদ ভারতে নিযুক্ত স্থায়ী কূটনীতিক নন এবং তিনি লাল পাসপোর্টও ব্যবহার করছিলেন না। তাঁর কাছে ছিল সাধারণ সবুজ পাসপোর্ট এবং তাতে সার্ক ভিসা স্টিকার লাগানো ছিল। সাধারণ পাসপোর্ট থাকায় ভিয়েনা কনভেনশনের ইমিউনিটি ধারাগুলো তাঁর ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য হয়নি। বরং, সংবাদমাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ভারত সরকার আগে থেকেই তাঁকে ব্ল্যাকলিস্টেড করে রেখেছিল, এমনকি তাঁর ইউটিউব চ্যানেলটিও দেশটিতে নিষিদ্ধ।
যে আইন লঙ্ঘন করেছে ভারত
বাংলাদেশ হাইকমিশন যেহেতু আগেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে তাঁর সফরের কথা জানিয়েছিল, তাই তিনি জাতিসংঘের ১৯৬৯ সালের বিশেষ মিশন কনভেনশনের আওতায় একটি ‘বিশেষ মিশনে’ ছিলেন।
এই কনভেনশনের ২৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশ বিশেষ মিশনের প্রতিনিধির প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করবে এবং তাঁর স্বাধীনতা বা মর্যাদায় আঘাত হানতে পারে এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকবে। তাঁকে বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা এই ধারার লঙ্ঘন, এবং নিঃসন্দেহে কনভেনশনের মূল চেতনার পরিপন্থী।
আইওআরএ সম্মেলন এবং ডিউটি অব ফ্যাসিলিটেশন
পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে সংবেদনশীল আইনি দিক হলো সফরের উদ্দেশ্য। এটি কোনো দ্বিপক্ষীয় সফর ছিল না, বরং আইওআরএ-এর মতো একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলন ছিল।
বহুপাক্ষিক কূটনীতির আইনি কাঠামো অনুযায়ী, যখন কোনো দেশ এ ধরনের সম্মেলনের আয়োজক হয়, তখন তাদের একটি বিশেষ আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়, যাকে বলা হয় ডিউটি অব ফ্যাসিলিটেশন। অর্থাৎ, আয়োজক দেশকে অবশ্যই সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিদের সম্মেলনে যোগদানের জন্য নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে হবে। আগাম বার্তা পাওয়ার পরও প্রতিনিধিদলের প্রধানকে এভাবে আটকে রাখা স্বাগতিক দেশ হিসেবে ভারতের এই দায়িত্ব পালনে বড় ধরনের ব্যর্থতা।
রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব বনাম কূটনৈতিক সৌজন্য
প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনে প্রতিটি রাষ্ট্রের তার নিজস্ব সীমানা এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নিরঙ্কুশ অধিকার বা সার্বভৌমত্ব রয়েছে। কিন্তু কূটনীতিতে এই আইনি অধিকারের পাশাপাশি ডিপ্লোম্যাটিক কমিউটি বা পারস্পরিক সৌজন্যের একটি অলিখিত আইনি রীতি মেনে চলা হয়।
ভারতের যদি ডা. জাহেদকে নিয়ে কোনো নিরাপত্তা উদ্বেগ বা প্রশাসনিক জটিলতা থাকত, তবে এই সৌজন্য রীতি অনুযায়ী সফরের আগেই তা কূটনৈতিক চ্যানেলে জানানো উচিত ছিল। আগাম অবহিত একজন আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিকে বিমানবন্দরে নামার পর আটকে রাখা এই আন্তর্জাতিক সৌজন্য রীতির চরম বরখেলাপ।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক দায়মুক্তি পান না। সাধারণ পাসপোর্ট থাকায় ভিয়েনা কনভেনশনের সরাসরি সুরক্ষাও তিনি পাননি। আইওআরএর মতো বহুপাক্ষিক সম্মেলনে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে পালনে ভারত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ মিশন কনভেনশন ও কূটনৈতিক সৌজন্যের অভাব হওয়ায় ডা. জাহেদের ঢাকা ফিরে আসার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি যৌক্তিক ও যথাযথ কূটনৈতিক জবাব।