Image description

 মিনার-রশিদমিনার রশিদ

শেখ হাসিনা শিগগিরই দেশে ফিরে আসছেন—এ রকম একটা প্রচার শেখ হাসিনা নিজে এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা বিদেশের নিরাপদ আশ্রয় থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়েছে। এই উদ্দেশ্যে তিনি নাকি দিল্লি থেকে কলকাতায় উড়ে এসেছিলেন। হাসিনা দেশে ফিরলে কী করবেন, তা নিয়ে কয়েকজন চিহ্নিত আওয়ামী গডফাদার দেশের মানুষকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন।

পালানোর দিন শেখ হাসিনা এক কাপড়ে হেলিকপ্টারে চড়েছিলেন। আওয়ামী বলয়ের প্রচার দেখে মনে হচ্ছিল যে ফেরার সময় অতি আনন্দে আর্কিমিডিসের স্টাইলে ‘ইউরেকা’, ‘ইউরেকা’ জপতে জপতে ঢুকবেন! এই দৃশ্য দেখেই দেশের অর্ধেক মানুষ ফিট হয়ে পড়বেন!

প্রাচীন গ্রিসের বিজ্ঞানী আর্কিমিডিস । আর্কিমিডিসের সূত্র হলো তরল বা গ্যাসে নিমজ্জিত বস্তুর ওপর ক্রিয়াশীল উত্থাপন বল (Buoyant Force) সম্পর্কিত একটি মৌলিক বৈজ্ঞানিক সূত্র।

পদার্থবিজ্ঞানে Buoyancy বা ভাসমানতা বলতে বোঝায় কোনো বস্তু তরল বা গ্যাসের মধ্যে এমন একটি ঊর্ধ্বমুখী শক্তি লাভ করে, যার ফলে সেটি ভেসে থাকতে বা ভেসে উঠতে পারে। কোনো বস্তু যদি জোর করে পানির নিচে ডুবিয়ে রাখা হয়, তাহলে সেই বাহ্যিক শক্তি অপসারিত হওয়ার পর বস্তুটি আবার ওপরে উঠে আসার চেষ্টা করে।

রাজনীতিতেও অনেকটা একই ধরনের একটি বিষয় কাজ করে, যাকে আমরা রাজনৈতিক ভাসমানতা (Political Buoyancy) বলতে পারি। এই কথাটিকে আমরা এভাবেও বলতে পারি—কোনো রাজনৈতিক দল সাময়িকভাবে পরাজিত হলে কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তিবলে বিতাড়িত হলে আবার ক্ষমতা বা রাজনীতির মঞ্চে ফিরে আসা বা ভেসে ওঠার শক্তিকেই বলা হয় রাজনৈতিক ভাসমানতা (Political buoyancy)। একটি রাজনৈতিক দল যখন জনসমর্থন, আদর্শ, ইতিহাস, সংস্কৃতি বা জাতীয় চেতনার গভীরে শিকড় গেড়ে বসে, তখন ক্ষমতার বাইরে চলে গেলেও কিংবা রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করে তাকে দমন করার চেষ্টা করা হলেও সেটি একসময় আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে। সাময়িকভাবে তাকে ডুবিয়ে রাখা যায়, কিন্তু চিরতরে বিলীন করা যায় না।

রাজনৈতিক ভাসমানতার (Political Buoyancy) এই শক্তি শুধু সাংগঠনিক ক্ষমতা থেকে আসে না; এটি আসে জনগণের বিশ্বাস, ঐতিহাসিক বৈধতা, আদর্শিক ভিত্তি এবং জাতীয় আবেগের সঙ্গে সংযোগ থেকে।

তবে রাজনৈতিক ভাসমানতা কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। কোনো দল যদি তার আদর্শিক ভিত্তি, জনআস্থা, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনগণের আবেগ-অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার এই ভাসমানতা শক্তিও ক্ষয় হতে থাকে। একসময় সেই দল আর আগের মতো সংকট কাটিয়ে ভেসে উঠতে পারে না। আমাদের রাজনীতিতে কোনো দলের জন্য ‘দালাল’ তকমা, বিশেষ করে ইন্ডিয়ার দালাল তকমা একটি রাজনৈতিক দলের সব বয়েন্সি পাওয়ার বা ভাসমানতা শক্তি নিঃশেষ করে ফেলে।

সুতরাং, একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি শুধু তার ক্ষমতায় থাকার মধ্যে নয়; বরং তার রাজনৈতিক ভাসমানতায় নিহিত—যে শক্তি তাকে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও টিকিয়ে রাখে এবং সুযোগ এলে আবার জনসমর্থনের স্রোতে ভেসে ওঠার সক্ষমতা দেয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় শক্তি, প্রশাসনিক চাপ বা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মুখোমুখি হওয়ার পরও বিএনপি ও জামায়াতের মতো দলগুলো আবারও ভেসে উঠেছে! কারণ তাদের পেছনে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক ও আদর্শিক ভিত্তি ছিল, যা তাদের রাজনৈতিক ভাসমানতার উৎস হিসেবে কাজ করে। একইভাবে আওয়ামী লীগও ১৯৭৫-এ ডুবে যাওয়ার পর ১৯৯৬ সালে ভেসে উঠেছিল!

এ আলোচনায় একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে—তাহলে আওয়ামী লীগ কেন একইভাবে আবার ভেসে উঠতে পারবে না?

এর উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে দেখতে হবে, একটি দলের সংরক্ষিত ভাসমানতা (Reserved Buoyancy) কতটা বাস্তব এবং কতটা কৃত্রিম। কোনো রাজনৈতিক দলের এই সংরক্ষিত শক্তি যদি কিছু বিতর্কিত বয়ান, অতিরঞ্জিত ঐতিহাসিক দাবি কিংবা একচেটিয়া রাজনৈতিক বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই রিজার্ভড বয়েন্সি নিঃশেষ হয়ে যেতে বাধ্য। বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগ এমনই এক ঐতিহাসিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছে!

শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী মতিউর রহমান রেন্টু তার ‘আমার ফাঁসি চাই বইটি’তে শেখ হাসিনার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে যে যে বিষয়ে জাতিকে অবগত করেছিলেন, ১৬ বছরে শেখ হাসিনা সেসবের প্রত্যেকটি বর্ণনাকে সঠিক বলে প্রমাণ করেছেন । জাতির কালেক্টিভ মেমোরি থেকে সেসব স্মৃতি সরানো এখন কঠিন হবে! এসবের অডিও-ভিডিও প্রমাণ কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে!

এ রকম চাক্ষুষ প্রমাণসহ মুজিবের সব কুকীর্তি অডিও-ভিডিও রেকর্ডসহ ১৯৯৬ সালে মজুত ছিল না।

তাছাড়া আশি ও নব্বইয়ের দশকে ইন্ডিয়ার টাকা এবং উপদেশের থলি দিয়ে প্রায় পুরো গণমাধ্যমকে নিজের কবজায় নিয়ে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তখন নিজেদের অনুকূলে যেকোনো বয়ান তৈরি করে ফেলতে পারত! কিন্তু ২০২৬ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সিটিজেন জার্নালিজমের প্রসার সেই কাজকে শুধু কঠিন নয়—রীতিমতো অসম্ভব করে তুলেছে!

কাজেই মুজিবের পতনের পর (১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬) যেভাবে আগাচৌ, সৈয়দ শামসুল হক, সুফিয়া কামাল, শামসুর রহমান, জাফর ইকবাল প্রমুখ আওয়ামী লীগের পলিটিক্যাল বয়েন্সি যোগ করে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগকে উঠিয়েছেন—সেই কাজ এখন হাসিনার পতনের পর আব্দুন নূর তুষার, গোলাম মাওলা রনি, আনিস আলমগীর প্রমুখদের পক্ষে সম্ভব হবে না!

তারপরও উল্লিখিত ব্যক্তিরা অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তাদের প্রিয় দলটির সঙ্গে একটু একটু করে এই ভাসমানতা (Political Buoyancy) যোগ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ আমলে মোজা বাবু কিংবা ফারজানা রুপাদের মতো ওনারা দেউলিয়া হয়ে পড়েননি; বরং কুসুম-কুসুম সমালোচনা করে কিছু পয়েন্ট কামিয়েছিলেন। সেই পয়েন্ট দিয়ে বিএনপির মতো দলের নৈকট্য লাভ করেছেন এবং সেখানে বসেই লীগের জন্য প্রয়োজনীয় এই বয়েন্সি বা ভাসমানতা শক্তির জোগান দিচ্ছেন!

ওনারা ওত পেতে বসে থাকেন। যখনই একটু সুযোগ পান, তখনই আলগোছে চেতনার একটু বয়েন্সি যোগ করে দেন! কয়েক দিন আগে আওয়ামী লীগের তোফায়েল আহমেদ মারা গেলেন। তোফায়েলকে মহানায়ক হিসেবে প্রচার করে চেতনার আবেগকে ভেজানো বা তা রিফ্রেশ করার সুযোগটি মিস করেননি!

কিন্তু উভয় বাকশালের অন্যতম সহযোগী, রক্ষীবাহিনীর রাজনৈতিক প্রধান এবং তোফায়েল ক্যাডারের স্রষ্টা তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সজাগ হলে কথিত এই মিডিয়াব্যক্তিত্ব তোফায়েলের সমালোচনাকারীদের প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষ হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার তোপের মুখে এই তথাকথিত মিডিয়াব্যক্তিত্ব এবং গুপ্ত লীগাররা খড়ের মতো ভেসে গেছেন!

আওয়ামী লীগ নিজেও টের পায়নি যে কখন তারা ধীরে ধীরে একটি রাজনৈতিক দলের বৈশিষ্ট্য হারিয়ে আধিপত্যবাদী শক্তির বড়সর এজেন্ট কোম্পানিতে পরিণত হয়েছিল। এই এজেন্সির বড় এবং মাঝারি লেবেলের কর্মকর্তারা দেশের বিলিয়ন ডলার লুট করে এখন ইউরোপ, আমেরিকা, দুবাই বা ইন্ডিয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে রাজার হালে জীবনযাপন করছে!

সেই নিরাপদ জায়গায় বসে এখন টাকা ছিটিয়ে নিজেদের কর্মীবাহিনী দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের মতো পরিবেশ সৃষ্টি করা আর কখনোই সম্ভব নয়! কারণ এ রকম গণঅভ্যুত্থানের জন্য শুধু কিছুসংখ্যক মানুষের ক্ষোভ বা হতাশাই যথেষ্ট নয়—এর জন্য একটি নৈতিক গ্রাউন্ড দরকার, যা আওয়ামী লীগ পুরোদমে হারিয়ে ফেলেছে!

এটা তো সেই আওয়ামী লীগ, যার দস্যুরানি নিজ মুখেই স্বীকার করেছিলেন যে তিনি ভারতকে এমন কিছু দিয়েছেন, যা তারা কখনো ভুলবে না। এটা তো সেই আওয়ামী লীগ, যারা নিজ দেশের আর্মি অফিসারদের পিলখানায় নির্মমভাবে হত্যা করেছিল! এটা তো সেই আওয়ামী লীগ, যারা পরপর তিনটি নির্বাচনে জনগণকে ভোট দিতে দেয়নি এবং ভোটের পরদিন তাদের জয়ী করার জন্য জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। এসব মশকরা জনগণ অনেক কষ্টে হজম করেছে! এটা তো সেই আওয়ামী লীগ, যারা জনগণের পকেট থেকে ২৩৫ বিলিয়ন ডলার স্রেফ লুট করে নিয়েছে!

জনগণের কালেক্টিভ মেমরি থেকে কয়েক শতাব্দী পরও এ ঘটনাগুলো মুছে যাবে না। কারণ এটা তো সেই আওয়ামী লীগ, যারা এ দেশের এনএসআই ও ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের পাশের রাষ্ট্রের নির্দেশে এবং তাদের খুশি করার নিমিত্তে বিচারের সম্মুখীন করেছিল, ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলার ঘটনা যদি সত্যও (তর্কের খাতিরে ধরে নিলেও) হয়ে থাকে—সেটি তো তারা করেছিলেন রাষ্ট্রের নির্দেশে। যদিও এ ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জড়ানো ছিল ভয়াবহ একটি ষড়যন্ত্রের অংশ! অর্থাৎ এই দিল্লিদাসী আমাদের জিও-পলিটিক্যাল যত অ্যাডভান্টেজ ছিল, তার সবকিছু ভারতের চরণতলে সমর্পণ করেছিলেন!

এই দিল্লিদাসীকে সরাতে রাজনৈতিক সমর্থনের বাইরে যেমন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমেছিল—দরকার পড়লে সেই দাসীর আগমন প্রতিহত করতে সেই একই জনগণ আবার রাস্তায় নেমে আসবে। রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে বা চক্করে পড়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিভ্রান্ত হলেও সাধারণ জনগণ তা হবে না।

 

রাজনৈতিক ভাসমানতা, বিএনপি ও জামায়াতের ভবিষ্যৎ সমীকরণ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপি এবং জামায়াত—দুই দলের ভাসমানতার উৎস এক নয়, তবে তাদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ রয়েছে।

বিএনপির রাজনৈতিক ভাসমানতার (Political Buoyancy) মূল ভিত্তি হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের প্রতি জনগণের স্বাভাবিক অনীহা এবং দেশের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক অবস্থান।

অন্যদিকে জামায়াতের ভাসমানতার (Political Buoyancy) ভিত্তি হলো ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং একটি ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবি।

এই দুই ধারাকে যথাক্রমে ‘মুসলমানি ঢঙের রাজনীতি’ এবং ‘ইসলামি ঢঙের রাজনীতি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। দুই ধারার লক্ষ্য ও পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকলেও উভয়ের সামাজিক ভিত্তির মধ্যে যথেষ্ট ওভারল্যাপ রয়েছে। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজের একটি বড় অংশ একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ ধারণ করে। ফলে বাস্তব রাজনীতিতে এই দুই ধারার মধ্যে সংঘাতের চেয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র অনেক বেশি।

ছাত্রদলের প্রাক্তন সভাপতি ড. শাহাবুদ্দিন লাল্টুর মতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের পুরো অংশই যেমনভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন, তেমনি বাংলাদেশ সৃষ্টির পর মুসলিম লীগের পুরো অংশ বিএনপিতে ঢুকে পড়েছে । একইভাবে ২০২৪-এর পরবর্তী বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের লোকজনও বিএনপি, জামায়াত বা অন্য দলগুলোয় ঢুকে পড়বে বলে তার বিশ্বাস। এটাই নেচারাল রিকনসিলিয়েশন! কাজেই কোনো রাজনৈতিক দল ডুবে গেলেও দলের নেতাকর্মীদের ইন্ডিভিজুয়াল পলিটিক্যাল আকাঙ্ক্ষা বা বাসনা দমে যায় না।

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাকশাল-সৃষ্ট পানিশূন্যতা (Dehydration) থেকে জাতিকে রক্ষা করেছিলেন যে স্যালাইনটি দিয়ে, তার নাম বিএনপি। তিনি এক চিমটি বাম, এক মুঠ মুক্তিযোদ্ধা এবং এক জগ মুসলিম লীগার দিয়ে এই স্যালাইনটি বানিয়েছিলেন । মূলত বিএনপির ভাসমানতা শক্তিটি এসেছে এই জায়গা থেকেই । এখন এটি ভুলে গেলে বা ভুলে থাকার ভান করলে তা বিএনপির পক্ষে মারাত্মক গলদ হবে ।

রাজনৈতিক ভাসমানতার দৃষ্টিকোণ থেকে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তার নিজস্ব আদর্শিক ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখা। বিএনপি যদি তার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জনগণের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল অবস্থান থেকে সরে যায়, তাহলে দলটির ঐতিহাসিক ভাসমানতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। কারণ জনগণ সাধারণত এমন দলকে দীর্ঘ মেয়াদে সমর্থন করে, যার মধ্যে তারা নিজেদের পরিচয় ও মূল্যবোধের প্রতিফলন দেখতে পায়।

অন্যদিকে জামায়াতের জন্যও একই ধরনের বাস্তবতা প্রযোজ্য। যদি দলটি শুধু আদর্শিক বিশুদ্ধতার প্রশ্নকে সামনে এনে বৃহত্তর জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনমতের গুরুত্বকে উপেক্ষা করে, তাহলে তার রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত হয়ে যেতে পারে। আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য রক্ষা করা যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য অপরিহার্য।

সুতরাং রাজনৈতিক ভাসমানতা বজায় রাখার জন্য বিএনপি ও জামায়াত—উভয়েরই প্রয়োজন নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা, কিন্তু একই সঙ্গে পরস্পরকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখা। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, নীতিগত বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যদি পারস্পরিক বৈরিতায় রূপ নেয়, তাহলে উভয়ের সামাজিক ভিত্তি তথা এই ভাসমানতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ইঙ্গিত দেয় যে, জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি ধারার মধ্যে একটি ন্যূনতম সমঝোতা এবং সহাবস্থান বিরোধী রাজনীতিকে শক্তিশালী করেছে। বিপরীতে, যখন এ দুই ধারা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে, তখন রাজনৈতিক সুবিধা পেয়েছে তৃতীয় কোনো শক্তি।

তাই রাজনৈতিক ভাসমানতার দৃষ্টিতে বিএনপি ও জামায়াতের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে—নিজ নিজ আদর্শিক অবস্থান বজায় রেখে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, গণতান্ত্রিক সহাবস্থান এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা।

কারণ একটি দলের রাজনৈতিক ভাসমানতা (Political Buoyancy) শুধু তার নিজস্ব শক্তির ওপর নির্ভর করে না; অনেক সময় তা নির্ভর করে সে কতটা দক্ষতার সঙ্গে তার স্বাভাবিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারে, তার ওপরও।

রাজনীতিতে স্থায়ী বিজয় সাধারণত একক আধিপত্য থেকে আসে না; বরং আসে এমন এক ভারসাম্য থেকে, যেখানে বিভিন্ন ধারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করতে সক্ষম হয়।

আওয়ামী নামক ক্যানসার থেকে জাতিকে রক্ষা করতে এই বোধটির উদয় জরুরি।

 

লেখক : কলামিস্ট